Banner
সুভাষ ও বাঙ্গালী জাতি ─ শামসুজ্জোহা মানিক (পুনঃপ্রকাশিত)

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ August 5, 2017, 12:00 AM, Hits: 216

 

{ নিবন্ধটি ‘গ্রন্থাগার’ বিভাগের ‘রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থে’ এবং ‘নির্বাচিত’ বিভাগে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ধর্ম ও শ্রেণীতত্ত্বের যাঁতাকলে বাঙ্গালী জাতি ( জাতি ও জাতীয়তাবাদ বিষয়ক সংকলন )’ থেকে নেওয়া। }


অবশেষে ভারত রাষ্ট্রে সুভাষ বসুর নূতন করে মূল্যায়ন শুরু হ’ল। শুধু পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু নয় অধিকন্তু ভারত রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধে সুভাষ বসুর অবদান স্বীকার করেছেন।


ইতিহাস এমনই। অথবা এমনই মানুষের মন। আজ যাকে কালো করা হয় একদিন তাকেই সাদা করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কিংবা উল্টোটা। আজ যারা সুভাষের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন একদিন তাঁরাই সকলে মিলে তাঁর ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক কালি মাখিয়ে বেড়িয়েছেন।


ক্ষোভের কথা। তবু সত্য। অর্ধ শতাব্দী লাগল তাদের সত্য উপলব্ধি করতে। তার মানে কি এই নয় যে, অর্ধ শতাব্দীরও অনেক বেশী কাল আগুয়ান ছিলেন সুভাষ এইসব নেতা এবং রাজনৈতিক শক্তির তুলনায়? হাঁ, ক্ষোভ জাগে এ কথা মনে হলে যাদের কারণে একদিন সুভাষ বসু ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত করতে পারেন নি আজ তারা তাঁকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। একি সুভাষকে আত্মসাৎ করার প্রয়াস?


তবে সুভাষকে নিয়ে বাঙ্গালী হিসাবে আমার খুব গৌরব। হাজার বছরের ইতিহাসে গৌরব করার মত বাঙ্গালী বীর কয়জন আছে? মোগল যুগের ঈসা খাঁ, প্রতাপাদিত্যের মত কয়েকজন রাজা বা ভূঁইয়ার নাম আমরা জানি। তাঁরা বীর ছিলেন বটে। তবে সেটা বিরাট আয়তনের কিছু নয়। কারণ, তাঁদের এলাকা যেমন ছোট ছিল, দৃষ্টিটাও তেমন। বৃহৎ রাষ্ট্র গঠন তাঁদের স্বপ্নের মধ্যে ছিল না। জাতি-রাষ্ট্র চেতনা তো নয়ই। ব্রিটিশ শাসন কালে তীতুমীর, ফকির মজনু শাহ্‌-এর মত বীরও আমাদের ইতিহাসে আছে। কিন্তু তাঁদের প্রসঙ্গেও ঐ একই কথা। আরও পরবর্তীকালের ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তের মত বীররাও আমাদের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।


যাঁদের ইতিহাস জ্ঞান ইউরোপ পর্যন্ত তাঁরা হয়ত ভাববেন যে, মধ্যযুগে জাতি চেতনা কিংবা জাতি-রাষ্ট্র ভাবনা আবার কি জিনিস? কিন্তু ইতিহাসের যাত্রাটা ইউরোপ থেকে নয়। এবং পৃথিবীর ইতিহাসের আবিষ্কারও ইউরোপ থেকে নয়। এইজন্য আমরা অনেক হাজার বছরের ইতিহাসে দেখি অনেক দেশেই যুগ যুগ ধরে জাতি ভাবনাও ছিল। হয়ত সেটা আধুনিক কালের মত করে নয়। তবু ছিল। সেই চেতনার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই চীনে, জাপানে, পারস্যে এবং আরও অনেক দেশে। হয়ত রাজা ও রাজতন্ত্রকে কেন্দ্র করে জনগোষ্ঠীর জাতি চেতনা ও স্বাতন্ত্র্য বোধ মূর্ত হত সে যুগে। তবু সেটা ছিল।


