Banner
জারজ : একটি ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক ও মানবতাবাদী পর্যালোচনা -- মুহাম্মদ হুসেন

লিখেছেনঃ মুহাম্মদ হুসেন, আপডেটঃ August 12, 2009, 12:00 AM, Hits: 15552

সম্প্রতি মুশফিক প্রধান সাহেব ভিন্নমত (vinnomot.com)-এ মানবতাবাদী নাস্তিক - যারা মুক্তমনা ও ভিন্নমত নামে ইন্টারনেটে বিচরণ করে - তাদেরকে জারজ আখ্যা দিয়ে যার পর নাই আনন্দ লাভ করেছেন। তিনি বলেনঃ যারা ইসলাম/ধর্ম নিয়ে অযৌত্তিক , মন গড়া ধার করা অহেতুক সমালোচনা করেন, তাদের বলছি, ধর্মের পবিত্র মন্ত্র পড়ে আপনাদের বাবা-মার বিয়ের পর যখন আপনার জন্ম হয়, তখনি শুধু আপনার জন্ম সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। ধর্মীয় প্রথাকে পাশ কাটিয়ে নারী-পুরুষের মিলনে যে সন্তান জন্ম নেয় , তাকে সমাজ জারজ হিসাবে ডাকে। তাই বলছি, ধর্মকে গাল দিয়ে নিজের জন্মকে কলংকিত করবেন না। ধর্মকে গাল দিয়ে নিজের জন্মকে কলঙ্কিত করবেন না - এই বাক্যটি লক্ষ্যণীয়; অর্থাৎ মুশফিক সাহেব এখানে বুঝিয়েছেন, ’ধর্মকে গাল দিয়ে নিজেকে জারজে পরিণত করবেন না।’ প্রথমে এখানে বলে রাখা আবশ্যক যে, ধর্মের ক্ষতিকর ও দুর্বল দিকগুলোর সমালোচনাকে মুশফিক প্রধানের মত ধার্মিকেরা ধর্মকে গালি হিসেবে গণ্য করে। যাহোক, জারজ বলতে মুশফিক সাহেব ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত রীতিনীতি মুতাবেক বিয়ে-বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে যে সন্তানের জন্ম হয় তাকেই জারজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সন্তানের বৈধতার জন্য যদি ধর্ম অনুমোদিত বিয়েরই দরকার পড়ে তাহলে একটা বিষয় পরিষকার হওয়া প্রয়োজন যে, যেখানে ধর্মের অনুমোদন দরকার সেখানে স্রষ্টার অনুমোদনটিও আপনা-আপনিই চলে আসে। কাজেই ঐসব বিবাহ-ই বৈধ যার পিছনে সত্যকার ধর্মের, তথা সত্যিকার স্রষ্টার, অনুমোদন রয়েছে। যে ধর্ম সত্য নয়, সে ধর্মের সৃষ্টিকর্তাও সত্য নয় । কাজেই সে ধর্মের অনুমোদন বা আশীর্বাদ কোন বিয়ের বৈধতা দান করতে পারে না, কেননা মিথ্যা স্রষ্টার আশীর্বাদ বিয়েকে মৌলিক অর্থে বৈধ করতে পারে না। বরং সত্যিকার স্রষ্টা ঐসব মিথ্যা ধর্মকে ধর্ম বলে দাবী করায় বা বিয়ের মত পবিত্র কর্মের বৈধতা দানের প্রচেষ্টাতে যে সাতিশয় রাগান্বিত হবেন সেটাই যুক্তিযুক্ত।


যেহেতু মুশফিক প্রধান সাহেবের পবিত্র ইসলাম ধর্ম সত্যধর্মের দাবীদার এবং সম্ভবত ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম ছাড়া অন্য  কোন ধর্মকে স্বীকার করে না, কাজেই কোনক্রমেই বিশ্বের দুইশ’ কোটিরও বেশী হিন্দু-বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের মানুষের বিয়ে অবৈধ এবং সেই সূত্রে বিশ্বের সকল হিন্দু-বৌদ্ধরা মৌলিক অর্থে জারজ। এখানে আরও বিবেচনা করা আবশ্যক যে, ইসলামের মহানবীর জন্ম হয়েছিল মক্কার পৌত্তলিক ধর্মানুসারী পরিবারে। তাদের সে ধর্ম কোন ধর্ম ছিল না বরং সেটা বোধ হয় ছিল চরম অধর্ম। তাই আল্লাহ সেই চরম অধর্মের প্রতি এতই রাগান্বিত হয়েছিলেন যে, তিনি সেই ধর্মকে সমূলে ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-কে। উল্লেখ্য তৎকালে, পৃথিবীর বহু দেশে শত শত মিথ্যা ধর্ম প্রচলিত ছিল। সেগুলোর মধ্যে ভারতসহ অন্যান্য জায়গায় বহু পৌত্তলিক ধর্মও বিদ্যমান ছিল। অথচ আল্লাহ তা’লা একমাত্র মক্কার পৌত্তলিক ধর্মকে সমূলে বিনাশ করার জন্য সুসপষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন তারই প্রেরিত শ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সঃ)-কে। তার মানে দাঁড়ায়, মক্কার পৌত্তলিক ধর্ম শুধু মিথ্যা ধর্মই ছিল না, সে ধর্ম আল্লাহ তা’লার কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্যতম ধর্ম ছিল। অথচ ইসলামের বহু কৃতিপুরুষ মহানবী মুহাম্মদ (সঃ), ওমর, আলী, আবুবকর (রাঃ) প্রমুখদের পিতামাতার বিয়ে হয়েছিল সেই চরম মিথ্যা ও জঘন্যতম পৌত্তলিক ধর্মের নীতি-রীতি মুতাবেক। কাজেই, ঐসব বিয়ে কোনক্রমেই বৈধ বিয়ে ছিল না, বরং ছিল চরম অবৈধ। সেই সূত্রে মহানবী মুহাম্মদ (সঃ), ওমর, আলী, আবুবকর (রাঃ) - এরা সবাই জারজ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য কিনা সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।


