Banner
আর্য প্রশ্নে আরও বিতর্ক -- শামসুজ্জোহা মানিক এবং শামসুল আলম চঞ্চল

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক এবং শামসুল আলম চঞ্চল, আপডেটঃ July 19, 2015, 12:00 AM, Hits: 508

 

আমাদের রচনা Rediscovering Indus Civilization and Aryans: Journey to Our Renaissance” এর একজন পাঠকের মন্তব্যের উত্তরে আমরা সংক্ষেপে ইংরাজীতে যে উত্তর দিই তা সকল পাঠকের সুবিধার্থে এখানে বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হল। পাঠকের চিঠির মূল বিষয়টি নীচে উদ্ধৃত হলঃ


প্রথমত, আর্য আক্রমণ তত্ত্ব মার্ক্সবাদীদের মধ্যে অত্যধিক জনপ্রিয়, যারা উপনিবেশবাদীদের বিপরীত সত্তা।


এছাড়াও, উপনিবেশিক যুগে, পাশ্চাত্যের কিছু অদম্য ও স্থিরসংকল্প পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক, যারা কষ্টসাধ্য কাজ করেছিলেন ভারতের গৌরবময় প্রাচীন সভ্যতা অবিষ্কার করতে, তাদের চোখে ইউরোপের নিজস্ব উত্তরাধিকার ছিল ভারতের চেয়েও নীচে।


এছাড়াও, ভাষাতত্ত্বের কম্পিউটার মডেলের উপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকে - আনাতোলীয় অঞ্চল থেকে মানুষের স্থানান্তরগমন (আর্যদের) তথাকথিত আর্য সভ্যতা ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার বিস্তার ঘটিয়েছিল। বিতর্ক কেবল এটাই যে ঐ স্থানান্তরগমন শান্তিপূর্ণভাবে না সহিংস আক্রমণের মাধ্যমে ঘটেছিল। সাম্প্রতিক সাক্ষ্য শান্তিপূর্ণ পথের প্রতিই ইঙ্গিত করে।


উপরে বর্ণিত বিষয়গুলি সম্পর্কে আমাদের উত্তর পর্যায়ক্রমে নীচে দেওয়া হলঃ


ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের উদ্ভাবিত আর্য আক্রমণ তত্ত্বের প্রতি সমর্থন মার্ক্সবাদী পণ্ডিতদের অন্তঃসারশূন্যতাকেই প্রমাণ করে। ভারতে আর্য আক্রমণ তত্ত্বের মত মার্ক্সবাদ নিজেই পাশ্চাত্যের মতবাদ। তাদের কাছে সম্ভবত এই দুই মতবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। আমরা দেখেছি যে যখন মার্ক্সবাদীরা এখানে মার্ক্সবাদ বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছিল, তারা তখন দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক অবস্থা ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে নাই। এমন কি আজও তারা তা বুঝতে চেষ্টা করে না। তাদের পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটছে। এবং বাস্তবিকপক্ষে, নিজেদের ভূমি ও মানুষের গৌরবময় উত্তরাধিকার নিয়ে তাদের কোন গৌরববোধ নাই। তাদের অন্ধ ও যান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রচলিত বিশ্ব পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের এক চমৎকার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাদের উপনিবেশিত মন দিয়ে তারা আর্য প্রশ্নকেও বোঝার চেষ্টা করে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অক্ষমতা এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞানের তত্ত্বের উপর অন্ধ নির্ভরতা মার্ক্সবাদী পণ্ডিতদেরকে অজ্ঞতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করেছে।