একটা দৃষ্টান্ত দিলেই এ কথার তাৎপর্য বোঝা যাবে। চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী চীনাদের পরাজিত করার পর প্রায় একশত বৎসর চীনে মোঙ্গলদের আধিপত্য ছিল। কিন্তু এক সময় চীনারা বিদেশী মোঙ্গলদের পরাজিত করে তাদের শাসন উচ্ছেদ করে। শুধু তাই নয় প্রায় শত বৎসরের মোঙ্গলদের আধিপত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় এমন সকল চিহ্ন তারা মুছে ফেলার জন্য মোঙ্গলদের দ্বারা নির্মিত স্থাপত্যসহ সকল নির্মাণ ধ্বংস করে দেয়।


তবু জাতি চেতনা আধুনিক কালের সৃষ্টি! অর্থাৎ ইউরোপের সৃষ্টি, তাই তো? এ কথাটা কারা বলেছে? ইউরোপীয়রা। কেন? কারণ আধুনিক যুগের পূর্বে তাদের নিজেদের মধ্যেই এই ধরনের জাতি চেতনা ছিল না। অবশ্য রোমের ব্যাপারটা, এমনকি গ্রীকদের মধ্যেও এক ধরনের জাতীয়তা বোধের ব্যাপারটাকে এত সহজে বোধ হয় ব্যাখ্যা করা যায় না। তবু এটা চীনাদের মত নয়, বা নয় পারস্য বা জাপানের মত।


যাইহোক, জাতীয়তাবাদ নিয়ে পণ্ডিতী তর্ক চালিয়ে আমি মূল প্রসঙ্গ থেকে সরতে চাই না। সুতরাং বাংলার কথাতেই আসি। এই বাংলায় ভাষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তা বোধ পূর্বকালে যে সেভাবে ছিল না সেটা আমরা জানি। যদিও গৌড়ীয় পরিচয়টাও একেবারে অবজ্ঞাত ছিল না, তবু সেটা দৃঢ়বদ্ধ ছিল না। সুতরাং আমরা গৌরব করতে হলে ঐ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীরদের নিয়ে গৌরব করি। উপায় কী? উপরের তলায় রাজারা সিংহাসন নিয়ে আর রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করত। আর নীচ তলায় নদী বিধৌত বাংলায় আমাদের স্মরণকালের পূর্বসূরিদের বীরত্বের দৌড় তো ছিল চর দখলের কাজিয়া পর্যন্ত। হয়ত নদীর দুই তীরের দুই গ্রাম কিংবা দুই গোষ্ঠীর চর দখলের কাজিয়া।


বৃহৎ স্বপ্ন, বৃহৎ জাতি বা সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ওসব কোন কালেই বা কয়জন দেখেছে? আর দেখলেও এই সমাজ জমিতে তারা দাঁড়াবার মত অত প্রশস্ত জায়গা কিংবা মজবুত স্থানটা কোথায় পাবে? জলকাদাময় নরম পলির মতই তো আমাদের পূর্ব প্রজন্মের মন। বড় কিছু ধারণ করবে কিভাবে?


রাজা লক্ষ্মণ সেন বাঙ্গালী ছিলেন কি না সন্দেহ। সিরাজউদ্দৌলার বাঙ্গালী হবার মতই তাঁরও বাঙ্গালী হবার ব্যাপার। দুইজনই ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। তবু এ দেশের ভাগ্যের সঙ্গে তাঁদেরও ভাগ্য জড়িয়ে গিয়েছিল অনেকাংশেই। সুতরাং তারা জাতি হিসাবে বাঙ্গালীর আদি পুরুষ না হয়েও আদি পুরুষ হয়েছেন। অন্তত বাঙ্গালী না হয়েও তাঁরা বাংলার হয়েছিলেন। এখন তাঁদের সুকীর্তি বলা যাক, কুকীর্তি বলা যাক, সফলতা বলা যাক, ব্যর্থতা বলা যাক তার ফল ভোগও করতে হয়েছে এই জাতিসত্তাকে। সিরাজউদ্দৌলা প্রায় ৬৭ হাজার সৈন্য নিয়ে লড়তে গেলেন রবার্ট ক্লাইভের মাত্র ৩ হাজারের কিছু বেশী সৈন্যের সঙ্গে। অবশেষে সন্ধ্যা হতেই পলাশীর রণক্ষেত্র ছেড়ে পালালেন। আর রাজা লক্ষ্মণ সেন রাজধানী নবদ্বীপে ১৯ ঘোড় সওয়ার তুর্কীর প্রবেশ এবং প্রাসাদ আক্রমণের খবর শুনেই রাাজপ্রাসাদের খিড়কির দুয়ার দিয়ে পালালেন বউ-ছেলেমেয়ে সাথে নিয়ে।