জারজ বিষয়ে ধর্মের অবস্থান


এবার জারজ সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্ম কি রায় দেয় সেটা আলোচনা করা যাক। মৌলিক বিবেচনায় ইসলাম, খ্রীষ্টান, ইহুদী ইত্যাদি ধর্মগুলোর ভিত্তিই হছে জারজত্ব বা জারজত্ব দিয়েই এসব ধর্মগুলোর শুভাযাত্রা। যেমন ইসলাম ধর্মকে একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যায় যে, জারজত্ব দিয়েই ইসলামের ভিত্তি রচিত। ইসলাম বলে আল্লাহ আদমকে প্রথম পুরুষ ও মানব হিসেবে সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তীতে আদি-রমণী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন মূলত আদমকে মনোরঞ্জন দানের জন্য। কলেমা পড়িয়ে আদম-হাওয়ার মাঝে বিয়ে হওয়ার কথা কোরান-হাদীসে কোথাও বলা নেই। কাজেই আদম-হাওয়ার মাঝের সম্পর্ক বৈধ কিনা বিবেচনার বিষয়। কোন কোন কাহিনীমতে, আদম-হাওয়া নাকি ৭১৯ জন পুত্র-কন্যার জন্ম দিয়েছিয়েল। আবার আরেক কিচ্ছামতে আদম-হাওয়ার ২৩৯ জন পুত্র-কন্যা জন্মগ্রহণ করে। আদম-হাওয়ার  ছেলেমেয়েদের (ভাই-বোনের) মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক, অর্থাৎ অজাচার বা incest -এর মাধ্যমেই মানুষের বংশবৃদ্ধি হতে থাকে। আদম-হাওয়া তাদের সন্তানদেরকে জোড়া বাঁধিয়ে বিয়ে দিয়ে থাকলেও ভাই-বোনের মাঝে দৈহিক সম্পর্ককে অজাচার বা incest-ই বলতে হবে যাকে আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা ঘৃণার চোখে দেখেছে। আর incest -এর মাধ্যমে জন্ম নেওয়া আদম-হাওয়ার নাতি-পুতিরা অবশ্যই জারজ বলে গণ্য হবে। কাজেই অবৈধ যৌন-সম্পর্ক ও জারজত্বের উপরই ইসলামের ভিত্তি রচিত। আর সে কারণেই আজকের মানবজাতি এই পৃথিবীতে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।


খ্রীষ্ট-ধর্মের কাহিনীও তো ঠিক ইসলামেরই অনুরূপ ঃ আদি নারী-পুরুষ Adam ও Eve  ঠিক যেমনটি আদম ও হাওয়া। তবে কোন কোন কিচ্ছা-মতে খ্রীষ্টধর্মে স্বীকৃত যৌন সম্পর্ক আরও আশ্চর্যজনক ও গ্রহণ-অযোগ্য। এক কাহিনীতে শোনা যায়, Adam ও Eve -এর ঔরসে নাকি মাত্র দু’জন ছেলে-সন্তানের জন্ম হয়েছিল। সেটাই যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে ছেলে আর মায়ের মাঝে ঘটিত জঘন্যতম অজাচার বা incest-এর মাধ্যমে মানুষের বংশবৃদ্ধি হয়েছে ও তারই আশীর্বাদে মানবজাতি আজকের এই সুন্দর পৃথিবীতে আগমনের সুযোগ পেয়েছে। এ কিচ্ছা সত্যি না হলেও, Adam ও Eve--এর ঔরসে জন্ম নেওয়া ছেলে-মেয়ে অর্থাৎ ভাই-বোনদের মাঝে ঘটিত অজাচার থেকেই মানবজাতির শুভাযাত্রা। ইহুদী ধর্মানুসারেও আদি মানব-মানবী আদম ও লুসি এবং তাদের সন্তানদের মাঝে অজাচারের মাধ্যমে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি হয়েছে। ইহুদী ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা (Jew Patriarch) ও ইসলামের মহানবী ইব্রাহীমের (আব্রাহামের) পুত্র ইসমাইল (রাঃ), যাকে ইসলাম ধর্ম একজন উঁচু-দরের নবী হিসেবে সমমান দেয়, তিনিও ’হাযার বা হাযেরা’ নামক এক ক্রীতদাসীর সন্তান জারজ ছিলেন।


এটাও এখানে বিবেচনা করা প্রয়োজন যে, বিজ্ঞানমতে খ্রীষ্টধর্মের প্রবর্তক যীশু খ্রীষ্টের জন্মও অবৈধ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য, কেননা মানব পুরুষের বীর্য ও নারীর রজঃ এই দু’য়ের সমন্বয় বিনা মানব সন্তানের সৃষ্টি সম্ভব নয়। অথচ কপট খ্রীষ্ট ধর্ম ঈশ্বরকে যীশুর পিতা বলতে চেয়েছে। বস্তুত বিজ্ঞানানুসারে যীশু জারজ সন্তান। আর সে কারণেই হয়ত যীশু খ্রীষ্ট জারজ সন্তানদেরকে ঘৃণা করাকে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। খ্রীষ্ট ধর্মের কোন কোন গোষ্ঠী আজও জারজ সন্তানদের বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে ু যেমন পাদ্রি নিয়োগ করা। অর্থাৎ খ্রীষ্ট ধর্মের ভিত্তিই শুধু অজাচার ও জারজত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তার প্রাণপুরুষও জারজত্বেরই প্রতিফল। জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাবীর ও পারস্যের ’যরোস্টারিজম’ (Zoroasterism) ধর্মের প্রবক্তা Zoroaster-এর জন্ম সম্পর্কেও যীশু খ্রীষ্টের জন্মের মতই কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়।


কাজেই জৈন ও Zoroasterism ধর্ম দু’টিও মূলত জারজত্বের উপরই প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে, পারস্য Zoroasterism  ধর্মে অজাচার অর্থাৎ ভাই-বোন, বাপ-মেয়ে বা মা-ছেলের মাঝে বিয়েকে বেশ সমমানের চোখেই দেখা হত। অনেক রাজ-পরিবার অজাচারেরই ফসল ছিল। তবে সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ এ ধরনের সম্পর্ক বর্জন করতে থাকে।


হিন্দু ধর্মে অজাচার জারজত্ব


অজাচার বা মষধপঢ়য় শুধুমাত্র আব্রাহামীয় ধর্মগুলোতেই সীমাবদ্ধ নহে, হিন্দু ধর্মের ভিত্তিও মূলত অজাচার ও জারজত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। কেননা, হিন্দু ধর্মে আদি পুরুষ মনু। কাজেই, মনু ও আদি নারী থেকে যেসব মানব সন্তান জন্মে, সেসব ভাই-বোনদের মাঝে অজাচারের মাধ্যমেই মানব সভ্যতার আদি যাত্রা। হিন্দু ধর্মে অজাচারের আরো ঘটনা রয়েছে। যেমন, যম ও যমী ভাইবোন অথচ যমী যমের সাথে দৈহিক সম্পর্ক কামনা করেছে। ’দশরথ জাতক’-এ বর্ণিত আছে, রাজা দশরথ ও রানী কৌশল্যার মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্ক ছিল, তথাপি তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল। ঋগ্বেদ-এ দেখা যায় -  দম্ভ নিজ বোন মায়াকে, লোভ নিজ বোন নিবৃত্তিকে, ক্রোধ নিজ বোন হিংসাকে ও কলি নিজ বোন নিরুক্তিকে বিয়ে করেছিল। কাজেই দেখা যায়, হিন্দু ধর্মে ঘৃণ্য অজাচারের ছড়াছড়ি। বৌদ্ধ জাতকে ও জৈন সাহিত্যেও ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের কথা উল্লেখ আছে।