যখন প্রাচীন ভারতের বিস্ময়কর দলিলসমূহ আবিষ্কার করা হয়, যা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের ইতিহাসে তুলনাহীন ছিল, সমৃদ্ধ সাহিত্য ও দর্শনের জন্য পাশ্চাত্যের পণ্ডিতদেরকে ভারতীয় সভ্যতার শক্তিকে স্বীকার করতে হয়েছিল। ভারতীয় সভ্যতার গৌরবজনক অতীতকে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত যে প্রাচীন ভারতীয় লোকজন, কিংবা আরও সুনির্দিষ্টভাবে, সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার লোকজন, আদি আর্য ছিল। তারা অত্যন্ত উন্নত সাহিত্যকে প্রাচীন ভারতের গ্রামীণ সমাজের সাথে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেন, যেন এই সমস্ত অত্যুন্নত সাহিত্য ও দর্শনের কাজসমূহ গ্রামে বসবাসকারী লোকজন করেছে। যদি তারা এটি গ্রহণ করেন যে সিন্ধু সভ্যতার লোকজনই মূল আর্য, তাহলে তাদের এই সত্যটি গ্রহণ করতে হবে যে দক্ষিণ এশিয়ার আর্যরা সম্পূর্ণ ইউরোপ এবং মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বড় অংশকে সভ্য করেছিল।

 

কম্পিউটার মডেল ভুল ফলাফল দিতে পারে যদি সরবরাহকৃত তথ্য ভুল হয়। সাম্প্রতিক তত্ত্বের সরবরাহকৃত তথ্য এমন পণ্ডিতদের দ্বারা তৈরী হয়েছিল যাদের প্রাচীন ভাষা এবং ধ্বনি-তত্ত্বের উপর পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা ছিল। সাম্প্রতিক তত্ত্বের মডেলটিতে শব্দের পরিবর্তনের হারকে ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষাতত্ত্ববিদরা অনুমান থেকে অনেক মৃত ভাষার প্রাচীন ধ্বনি তৈরী করেছেন। সুতরাং, এগুলো কম্পিউটার মডেলের জন্য ভুল তথ্য সরবরাহ করে থাকতে পারে। এছাড়াও,আমরা বলতে পারি যে একটি উন্নত ভাষা বিকশিত হতে পারে তখনই যখন তা নগর সভ্যতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। তাই, এমন একটি ভাষা যা এত শক্তিশালী যে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় সকল ভাষা সমূহকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করে ফেলেছিল তা অবশ্যই দীর্ঘ নাগরিক পশ্চাৎভূমি থেকেই উদ্ভূত হয়ে থাকবে। কারা অপর ভাষা এবং সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করতে পারে? অবশ্যই, ঐ সমস্ত মানুষরা যাদের বাস্তবে অনেক বেশী উন্নত সংস্কৃতি ও ভাষা আছে এবং যার জন্য তাদের আন্তরিক গৌরববোধও আছে। এই বিষয়সমূহ অভিবাসী আর্যদের সংস্কৃতি ও ভাষা দ্বারা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত এবং অধিকার করতে অবশ্যই ভূমিকা রেখেছিল। যদি আমরা বর্তমান সময়ের ইংরাজী অথবা অন্য যে কোনও প্রধান ভাষার দিকে দৃষ্টি দিই তবে আমরা সহজেই বুঝব যে কীভাবে সভ্যতা অথবা সমাজের শক্তি বা ক্ষমতা কোনও ভাষার বিকাশ, বিস্তার ও প্রভাবে ভূমিকা পালন করে। ভাষা হল সভ্যতা বা সমাজের সৃষ্টি এবং বাহক। সুতরাং, কীভাবে আনাতোলিয়ার পশ্চাৎপদ কৃষি বা পশুচারী সমাজের ছোট একটি জনগোষ্ঠী যাদের কোন উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ভাষা নাই, তারা পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে? দক্ষিণ এশিয়ায় আর্যদের মূল বাসভূমিকে গোপন করার উদ্দেশ্যে পাশ্চাত্য পণ্ডিত এবং তাদের অনুসারীদের এই সমস্ত উদ্যোগ হল পাশ্চাত্যের মূল ধারার পাণ্ডিত্যের অন্তঃসারশূন্যতা আর প্রতারণার নির্দেশক।

 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