রাজা লক্ষ্মণ সেন কেন পালিয়েছিলেন সেটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। তিনি ছিলেন বহু যুদ্ধ জয়ী বীর। বয়স তখন আশির উপর। তা হোক। তিনি পালালেন কেন? আমি অনুমান করি সিরাজ যে কারণে পালিয়ে ছিলেন সেই কারণে তিনিও পালিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, যে শত্রু রাজধানী পর্যন্ত বিনা বাধায় ঢুকতে ও এত অল্প শক্তি নিয়ে প্রাসাদ আক্রমণ করতে পারে তা একা নয়। নিজ রাষ্ট্রের ভিতরকারই এক বড় অংশ তাঁর শত্রুর পক্ষে চলে গেছে। ওখানেও হয়ত মীর জাফর ছিল যার নাম আমরা জানি না। তবে নামে কি আসে যায় যদি রাষ্ট্রের বড় অংশ ঠিক করে যে, এবার তারা রাজা বদল করবে, শক্তিমান আক্রমণকারীর কাছে বিনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তর করবে?


বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাস করে দল বদলের ব্যাপারটা তো আমরা খুব ভাল বুঝি। আজ আওয়ামী লীগ, কাল বিএনপি, পরশু জাতীয় পার্টি। তারপর দিন আওয়ামী লীগের উত্থান দেখলে পুনরায় আওয়ামী লীগে যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে অথবা ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয় পূর্ব দল পরিবর্তন করে সেই দলে যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। হয়ত আদি বাঙ্গালীর অন্তত এক বিরাট কাল জুড়ে এটাই বৈশিষ্ট্য। বাংলার মাটিতে কিছুকাল বসবাস করে মীর জাফরও এ বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করতে সময় নেন না।


প্রায় সোয়া এক কিংবা দেড় হাজার বৎসর পূর্বের রাজা শশাঙ্ক, কিংবা রাজা গোপালের দিকে তাকিয়ে ভাবি এঁরা কোন বাঙ্গালীর আদি পুরুষ? অন্তত নির্বাচিত রাজা গোপালকে নিয়ে আমার খুব গর্ববোধ। শশাঙ্ক বীর ছিলেন। কিন্তু কতটা গণমুখী ছিলেন, কতটা উদার ও মানবিক ছিলেন জানি না। তবে বোধিবৃক্ষ ধ্বংসের মত তাঁর কিছু কীর্তি জেনে তাঁকে নিয়ে গৌরব করতে সংকুচিত হই। কিন্তু রাজা গোপালকে নিয়ে সেই সঙ্কোচ থাকে না। আমার কাছে মনে হয় আদি বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ বীর নায়ক, জন-নায়ক রাজা গোপাল। তাঁর উত্তরাধিকারী দেবপাল, ধর্মপাল বীর হিসাবে আরও বড়। কিন্তু আদি বাঙ্গালীর এক গৌরবময় ও দীর্ঘস্থায়ী বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপালকে নিয়ে আজকের বাঙ্গালীর গৌরবের অনেক কিছু আছে বলে আমি মনে করি।