শুধু ভাই-বোন নয়, হিন্দু ধর্মে মা-ছেলে (ইদিপাস কমপ্লেক্স) বা পিতা-কন্যার (ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স) মধ্যে দৈহিক সম্পর্কের স্বীকৃতিও দেখা যায়। ঋগ্বেদ-এ উল্লেখ আছে -  ’পূষণ তার বিধবা মাকে বিয়ে করে দ্বিধিষু অর্থাৎ বিধবার স্বামী হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র ’মৎস পুরাণ’-এ বর্ণিত আছে -  ’ব্রহ্মা নিজ কন্যা শতরূপার প্রতি প্রণয়াশক্ত হন এবং হিন্দুদের আদি মানব মনুর জন্ম হয় ব্রহ্মা আর শতরূপার মিলন থেকেই।’ হিন্দু পুরাণে জারজত্বের আরও উদাহরণ পাওয়া যায়। হিন্দুশাস্ত্র বলে, পঞ্চ পাণ্ডবের মা কুন্তি ও মাদ্রি ’দেবতা’-দের বীর্যে সন্তানবতী হন। সেই দেবতারা যে মর্ত্যলোকেরই মানুষ সেটা বুঝতে আর কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।


ইসলাম ধর্মে জারজত্ব :


ঐ-দিকে ইসলাম ধর্ম তো জারজ সন্তানদেরকে রীতিমত স্বীকৃতি দিয়েছে। বিয়ে সম্পর্কে আল-কোরানে বলা হয়েছেঃ  YUSUFALI: If ye fear that ye shall not be able to deal justly with the orphans, Marry women of your choice, Two or three or four; but if ye fear that ye shall not be able to deal justly (with them), then only one, or (a captive) that your right hands possess, that will be more suitable, to prevent you from doing injustice (004.003).


অর্থাৎ তোমরা যদি এতিমদের সাথে সুব্যবহার করতে পারবে না মনে কর, তাহলে তোমাদের পছন্দের মেয়েদের মধ্য থেকে ২, ৩ বা ৪ জনকে বিয়ে কর। কিন্তু যদি সুবিচার করতে অপারগ হবে মনে কর, তবে কেবল একটা বিয়ে কর অথবা তোমার দক্ষিণ হস্তে যা আছে তা নিয়েই সুখী হও।


এখানে ’’দক্ষিণ হস্তে যা আছে’’ বলতে তৎকালীন প্রথানুযায়ী দাসী (captive/slave woman-কে বুঝানো হয়েছে। এই পবিত্র আয়াতে ইসলাম ধর্ম মালিক (master)-কে তার দাসীদের সাথে অবাধ দৈহিক মিলনের অধিকার দিয়েছে সুসপষ্টভাবে। আর সেই সূত্র ধরে বাংলাদেশসহ গরীব দেশগুলো থেকে যে প্রচুর সংখ্যক মেয়েরা আরব দেশে শেখদের বাড়িতে কাজ করতে যায়, তাদের অনেককেই মালিকের সাথে দৈহিক মিলনে শামিল হতে হয়, যদিও অনেক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শেখরা এ ধরনের বর্বর অনুশাসন চর্চা থেকে বিরত থাকছে।


ইসলামের মহানবীকেও দাসীদের সাথে দৈহিক মিলনে প্রবৃত্ত হতে দেখা যায়। যেমন, মহানবী মুহাম্মদ (সঃ) যখন মক্কা জয়ের পর একে একে আরব দেশগুলোকে মুসলমানদের করতলে নিয়ে আসে, তখন ইসলামী সৈন্যরা যুদ্ধ কর্মে এতই বলীয়ান ও উৎফুল্ল যে, মহানবী দূত প্রেরণ করেন মিশর ও সিরিয়ার রাজার কাছে ইসলামের কাছে মাথানত করতে এবং ইসলামে দীক্ষিত হতে। সেটা না করলে যুদ্ধের হুমকি দেওয়া হয়। এতে সিরিয়ার শক্তিশালী খৃষ্টান রাজা রাগান্বিত হয়ে উঠেন। কিন্তু মিশরের রাজা ভয় পেয়ে যান ও মহানবীকে খুশী করার জন্য দুই অতি সুন্দরী ক্রীতদাসী বোনকে দূতের সাথে প্রেরণ করেন। মহানবী ঐ সুন্দরী ক্রীতদাসী বোনদ্বয়ের মধ্য থেকে মারিয়া নামক সুন্দরতর বোনটিকে পছন্দ করেন নিজের জন্য। আর সে কারণেই হয়ত তিনি জীবিত থাকাকালে মিশর আক্রমনের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন নি। অথচ সিরিয়া আক্রমণের জন্য তিনি অভিযান চালিয়েছিলেন, অপ্রস্তুত গ্রীক  সৈন্যদের উপর ঝটিকা আক্রমণের অভিপ্রায়ে। কিন্তু আগাম খবর পেয়ে শক্তিশালী গ্রীক সৈন্যরা সীমান্তে প্রস্তুতি নেয় এবং মহানবী ভয়ে সেখান থেকে পিছ-পা হয়ে দলবল নিয়ে ফিরে আসেন।


যাহোক, পরবর্তীতে সেই দাসী মারিয়ার গর্ভে মহানবী এক পুত্র সন্তান লাভ করেন, যার নাম রাখা হয়েছিল ইব্রাহীম। কিন্তু ঐ পুত্র সন্তানটি খুব বেশীদিন বাঁচেনি। সন্তানটির মৃত্যুতে মহানবী বুক চাপড়ে ও মাটিতে গড়াগড়ি গিয়ে বেমালুম কান্নাকাটি করেন। বিবি খোদেজার গর্ভে জাত মহানবীর অনেকগুলো সন্তান অকালে মারা যায়। কিন্তু তিনি এমন কান্নাকাটি বা আহাজারি কখনো করেছেন বলে নজীর পাওয়া যায় নি।


এখানে বিবেচ্য বিষয় হল, যুদ্ধবন্দী দাসী বা ক্রীতদাসীর সাথে মালিকের যৌন সম্পর্ক বিয়ের বৈধতা বহির্ভুত। কাজেই, দাসী মারিয়ার ঔরসে জাত মহানবীর ঐ সন্তানটি অবশ্যই জারজ বলে গণ্য হবে, অথচ সেই জারজ সন্তানের প্রতি নবী মুহাম্মদ (সঃ) এমন পিতৃত্ব দেখিয়েছেন, যেটা তিনি নিজের বৈধ সন্তানদের অকাল মৃত্যুতেও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী শুধু জারজ সন্তানকে স্বীকৃতি-ই দেননি, তিনি স্বয়ং অন্তত এক জারজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। আর সেই সূত্র ধরেই হয়ত মুসলিম আইনে জারজ সন্তান ’ওয়ালদুযযিন’ শুধু তার মায়ের এবং মাতৃ-সম্পর্কিত ব্যক্তিদেরই উত্তরাধীকারী হতে পারে।

একটি হাদীসে আছে, একজন হানাফী স্ত্রী মৃত্যুকালে তার স্বামী ও বোনের মিলনজাত একটি জারজ সন্তানকে রেখে যান। এক্ষেত্রে ঐ সন্তান উক্ত হানাফী স্ত্রীর রেখে যাওয়া অর্ধেক সম্পত্তির মালিক হয়, বাকী অর্ধেক যায় স্বামীর ভাগে। শিয়া ইসলামের মতে, জারজ ব্যক্তির স্ত্রী কিংবা স্বামী এবং তার বংশধররা যথারীতি উত্তরাধীকারী হবে।