হয়ত রাজা গোপালের পর বাঙ্গালীর ইতিহাসে এমন আর এক বিরাট স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে সুভাষ বসু আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু এত বৃহৎ স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে ধারণ করার জমিটা কোথায়? সমগ্র ভারতবর্ষের বহু জাতি সমন্বিত জনগোষ্ঠী তাঁকে ধারণ করতে চায় নি। কারণ তিনি ছিলেন বাঙ্গালী এবং তিনি ছিলেন আমূল পরিবর্তনবাদী। হাঁ, সে কালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী। কিন্তু বাঙ্গালী জাতিও তাঁকে ধারণ করে নি। কংগ্রেসী বাঙ্গালী, মুসলিম লীগপন্থী বাঙ্গালী, কমিউনিস্ট বাঙ্গালী এরা সবাই তাঁর বৈরী। মুসলিম লীগ ইংরেজের সহযোগী হয়ে খণ্ডিত ভারতবর্ষের ক্ষমতার অংশ প্রত্যাশী। কংগ্রেস যুদ্ধের পরিবর্তে আপসে ক্ষমতার হস্তান্তরকামী। আর কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বাংলা ও ভারতবর্ষের জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে শ্রেণী সংগ্রামের নামে বাংলা ও ভারতবর্ষকে বিভক্ত করার সাধনায় লিপ্ত।


সুভাষ যে দাঁড়াবেন তার জমিটা কোথায়? হয়ত সুভাষের এক বড় ভুল ছিল বাঙ্গালীর জাতিগত পরিচয়কে গৌণ করে ভারতীয় পরিচয়কে মুখ্য করা। বাঙ্গালীর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বিত না করে শুধু অখণ্ড কিংবা বৃহত্তর ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে সে কালে বাঙ্গালী ছিল বিভোর। বৃহত্তর ও ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়তে গিয়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাধনায় বাঙ্গালী ক্রমে হিন্দু এবং মুসলমান হয়ে গেল। এটাই স্বাভাবিক। কারণ বহু জাতির উপমহাদেশ ভারতবর্ষের ঐক্যের মূল ভিত্তি ধর্ম হতে বাধ্য ছিল।


বাংলা ও বাঙ্গালীকে ঘিরে যে রাজনীতি ও রাষ্ট্র চিন্তা ছিল তা প্রকৃতপক্ষে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর সঙ্গেই ফুরিয়েছিল। এক খণ্ডিত ও পঙ্গু নবজাগরণ রাজনীতিতে বাঙ্গালীর স্বতন্ত্র জাতীয়তা বোধের যে ক্ষীণ ধারা জাগিয়েছিল সেটা শেষ হল চিত্তরঞ্জন দাশের অকাল মৃত্যুর সঙ্গে। বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত চেতনার এমন অকাল মৃত্যু প্রমাণ করে যে, ঐ চেতনার নেতৃত্বের শক্তি কত অক্ষম, ক্লীব ও পঙ্গু!


আসলে চিত্তরঞ্জন দাশ যে আকঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তাকে ধারণ করার মত সমাজ জমি ছিল না। তাকে ধারণ করবে কে? উচ্চবর্গের যে ভদ্রলোকরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত তারাই তখন বাঙ্গালী জাতির স্বাতন্ত্র্যকে বাদ দিয়ে শুধু ভারত ভিত্তিক রাজনীতি করতে আগ্রহী। এ হ’ল হিন্দু বাঙ্গালী এলিট নেতৃত্বের সে কালের প্রবণতা। আর এদের পিছনেই তো ছিল আমজনতা। সুতরাং এই হিন্দু বাঙ্গালী ভদ্রলোকদের অস্বীকার করে সুভাষেরও ভিন্ন কিছু করা সম্ভব ছিল না। বাঙ্গালী জাতির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতবর্ষের মুক্তির রাজনীতি করার কাল সেটা ছিল না। তখন হিন্দু ও মুলমান বাঙ্গালীর মধ্যে এমন এক দ্বন্দ্ব ও বিভেদের বিকাশ ঘটছিল যার কারণে উভয়েরই প্রয়োজন ছিল আত্মশক্তি বৃদ্ধির জন্য বাংলার বাইরের ‘জাতভাইদের’ সাহায্যের।


হাঁ, ইংরেজ খুব সফল। ১৯০৫ থেকে শুরু বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের পরিণামে ১৯১১-তে বঙ্গ-ভঙ্গ রদ হল বটে, কিন্তু হিন্দু ও মুসলমানের ভিতরকার ভঙ্গ আর রদ হ’ল না। ওটা পূর্বেও ছিল। কিন্তু একবার বঙ্গ ভঙ্গ করে এবং ঢাকাকে আসাম এবং মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ব বঙ্গের রাজধানী করে মুসলিম বাঙ্গালীর চেতনায় সহজ উন্নতির যে কল্পতরু রোপণ করা হ’ল তা আর শুকিয়ে মরল না। বরং বাড়তেই থাকল।