মুসলিম আইনে শুধুমাত্র জারজদেরকে স্বীকৃতি-ই দেওয়া হয়নি বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উচ্চাসনে বসিয়েছে অনেক জারজ সন্তানদেরকে। এমনকি ইসলামের অনেক খলীফাও জারজ ছিলেন এবং তাদের কয়েক জনের নাম এখানে উল্লেখ করা হল। প্রখ্যাত ইসলামী ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদ প্রফেসর মাসুদুল হাসানের ’’ইসলামের ইতিহাস’’ গ্রন্থ থেকে ((Prof. Masudul Hasan, History of Islam, Part-1, pp. 248 to 262)W


১) খলীফা মুতাজিদ, শাসনকাল ৮৯২-৯০২ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি সায়াব নামক এক গ্রীক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

২) খলীফা মুক্তাফি, শাসনকাল ৯০২-৯০৭ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি জিজাক নামক এক তুর্কী দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৩) খলীফা মুক্তাদির, শাসনকাল ৯০৭-৯৩২ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি সা’আব নামক এক তুর্কী দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৪) খলীফা আল-কাহির, শাসনকাল ৯৩৩-৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি ফিতনাহ নামক এক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৫) খলীফা আল-রাদি, শাসনকাল ৯২৪-৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি দালুম নামক এক গ্রীক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৬) খলীফা মুত্তাকি, শাসনকাল ৯৪০-৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি জোহরা নামক এক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৭) খলীফা মুস্তাকফি, শাসনকাল ৯৩৩-৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দ। তার মা আমলাহ-উন-নাস (জগতের সবচেয়ে সুন্দরী) এক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।


কাজেই ইসলামের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন, ইসলামের মহানবীর জীবনী, ইসলামী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইন এবং ইসলামের ইতিহাসের পরতে পরতে জারজ সন্তানের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সুসপষ্ট। সুন্নী ইসলাম মতে সেই শ্রেষ্ঠ মুসলিম যিনি কোরআন এবং আদর্শ মহামানব মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন ও কার্যক্রমকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন।


কাজেই আমাদের সুন্নী মুসলিম ভাই মুশফিক প্রধান সাহেব যদি ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ মুসলিম হতে চান, তাহলে তাকে মহানবীর জীবনের অনুসরণে অন্তত একজন জারজ সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে সমমান, স্নেহ ও আদরের সাথে লালন করতে হবে। অথচ সেই মুশফিক সাহেব তারই প্রাণপ্রিয় ইসলাম ধর্ম ও ইসলামের প্রাণ-পুরুষ মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর দর্শন ও আদর্শকে লাথি মারলেন জারজদেরকে ঘৃণ্য ও অবজ্ঞার পাত্র আখ্যা দিয়ে। মুশফিক প্রধান সাহেব পরকালে জাহান্নামের আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরার ব্যবস্থা করলেন মাত্র।


বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অজাচার ও জারজত্ব


আলোচনার এ পর্যায়ে এটা সুসপষ্ট যে, হিন্দু, ইসলাম, খ্রীষ্টান ও ইহুদী ইত্যাদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মগুলোর মতে অজাচার ও জারজত্বকে আশ্রয় না করে মানব জাতি আজকের এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে নি। অথচ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অজাচার ও জারজত্বকে আশ্রয় না করেও মানবজাতি আজকের এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। এ প্রস্তাবটিকে ব্যাখ্যা করার পূর্বে কিছু আনুসঙ্গিক বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন। মহাবিজ্ঞানী ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে নিচু স্তরের প্রাণীদের থেকে অত্যন্ত ধীর-গতিতে বিন্দু বিন্দু পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমরা নিচু-স্তরের প্রাণীদের মাঝে পিতা-মাতা ও তাদের সন্তানদের মাঝে যৌন মিলনকে অজাচার হিসেবে গণ্য করি না, কিংবা করি না এমন যৌন-সম্পর্ক থেকে জাত সন্তানদেরকে জারজ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ আজকের যুগের মানবেতর প্রাণীদের মাঝে অজাচার বা জারজ বলে কিছু নেই বা মানবেতর প্রাণীকুলের মাঝে অজাচার বা জারজত্ব বৈধ বা জায়েজ। বিজ্ঞানমতে, আমাদের সুদূর অতীতের পূর্ব-পুরুষরা যখন মানবেতর প্রাণীকুলের প্রবৃত্তির কাছাকাছি ছিল, তখন তাদের মাঝে অজাচারের মত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল বা থাকতে পারে। আজ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে বিদ্যমান আমাদের পূর্ব-পুরুষদের যেসব ’ফসিল’ (Fossil) পাওয়া যায়, তাদের দেহাকৃতি আমাদের আধুনিক মানুষের দেহাকৃতি থেকে ভিন্ন ছিল। এবং সপষ্টত তাদের মেধা, চিন্তা-চেতনা ও মানবিক প্রবৃত্তি আধুনিক মানবের থেকে অনেক নিচু-স্তরের বা পশু-প্রবৃত্তির কাছাকাছি ছিল। আমাদের ঐসব আদি পুরুষদের মাঝে অজাচারের মত ঘটনা ঘটে থাকতেও পারে। কিন্তু সেটাকে অজাচার বলা যাবে না, যেমন করে আজকের যুগের মানবেতর প্রাণীদের মাঝের সম্পর্ককে অজাচার বলা হয় না। কিন্তু ঐ আদি-পুরুষেরা যখন ক্রমেই আধুনিক সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে থেকে, তারা নিকটাত্মীয়দের মাঝে যৌন সম্পর্ককে বর্জন করতে থাকে।


বিবর্তনবাদ অনুসারে আজকের যুগে মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হচ্ছে গরিলা (gorrilla)। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, শিকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আটককৃত এক গরিলা দু’টি সন্তান ু একটি পুরুষ ও আরেকটি নারী - জন্ম দেয়। উক্ত গরিলা সন্তান দু’টি যখন বড় হয়ে যৌবনে পদার্পণ করে, তখন মেয়েটি তার ভাইয়ের প্রতি প্রণয়াসক্তি প্রকাশ করে কিন্তু ভাইটি সেটা গ্রহণ করে না। এ নিয়ে গবেষকগণ বিশেষ চিন্তায় পড়ে যান। পরবর্তী সময়ে সেখানে অন্য আর একটি মেয়ে গরিলাকে আনা হলে, এবার ঐ পুরুষ গরিলাটি নূতন আগন্তুকের প্রতি প্রণয় প্রকাশে পাগল হয়ে উঠে। আপন বোন হওয়ার কারণে পুরুষ গরিলাটি নিজ বোনের প্রণয়কে প্রত্যাখ্যান করে। এভাবেই হয়ত মানুষ ক্রমান্বয়ে অজাচারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই আজকের পৃথিবীতে ধর্মে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সুসভ্য-অসভ্য সকল মানুষই সাধারণত অজাচারকে বর্জন করে। আর বিজ্ঞান তো রীতিমত অজাচার জাতীয় সম্পর্ককে বর্জনীয় আখ্যা দিয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণেই। কেননা অজাচার জাতীয় সম্পর্ক জিনেটিক (genetic) ত্রুটি বা রোগকে ত্বরান্বিত করে, যা মানব বংশলতিকার জন্যে ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য, সৌদি আরবে রাজপরিবারে বৈবাহিক সম্পর্ক আজ পর্যন্ত নিকট আত্মীয়দের মাঝে সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং তার প্রতিফল হিসেবে আজ সৌদি-রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে কিছু কিছু জিনেটিক রোগের লক্ষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে।


অর্থাৎ বিজ্ঞান জিনেটিক তত্ত্বের ভিত্তিতে অজাচারকে আশ্রয় দেয় না। ইসলাম, ইহুদী, খ্রীষ্টান ইত্যাদি ধর্মগুলো যদিও মানব জাতির সূচনাকে কেন্দ্র করে পরোক্ষভাবে অজাচারকে সমর্থন করে, তথাপি এ সব ধর্মগুলোও অজাচারকে সুসপষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কাজেই আজকের এ সভ্য জগতে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলেই অজাচার জাতীয় সম্পর্ককে বর্জন করেছে। তথাপি এ ধরনের যৌন-বিকৃতির ঘটনা কদাচিৎ ঘটে থাকে প্রত্যেক সমাজেই বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে। যেমন, বাংলাদেশের মত ধর্মশীল সমাজেও সত্তরের দশকের শেষ দিকে ঢাকার পত্র-পত্রিকায় এ ধরনের একটা ঘটনার খবর ছাপা হয়েছিল যাতে দুই মেয়ে পিতাকে অভিযুক্ত করেছিল। অন্যান্য সমাজেও এ ধরনের ঘটনার খবর মাঝে-মধ্যে ঘটে এবং পত্র-পত্রিকায় তার খবর আসে।


এখন এটা সুসপষ্ট যে, ধার্মিক-অধার্মিক সবাই আজকের যুগে অজাচারকে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে বা ঘৃণা করে নৈতিক বিচারে এবং আধুনিক বিজ্ঞানও সেটাকে সমর্থন করেছে যথার্থ বৈজ্ঞানিক কারণেই। কাজেই অজাচারের মাধ্যমে জাত সন্তানদেরকেও বিজ্ঞান একদমই সমর্থন করে না, যদিও মৌলিক বিচার-বিশ্লেষণে বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই অজাচারকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে এবং অজাচার-জাত সন্তানদেরকে আধুনিক মানব-সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে রায় করে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও ’’অজাচারের মত ঘটনা’’ মানব সভ্যতার ভিত্তি; কিন্তু প্রকৃত বিচারে ঐ সব ’অজাচারের মত ঘটনা’-কে অজাচার বলা যায় না। কেননা সেই সুদূর অতীতে যখন আমাদের আদি-পুরুষদের মাঝে অজাচার ঘটেছে, বিজ্ঞানমতে সে সময়ে মানুষ বর্তমান যুগের মানুষের তুলনায় অসভ্য প্রাণীদের কাছাকাছি ছিল, যাদের মাঝে ঘটিত অজাচারকে প্রকৃত বিচারে অজাচার বলা যায় না। কিন্তু ধর্মীয় দর্শন বলে স্রষ্টা যে প্রথম মানব সৃষ্টি করেছিলেন - আদম ও হাওয়া, ঈভ বা লুসি - তারা সুসভ্য ছিল; অর্থাৎ তাদের নৈতিক দায়-দায়িত্ব আধুনিক যুগের মানুষের অনুরূপ ছিল। সেই প্রথম মানবদের জন্যে বিশ্বাসীদের কথিত স্রষ্টা যে ধর্মীয় ও নৈতিক বিধান প্রণয়ন করেছিলেন, ধর্ম-গ্রন্থে বর্ণিত সেই সব নৈতিক বিধি-বিধানকেই ধার্মিকরা বর্তমান যুগের মানব জাতির নৈতিক বিধি-বিধান মনে করে। কাজেই আল্লাহ, গড  (God), জেহবা (Jehova, ইহুদী ঈশ্বর) প্রথম মানব-মানবী আদম-হাওয়ার জন্য যে নৈতিক বিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সেই বিধানই যদি আজকের আধুনিক মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়, তাহলে আদম-হাওয়ার সন্তানদের মাঝে বা মা ঈভ ও তার দু’টি মাত্র ছেলে সন্তানের মধ্যে (খ্রীষ্ট ধর্মমতে) যে অজাচার জাতীয় যৌন-সম্পর্ক ঘটেছে, যাকে বর্তমান মানব সভ্যতার ভিত্তি ধরা হয়, তাকে অবশ্যই অজাচার আখ্যা  দেওয়া হবে।


পুরুষতন্ত্র সৃষ্টজারজ’ : নারীর জন্য অভিশাপ


সন্তান সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুরুষ কেবল ক্ষণিকের দৈহিক মিলনে শুক্রদাতা বা বীজ বপনকারী। বীজ বপন করেই পুরুষের দায়িত্ব শেষ কিন্তু নারী দশ মাস সেই বীজকে পেটে ধারণ করে প্রসব করেন তার সন্তানটি । সেখানেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না, ভূমিষ্ঠ করার পরও মাকে দীর্ঘ সময় বুকের দুধ পান করিয়ে সে সন্তানকে লালন করতে হয়। অথচ যখন সন্তানের পরিচয়ের ব্যাপার আসে, তখন পিতা হয়ে যান মুখ্য, সন্তান মায়ের নামে পরিচিত হয় না সমাজে। অথচ শুধু দশ মাস পেটে ধারণ ও ভূমিষ্ঠ পর লালন-পালনই নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে সন্তানের জন্মদানে নারীর জেনেটিক (Genetic) অবদানও ত্থবশী। কেননা, মানুষের জন্য অপরিহার্য মাইটোকন্ড্রিয়াল (mitochondrial) কেবল মায়ের ডিম্বাণু থেকে আসে (পিতা ও মাতা সম-পরিমাণ নিউক্লিয়ারDNA দান করেন)। অথচ যখন সেই সন্তানের পরিচয়ের পালা আসে, পিতা পান একচ্ছত্র অধিকার - মায়ের কোনই ভূমিকা নেই সন্তানের পরিচয়ে। যাহোক, না হয় সেটাও মানা গেল। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এর ব্যতিক্রম করেছে, অর্থাৎ মাকে সন্তানের পরিচয়ে একচ্ছত্র অধিকার দিয়েছে কেবলমাত্র বিয়ে-বহির্ভূত বা তথাকথিত ’’জারজ সন্তান’’-এর ক্ষেত্রে। এবারে পিতৃতন্ত্র সন্তানের পরিচয়ের দাবী করতে দৌড়ে আসে নি, না দেখিয়েছে ঐ সন্তানের পিতৃ-পরিচয় খোঁজার জন্য আগ্রহ - ঐ  সন্তানের পরিচয় ও সকল দায়-দায়িত্বের ভার বর্তিয়েছে মায়ের উপর। নারীর প্রতি চিরাচরিতভাবে নির্মম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই ব্যতিক্রমটুকুকে কেউ কেউ পুরুষের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি করুণার আভাস (gesture) হিসেবে দেখার প্রয়াস পেতে পারে। কিন্তু সেটা সত্যি নয়, বরং আসল ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।