বাঙ্গালীর ভিতর এমন দ্বন্দ্বের ক্রমবিকাশে লাভটা হল হিন্দী ও উর্দূভাষী ‘জাতভাই’ নেতাদের। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের। এবং এর জন্যও বাংলার রাজনীতির নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল দায়ী করতে হবে প্রধানত তাদেরকেই। এই নেতৃত্ব ছিল হিন্দু ভদ্রলোকদের হাতে। এই হিন্দু ভদ্রলোকরা যখন বাংলায় সংখ্যাগুরু এবং জনসংখ্যায় ক্রমবর্ধমান মুসলমান বাঙ্গালীদের ভয়ে ভারতের ‘জাতভাইদের’ শরাণপন্ন হয়ে বাঙ্গালীর জাতি ভিত্তিক রাজনীতি পরিত্যাগ করে সর্বভারত ভিত্তিক রাজনীতি শুরু করল তখন বাংলায় সংখ্যাগুরু হলেও অর্থ-সম্পদ ও শিক্ষায় দুর্বল ও পশ্চাৎপদ মুসলমানরা পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকল। পাকিস্তানও হচ্ছে ভারত। তবে ওটা মুসলিম ভারত। অর্থাৎ এমন ভারত যেখানে মুসলমান সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু।


বাঙ্গালী ও বাংলার এই বিভক্তির জন্য নিশ্চয় হিন্দু ও মুসলমান উভয় নেতৃত্বই দায়ী। তবে বেশী দায়ী কি হিন্দু নেতারা নয়? কারণ তাদের হাতেই তো সমগ্র বাঙ্গালী জাতির নেতৃত্ব ছিল এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। যদি অখণ্ড ভারত ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা না ক’রে অখণ্ড বাংলা ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা সেদিন বাঙ্গালী নেতৃত্ব করত তবে বাংলা ও বাঙ্গালীর এমন বিপর্যয়টা হয়ত হত না। অবশ্যই ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নটাও সেই সঙ্গেই রাখা যেত। সে ক্ষেত্রে ভারত হতে পারত একটা রাষ্ট্রসংঘ বা জাতিসংঘ।


কিন্তু ভীরু, হৃস্বদৃষ্টি, নির্জীব এবং সংকীর্ণচেতা হিন্দু ভদ্রলোকবৃন্দ এবং তাদের নেতৃত্ব সেদিন গান্ধী-নেহরুকে পিতা-নেতা মেনে বাংলা ভাগটাকেই অনিবার্য করার কাজে সহায়ক হলেন। এভাবে তারা জিন্নাহ্‌-সোহ্‌রাওয়ার্দীর রাজনীতিরও সহায়ক হলেন। যদি সেদিন বাংলা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হত তবে সেখানে লোকবাদী জাতি-রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার জন্য একটা লড়াই করার মত জায়গা পাওয়া যেত।


অবশ্য প্রশ্ন, লড়াইটা করবে কে? কমিউনিস্টরা? যাদের কাছে দেশ-কাল নেই, নিজ সমাজ ও জাতির প্রতি আনুগত্য নেই, নিজ জাতি ও স্বদেশ-স্বজনের দুঃখের বদলে আন্তর্জাতিক দুঃখ ও বেদনায় যাদের মন মুহ্যমান ও ভারাতুর থাকে, মস্কোর হুকুম-বরদার হয়ে যারা এ দেশে বিপ্লবের ‘সহি বড় খাবনামা’ রচনা করে তারা করবে লড়াই? আসলে হিন্দু-মুসলমান বাঙ্গালী ভদ্রলোকদের সবারই মতিচ্ছন্নতার যুগ ওটা।


শুধু বাংলায় নয় গোটা ভারতেও হিন্দু-মুসলমানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে গোটা ভারতবর্ষের মতিচ্ছন্নতার কাল ওটা। ঐ দ্বন্দ্বের আবর্তে ভারত যে একটা জাতির দেশ নয়, বরং বহু জাতির উপমহাদেশ এই বোধটাই তলিয়ে গেল।