জারজ-এর ধারণা সম্পূর্ণরূপে পিতৃতন্ত্র কতৃক সৃষ্ট এবং নারীকে সামাজিকভাবে আরেক ধাপ অবদমিত করার ও নারীকে কেবলমাত্র পুরুষের হাতের পণ্য বা পুতুলে পরিণত করার এক মর্মঘাতী ব্যবস্থা মাত্র। আসলে জারজের ধারণা নারীকুলের জন্য এক মহাঅভিশাপ। জারজ সন্তানের পুরো দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ মায়ের এবং পুরুষতন্ত্র জারজ সন্তানকে করেছে অবজ্ঞা, ঘৃণা আর দিয়েছে ধিক্কার, আর সেই সাথে সমাজে প্রচণ্ডভাবে ধিকৃত ও নিগৃহীত হয়েছে জারজ সন্তানের মা। পিতৃতন্ত্র সেই জারজের পিতা কে, তা নির্ণয় করতে আগ্রহী হয়নি ও পিতার উপর সেই তথাকথিত অপকর্মের দায়ভার চাপানোর তেমন প্রয়াস করে নি। জারজ সন্তান ও তার মা সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত, অবাঞ্ছিত ও ধিকৃত। শুধু তাই নয়, পুরুষতন্ত্র নারীর প্রতি তার নগ্ন নির্মমতা দেখাতে আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। যেমন ইসলামের মৌলিক আইন ’শারিয়া বা শরিয়ত’ মতে, জারজ সন্তানের মাকে পৃথিবীতে বাঁচার, অধিকার থেকেও বঞ্চিত কর হয়েছে ঃ জারজ সন্তানকে দুধ পানের পর্ব অতিক্রম করার পর তার মাকে বর্বর ও নির্মমভাবে পাথর ছুড়ে জনসমক্ষে জ্যান্ত মেরে ফেলার রায়ও দিয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, নাইজেরিয়াতে সম্প্রতি আলোড়ন জাগিয়েছিল ’’আমিনা লাওয়াল’’ নামক এক জারজ মা, যাকে শারিয়া অনুসারে পাথর ছুড়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ইরানে এক তের বছরের অবুঝ মেয়ে ঝিলা গর্ভবতী হয়ে পড়লে সেই সন্তানকে তার কুমারী মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ও ঐ তের বছরের অবুঝ মাকে পাথর ছুড়ে জ্যান্ত মেরে ফেলার রায় দেওয়া হয়েছে।


জারজের ধারণাটি পুরুষতন্ত্র কতৃক নারীর কায়-মনের উপর একচ্ছত্র অধিকার অর্জনের এক নির্মম চক্রান্ত মাত্র, যার মাধ্যমে সে নারীকে কেবলমাত্র তার বিবাহিত স্বামীর ভোগ্য-পণ্য হওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বিবাহের পর স্বামী বিনা অন্য পুরুষের সাথে নারীর কায়-মনের সাহচর্যকে পুরুষতন্ত্র ব্যভিচার বা সেই ব্যভিচারের ফসলকে জারজ নামে আখ্যা দিয়েছে।


ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম ধর্মগুলো এ ক্ষেত্রে পুরুষকে তিরস্কৃত করার ক্ষীণ প্রয়াস দেখিয়েছে মাত্র। যেমন, পুরুষকে কেবলমাত্র অন্যের বিবাহিত স্ত্রীর দিকে নজর দিতে বা আসক্ত হতে নিষেধ করেছে এবং সে ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। একজন পুরুষ - হোক সে বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত - বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া অন্য যে কোন অবিবাহিত নারীর সাথে দৈহিক সাহচর্যের সুযোগ পেয়েছে। কেননা সেক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও সেটা নমনীয়।


আর পুরুষতন্ত্র আসলে এখানেও হঠকারিতা করেছে মাত্র। কেননা, পুরুষতন্ত্র  চেয়েছে তার বিবাহিত স্ত্রীর কায়-মনের উপর একচ্ছত্র অধিকার, সেখানে অন্য পুরুষের আগমনের শংকায় সে শংকিত হয়েছে, হয়েছে সে ঈর্ষান্বিত। তাই সে নিজের ’মাল’ বা ’পণ্য’-এর উপর হস্তক্ষেপকারী অন্য পুরুষকেও হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। স্বামীর প্রতি ভালবাসা থাক না থাক, নারীকে তার কায়-মন একমাত্র স্বামীকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করতে হবে। আর যদিও পুরুষের প্রতি কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত নারী-সাহচর্যের কথা বলা হয়েছে পুরুষতন্ত্র প্রণোদিত ধর্মগ্রন্থে, সে ক্ষেত্রেও পুরুষ রেহাই পেয়ে গেছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। অথচ নারীর রেহাই পাওয়ার উপায় নেই, নারীকেই সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত পুরুষ-সাহচর্যের দৃশ্যমান ফলাফল বহন করতে হয় সন্তান পেটে ধারণ করে, কিন্তু পুরুষকে ধরার মত এ ধরনের কোন আলামত বা প্রমাণ নেই।


পুরুষতন্ত্র-কর্তৃক নারীর দেহ-মনকে একচ্ছত্রভাবে কুক্ষিগত করার নগ্ন ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ হল, পুরুষতন্ত্র প্রণোদিত হিন্দু, ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রে পুরুষকে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অধিকার দান। বাইবেল মুতাবেক, ইহুদী ও খ্রীষ্ট ধর্ম পুরুষকে যত পার স্ত্রী গ্রহণের এবং সেইসাথে আরো যত পার রক্ষিতা গ্রহণের অধিকার দিয়েছে। যেমন, খ্রীষ্ট-ইহুদী ধর্মের এক মহিমান্বিত পুরুষ ’জুদা’ শহরের রাজা Rehoboam-এর ১৮ জন স্ত্রী, এবং ৬০ জন রক্ষিতা ছিল। অন্য দিকে রাজা   Soloman  (ইসলামে নবী সুলায়মান)-এর ৭০০ স্ত্রী এবং ৩০০ রক্ষিতা ছিল এবং তার বাইরেও তিনি অনেক বিদেশী নারীকে ভালবাসতেন। ইসলামও একজন পুরুষকে চার-চার জন স্ত্রী ও সেই সাথে যত পার ক্রীতদাসী (রক্ষিতা) গ্রহণের অধিকার দিয়েছে। তথাপি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ মহানবী মুহাম্মদ (সঃ) নিজেই সেই নিয়ম ভংগ করে ১৪-২১ জন স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন।