অথচ ইংরেজ শাসন পুর্বকালের দিকে দৃষ্টি দিলেই ইতিহাসের অভিমুখটাকে চিহ্নিত করতে কষ্ট হবার কথা নয়। মোগল শাসনের শেষ পর্বে ভারতবর্ষে বিচ্ছিন্নতা প্রবণতাই যে শুধু মাথা চাড়া দিচ্ছিল তা-ই নয়, উপরন্তু জাতি-রাষ্ট্র গঠনের সূচনাও ঘটছিল। মারাঠা ও শিখ উত্থান তার প্রমাণ। অবশ্য এটা ছিল তখনও অনেকখানি অসচেতন প্রয়াস। তবু ভারতের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য বোধ ও উত্থান প্রয়াস তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল বিভিন্ন বিদ্রোহ, যুদ্ধ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের মধ্যে। শুধু রাজবংশের পরিচয় আর রাজ্য গঠন পদ্ধতি দিয়ে তার বিচার করলে ভুল হবে। তাতে সব সময় সত্যকে বোঝা যায় না। যেমন ইংল্যান্ডে জাতি-রাষ্ট্র গঠনের সূচনা কালেও জার্মানী থেকে রাজা আনা হয়েছিল। কাজেই দেখতে হয় সমাজের অবতলের শক্তি ও গতিধারাকেও। এই গতিধারার দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্র গঠনের কাজটা চলছিল। কিন্তু ইংরেজের বিজয় ও পুনরায় আর একটি সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা জাতি-রাষ্ট্র গঠনের এই প্রক্রিয়াকে মাঝপথে ভণ্ডুল করে দেয়।


সবচেয়ে বড় ক্ষতি হল তখন যখন জাতির বদলে ধর্ম-সম্প্রদায় বোধ ভারতবর্ষের একই সঙ্গে ঐক্য ও বিভাজনের শক্তি হয়ে দাঁড়ালো। ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতের জাতিসংঘ দাঁড়ালো না। বরং দাঁড়াতে চাইল ধর্ম-সম্প্রদায় এবং ­ ধর্ম-সম্প্রদায়সংঘ  হিন্দু ও মুসলমান এই দুইটি সম্প্রদায়ের সংঘ। হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের পরিচয়কে সামনে এনে তাদের মধ্যে ঐক্য ঘটাতে গিয়ে লেগে গেল লড়াই। সেটাই স্বাভাবিক। এই দুই ধর্মে মিলন ঘটিয়ে যাঁরা হিন্দু-মুসলমানে মিলনের স্বপ্ন দেখে এসেছেন তাঁদের সদিচ্ছার প্রতি অশ্রদ্ধা না জানিয়ে বলছি যে, তাঁরা কল্পস্বর্গেই বাস করেছেন। কারণ তাঁরা এই দুই ধর্মকেই ভালভাবে বোঝেন নি এবং আরও বোঝেন নি ভারতবর্ষে এই দুই ধর্মের বিকাশ প্রক্রিয়া, ভূমিকা ও সংঘাতের তাৎপর্য।


আমার ধারণা ইংরেজ বাংলা ও ভারতবর্ষে এত সহজে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল এই দুই ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে। এবং এই দুই সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের কারণেও এখানে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামটা বেশী প্রবল এবং সহিংস না হয়ে আপসের চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে। ফলে সুভাষের পথ নয়, বরং গান্ধী-নেহ্‌রু-জিন্নাহ্‌র পথ ধরে ভারতবর্ষ এগিয়ে গেছে।


সুভাষ বসু আপস নয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের পথ দেখিয়েছিলেন। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করলে কতখানি অর্জন হতে পারে তা আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাস করে অনুভব করি। ’৭১-এ জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ না করে আমরা যদি আপসের মাধ্যমে পাকিস্তানের হাত থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র্র পেতাম তবে কি হ’ত? আমরা আর একটা পাকিস্তান পেতাম মাত্র। হাঁ, শেষ পর্যন্ত এক অর্থে বাংলাদেশও পাকিস্তান হয়েছে। খণ্ডিত ও ক্ষুদ্র পাকিস্তান। বিশেষ করে ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর বেশী রাখঢাক না করে পাকিস্তানকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।