এখানে বিবেচ্য বিষয় হল, বিবেকহীন কপট ও কামুক পুরুষ সমাজ বুঝতে পেরেছে যে, একই সময়ে একাধিক নারীর সাহচর্য কামনা পুরুষের একটি বর্বর ও আদিম সহজাত প্রবৃত্তি। আর সেই আদিম বর্বর প্রবৃত্তিকে জায়েজ করার প্রয়াসে সে নিজেরই সৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রে এ ধরনের একপেশে নিয়ম-নীতির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সেই সাথে পুরুষতন্ত্র এটাও আন্দাজ করতে পেরেছে যে, একাধিক সংগীর সাহচর্য নারীরও কাম্য হতে পারে। তাই সে নিজের সৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রের মাধ্যমে নারীকে একটির বেশী স্বামী গ্রহণের অধিকার দেয় নি। ঐদিকে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র তো অকালে-মৃত স্বামীর ফেলে যাওয়া স্ত্রীকে বা স্ত্রীদেরকেও অন্য স্বামী গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। আর সেই জন্যে হিন্দু শাস্ত্র মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া স্ত্রী যাতে কোনক্রমেই আরেক পুরুষের কাছে তার দেহ-মন সমর্পণ করতে না পারে, সে জন্যে বিধবা নারীকে মৃত স্বামীর সাথে শ্মশানে পুড়িয়ে মারার নির্মম ও বর্বর বিধান দিয়েছে। কত অসংখ্য (হয়ত কোটি কোটি) বিধবা নারীকে যে এভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে হিন্দুতন্ত্র তার ইয়ত্তা নেই। যে নারী অকালে তার স্বামীকে হারিয়ে এমনিতেই সর্বস্বান্ত, তার প্রতি যেখানে মানব সমাজের দেখানো উচিত ঢের করুণা ও সহমর্মিতা, সেখানে তথাকথিত স্রষ্টা (পুরুষতন্ত্র?) সেই নারীকে আর একটি দিন বাঁচার অধিকারটিও দেয় নি। শুধু তাই নয়, সেই বর্বর স্রষ্টা বিধান দিয়েছে ঐ হতভাগ্য নারীকে চরম অসভ্য ও বর্বর পদ্ধতিতে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার।


জারজ সম্পর্কে মানবতাবাদ


একজন নিষ্পাপ শিশুকে জারজ আখ্যা দিয়ে তার জীবন ও ভবিষ্যৎকে চিরতরে বিনষ্ট করে দেওয়ার অপপ্রয়াসে মানবতাবাদ বিশ্বাসী নয়। উপরে ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে যে, তাবৎ ধর্মশাস্ত্র বলে অজাচার (insest) ও তার মাধ্যমে সৃষ্ট জারজ সন্তান হচ্ছে আধুনিক মানব সমাজের ভিত্তি। যদিও মানবতাবাদ এ ধরনের মতবাদে বিশ্বাসী নয়, তথাপি সেটা মেনে নিলেও যে জারজত্ব বিনা আধুনিক মানব সমাজের আবির্ভাব কখনোই সম্ভব হত না, আধুনিক মানব সমাজের উচিত তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাকে ঘৃণ্য ও ধিক্কারজনক জারজ আখ্যা দিয়ে কলংকিত করা কোন বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়, সেটা বর্বরতা। মানবতাবাদী সুশিক্ষিত সভ্য সমাজ সেটা কোনক্রমেই মেনে নিতে পারে না। মানবতাবাদের অভিধানে জারজ বলে কিছু নেই। আর যদি তেমন কিছু থেকে থাকে, মানবতাবাদের রায়ে তা হবে মহিমান্বিত ও প্রশংসিত - ঘৃণ্য ও ধিক্কারজনক নয়। মানবতাবাদ সমাজে প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে নিলেও, পিতামাতার অপকর্মের দায়-দায়িত্ব ও অপবাদ নিষ্পাপ সন্তানের উপর চাপিয়ে সেই সন্তানের জীবনকে বিনষ্ট করে দেওয়াকে চরম অবিচার, অসভ্যতা ও বর্বরতা বলে রায় দেয়।


বৈজ্ঞানিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিতে জারজ বলে কিছু নেই। বিজ্ঞান বলে মায়ের পেটে (গর্ভাশয়ে) একজন বৈধ সন্তানের সূচনা ও পরিপুষ্টি যেভাবে হয়, ঠিক তেমনিভাবে একজন তথাকথিত জারজ সন্তানের সূচনা ও পরিপুষ্টি হয়। অথচ ধর্মশাস্ত্র-ভিত্তিক নিষ্ঠুর মানব সমাজ তাদের একজনকে বসিয়েছে সমমানের আসনে বৈধতার লেবাস দিয়ে, আর একজনকে জারজ আখ্যা দিয়ে নিক্ষেপ করেছে ঘৃণা ও ধিক্কারের অন্ধকূপে। পুরুষতন্ত্র জারজ-এর ধারণা সৃষ্টি করে মানবতাকে চরমভাবে পদদলিত করেছে। পুরুষতন্ত্র বিয়ে প্রথার সৃষ্টি করেছে নারীর দেহ-মনের উপর পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে আর জারজের ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে নারীর বশীভূতকরণকে সে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আর শুধু নারীই সেই নিষ্ঠুর প্রথার অন্যায় শিকার হয়নি, সে প্রথার বড় শিকার হয়েছে নিষ্পাপ ও তথাকথিত জারজ সন্তানেরা। এই তো কিছুদিন আগে ঢাকার কোন গলিতে ছ’টি সদ্য প্রসূত নিষ্পাপ সন্তানকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেল। ধর্মশাস্ত্র-ভিত্তিক সমাজ ও সংস্কার ঐ নিষ্পাপ শিশুগুলোকে একটি দিনও বাঁচার অধিকার দিল না এই সুন্দর ধরণীতে। পৃথিবীজুড়ে প্রতিদিন না জানি কত হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ ধর্মভিত্তিক সমাজ ও সংস্কার যদি ওদেরকে অবাঞ্ছিত জারজ আখ্যা না দিয়ে কেবলমাত্র তাদের আসল পরিচয় ’’মানব সন্তান’’ বলে আখ্যা দিত, তাহলে ওদের অনেককেই এই সুন্দর ধরণীর বুকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হত, ওদেরকে এভাবে অকালে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হত না। জারজের বিধান মানবতার জন্য এক চরম অবমাননা ও অভিশাপ। যে জারজদেরকে মানব সমাজ এভাবে ঘৃণা করেছে ও করছে, সেই জারজদের কাছে আজকের এ মানব সভ্যতা ব্যাপকভাবে ঋণী। জারজ হয়ে জন্ম নেওয়া অনেক ব্যক্তি মানব-দর্শন, সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিকে যথেষ্ট পরিপুষ্ট করেছে। চীনা মহাদার্শনিক কনফুসিয়াস, টলেমি, প্লেটো, সেনানায়ক জুলিয়াস সিজার-সহ বহু বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি পিতৃ-পরিচয়হীন ছিলেন।