তবু পাকিস্তান কালটাকে আর ঠিক সেই রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় নি। আজকের পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তুলনা করলে সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি এত কাল ধরে সেকিউলার বা লোকবাদী এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য যে লাগাতার আন্দোলন চলছে, বিরাট বিরাট রাজনৈতিক উলটপালট হয়েছে তার পিছনের শক্তিটা এসেছে বাঙ্গালীর জাতি চেতনার প্রকাশ স্বরূপ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে বাঙ্গালীর স্বাধীন, লোকবাদী ও গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে। ১৯৭১-এ যে যুদ্ধ হয় তা কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের একটা সম্প্রদায়গত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয় নি। তা হয়েছিল বাঙ্গালী জাতির এক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। অর্থাৎ ’৭১-এর মর্মে ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, যার মর্মে আবার ছিল লোকবাদ বা ‘সেকিউলারিজম’।


আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ’৭১-এ সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব চলে যায় আওয়ামী লীগের হাতে এবং নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন ভারত সরকারের হাতে, যারা এখানে বাঙ্গালীর একটি প্রকৃত জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা চায় নি। দিল্লীর ভূমিকা স্পষ্ট। কেন সেটাও স্পষ্ট। পূর্ব বাংলার বুকে বাঙ্গালী জাতির একাংশের একটি লোকবাদী ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাবটা ভারত রাষ্ট্রভুক্ত বাঙ্গালী জাতির অপরাংশের উপর কেমন হত সেটা বোঝার জন্য খুব বেশী বুদ্ধির দরকার হয় না। এবং মুজিবের ব্যাপারটাও বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাই মুজিব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে ধরা দেন।


আমরা বিবেচনায় মুজিবের অবদান ৬ দফা পর্যন্ত, যা ছিল স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী এবং সেটাও লাহোর প্রস্তাবের আলোকে। অর্থাৎ ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের বলয় তা ভেদ করে নি। প্রকাশ্য রাজনীতিতে সেকালে সেটা করা সম্ভবও ছিল না। সুতরাং ৬ দফার চেয়ে উন্নততর কর্মসূচী না থাকায় সে কালে সেটারই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মুজিব তো স্বায়ত্তশাসন পর্যন্ত; এবং সেটা পাকিস্তানের ধর্ম-সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই সীমিত।


কিন্তু জাতির স্বাধীনতার রাজনীতি এবং জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ ভিন্ন জিনিস। গুণগতভাবেই এটা ভিন্ন। আর তাই এ যুদ্ধে আওয়ামী লীগ এলেও তার মূল এবং প্রধান নেতা শেখ মুজিব আসেন না। তিনি বাড়ীতে বসে থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেন।


আর আমি দাঁড় করাতে চেষ্টা করি সুভাষের পাশে মুজিবকে। কিন্তু তা কি পারা যায়? সুভাষ অন্তরীণ বা বন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে যান ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত করা জন্য। আর মুজিব পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করার দায়িত্ব এড়াতে বাড়ী বসে থাকেন বন্দী দশা বরণ করার জন্য। আর মিথ্যা ও ফাঁকির এ দেশে সেই সত্য ঢাকার জন্য এত কাল ধরে মিথ্যার বাদ্য বাজানো হচ্ছে। এই মিথ্যার বাদ্যে মোহিত হবার মত মানুষের অভাব দুই বাংলাতেই নেই। দুর্ভাগ্য বাঙ্গালী জাতির! এ জাতি কি এতটাই মেধাশূন্য! এ জাতির বুদ্ধিজীবীরা আসলে কি বুদ্ধিমান নাকি বুদ্ধি ব্যবসায়ী মাত্র, যারা বুদ্ধির বাজারে চাহিদা অনুযায়ী মাল কেনাবেচা করে তেমন বুদ্ধিজীবী ?


রাজা গোপালের পর বাংলার শ্রেষ্ঠ বীর নায়ক হিসাবে আমি দেখি সুভাষকে। আর সুভাষের পর আমি যাকে দেখি তিনি হলেন ভাসানী। পরনির্ভর এবং পরের মুখে ঝাল খাওয়া বাঙ্গালী যেমন সুভাষের মূল্যায়ন করতে পারে না তেমন ভাসানীরও নয়।


পুর্ব বাংলায় বা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তো সুভাষের মুল্যায়ন আজো হবে না। কারণ সুভাষ হলেন হিন্দু(!)। আরবী- ফার্সী একটা নাম লাগানো থাকলে না হয় তাঁকে নিয়ে টানাহেচড়া করা যেত। কিন্তু সুভাষ বসু! না, ওটা চলে না। যাক, তবু পশ্চিম বাংলার লোকনেতারা তাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন অর্ধশতাব্দীরও পর।


কিন্তু এ বাংলায় তো ভাসানীরও সঠিক মূল্যায়ন আজ অবধি হয় নি। অসংখ্য বৈপরীত্য দিয়ে ঠাসা এই মানুষটা যে পাকিস্তান ভাঙ্গা এবং জাতীয় যুদ্ধ সংগঠনের পিছনে কত বড় শক্তি ছিলেন সেটাই বোঝা হল না আজ অবধি। এটা ঠিক যে ভাসানীর মধ্যে খুব বেশী বৈপরীত্য ছিল। লোকবাদ-জাতীয়তাবাদ যেমন ছিল, ইসলাম-সাম্প্রদায়িকতাবাদও তেমন ছিল। এ তো এই বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীরই বৈশিষ্ট্য। বিপুল বৈপরীত্যে পূর্ণ, আবেগপ্রবণ ও হুজুগে এবং নিদারুণভাবে পশ্চাৎপদ এক জনগোষ্ঠী যা কেবল জাতি হয়ে উঠছে তার ভিতর থেকে উঠে আসা নেতা যদি জনগোষ্ঠীর এই বৈপরীত্য কিছূ পরিমাণে হলেও ধারণ না করতেন তবে কী করে তার এত বড় জননেতা হতেন এবং এই জাতিকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতেন?


একটা জাতীয় যুদ্ধকে অনিবার্য করে তার আঘাতে পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর কৃতিত্ব কম ছিল না। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান না হলে কি ’৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ হত? হত না। আর এই ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান গড়ার কৃতিত্ব তাঁর চেয়ে বেশী আর কোন নেতার? স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম মহড়াটা তিনি জাতিকে দিয়ে করিয়ে নেন ’৬৮-’৬৯-এর উত্তাল জনজোয়ারের দিনগুলোতে। এ দিক থেকে দেখলে তিনি সুভাষের তুলনায় সফল। সুভাষ যুদ্ধ শুরু করলেও তার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন করতে পারেন নি। করতে পারলে কিন্তু আমরা ভিন্ন ভারতবর্ষ পেতাম এবং ভিন্ন বাংলাও।


আমার সুভাষকে নিয়ে দুঃখ এবং গৌরব দুই-ই আছে। শুধু তাঁর ব্যর্থতার জন্য যে দুঃখ তা নয়, উপরন্ত দুঃখ তাঁর প্রতি আত্মবিস্মৃত বাঙ্গালী জাতির উপেক্ষার কারণেও। এত বড় বীর এবং রাষ্ট্রনায়ক বাঙ্গালীর ইতিহাসে হাজার বছরেও আর জন্মায় নি। হাঁ, ঐ কারণে তাঁকে নিয়ে আমার গৌরব। যে কংগ্রেসী এবং কমিউনিস্টদের কারণে এক কালে তিনি স্বদেশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে পারেন নি আজ যখন তাদের মধ্য থেকেই তাঁর অবদানকে স্বীকার করা হয় তখন হৃদয়ে মিশ্র অনুভূতি জাগে। তবু ভাল যে, তাঁরা এত কাল পর সত্যটাকে স্বীকার করছেন। তবে তাঁদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের ব্যাপারটাও বোধ হয় নৈতিকভাবে এসে পড়ে এই সঙ্গে। সেই প্রায়শ্চিত্ত কি তাঁরা করবেন? করলে কীভাবে?
 

রচনাঃ ১৯৯৬


 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