এখন প্রশ্ন হছে, বিয়েই কি সন্তানের বৈধতা দানের একমাত্র সনদ? পিতৃতন্ত্র সে রায়ই দিয়েছে, যার মাধ্যমে নারী সন্তানের জন্ম দিবে কি না দিবে সেই অধিকারও পিতৃতন্ত্র কুক্ষিগত করেছে। সন্তানের জন্মদানে পুরুষের ভূমিকা নগণ্য - নারীকে দীর্ঘ দশ মাস সন্তান পেটে ধারণ ও পরিপুষ্ট করতে হয়। তদুপরি প্রচণ্ড প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করে মা সে   সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন - তার উপর দীর্ঘদিন ধরে তাকে লালন-পালনের ভার তো আছেই। অথচ সেই সন্তানের জন্ম হবে কি বা হবে না, সেটা নির্ণয় করার একচ্ছত্র অধিকার পুরুষের। এটা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য বিধান নয়, বরং এটা অন্যায়-অবিচার। সন্তানকে দীর্ঘ সময় পেটে ধারণ ও প্রসব যন্ত্রণা ভোগের দায়িত্ব যেহেতু নারীর, তাই নারী  সন্তান ধারণ করবে কি করবে না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অগ্রাধিকার দিতে হবে নারীকেই। বিয়ে আসলে কোনক্রমেই সন্তানের বৈধতা দানের দলিল নয়। সব মানব সন্তানেরই পরিচয় হবে নিষ্পাপ মানব সন্তান হিসেবে। নির্মম ও বর্বর জারজ প্রথার অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে হবে মানবতাবাদী সুসভ্য সমাজ থেকে। বিয়ে নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসার ভিত্তিতে মিলন-ই হবে সন্তান জন্মদানের আদর্শ পন্থা। পিতামাতা জোর করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিল, স্বামীকে ঐ মেয়ে কোনদিন হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে পারল না। ঐ স্বামী শুধু মেয়েটির দেহকে উপভোগ করল, কিন্তু তার মন ও ভালবাসার নাগাল পেল না। আর সেই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে যে সন্তানের জন্ম হল, সে সন্তানের জন্মের ভিত্তি আদর্শ ভিত্তি নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভালবাসার ভিত্তিতে বিয়ে হওয়ার পরও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক বিষাক্ত হয়ে উঠে। এমন অনেক বিয়েই আছে, স্বামী তার স্ত্রীকে বেদম প্রহার ও তার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে। ঐ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুষ্ঠ ভালবাসার সম্পর্ক লোপ পায়। কিন্তু স্ত্রী আমাদের সমাজে অসহায় গণ্য হওয়ায় বিয়ে কোন রকমে টিকে থাকে, মূলত স্ত্রীর ত্যাগ ও সহনশীলতার কারণে। ঐ ধরনের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও সন্তান ধারণের জন্য আদর্শ নয়। এ ধরনের সন্তানের লালন-পালনে ও আদর-সোহাগ দানে পিতামাতার একাগ্রতায় শিথিলতা আসতে পারে, যা ঐ সন্তানের মানবীয় বিকাশের পরিপন্থী। তথাপি ঐ ধরনের সম্পর্ক থেকে জাত সন্তানও অবাঞ্ছিত হয়ে যায় না, সে কেবলই মানব শিশু। এটাও বিবেচনা করা আবশ্যক যে, মানুষের প্রবৃত্তি এ রকম যে, সব সন্তানের জন্মের ভিত্তি আদর্শ হবে না। পাশবিক ধর্ষণের মত ঘটনা মানব সমাজে বিভিন্ন কারণে ঘটতে বাধ্য। যেমন ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাশবিক পাক সৈন্যদের দ্বারা অসংখ্য বাংগালী নারী ধর্ষিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধের সময় বর্বর পাশবিক জার্মান সৈন্যদের ধর্ষণ থেকে কেবলমাত্র ফ্রান্সে দুই লক্ষাধিক সন্তানের জন্ম হয়। মানবতাবাদের রায়ে, এ ধরনের পাশবিক ধর্ষণ থেকে জন্ম নেওয়া ঐসব সন্তানেরাও হবে শুধুই মানব সন্তান - না অবাঞ্ছিত, না জারজ।


আজকের দিনে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশে নারীরা এগিয়ে আসছে সন্তানের জন্মদানে তাদের ভূমিকাকে হস্তগত করতে। তারা আজ ভালবাসার ভিত্তিতে আপন পছন্দের ছেলেদের সাথে দেহ-মনের সম্পর্ক গড়ে তুলছে এবং সে সম্পর্কের ভিত্তিতে সন্তানও নিচ্ছে বিয়ে-টিয়ের ধার না ধেরে। ঐ সন্তানদেরকে রাষ্ট্র ও সমাজ নিষ্পাপ মানব সন্তান হিসেবে গ্রহণ করছে, ওরা জারজ নয়। ঐ সন্তানেরা অন্যসব তথাকথিত বৈধ সন্তানদের মতই বড় হয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার অগ্রগতিতে নিজ নিজ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। যেমন, আধুনিককালের দুই সুবিখ্যাত টেনিস তারকা স্টেফি গ্রাফ ও তার প্রিয় পাত্র আন্দ্রে আগাসীর মাঝে ভালবাসার সম্পর্ক থেকে দু’টি সন্তানের জন্ম হয়েছে বিয়ের আগেই। ঐ সন্তান দু’টি হয়ত একদিন বাপ-মায়ের মতই বিশ্ববিখ্যাত টেনিস তারকা হবে - আনন্দ দেবে সারা দুনিয়ার মানুষকে। কিংবা ওরা হবে কোন বড় বিজ্ঞানী, ডাক্তার বা সমাজ-সেবক; মানব সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে রাখবে বিরাট ভূমিকা। মানব জাতি ধন্য হবে ওদের অনুদানে। ওরা হবে আদর্শ মানুষ - না জারজ, না অবাঞ্ছিত।


মানবতাবাদের অভিধানে জারজ বা ঘৃণিত বলে যদি কোন মানুষ থাকে, তারা হবে ঐসব মানুষ যাদের পৃথিবীতে আগমন হয়েছে মানব সভ্যতার জন্য অভিশাপ। ওরাই জারজ, ওরাই ঘৃণিত যারা সমাজে খুন, ধর্ষণ আর অবিচার করে বেড়ায়। ওরা জারজ, যারা ক্ষমতার বলে মানুষের উপর অত্যাচার করে বেড়ায়, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎকে লুটে-পুটে খায়। জারজ ছিল হিটলার, মুসোলিনি, পল পট, আয়াতুললাহ, খোমেনী, সাদ্দাম - যারা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে ধূলিসাৎ করেছে। ওরা জারজ কিন্তু জন্ম-সূত্রে নয়, কর্ম-সূত্রে। ওদের জন্মও ছিল অন্যান্য মহৎ বা সাধারণ মানুষের মতই নিষ্পাপ, কিন্তু কর্ম বানিয়েছে ওদেরকে জারজ, ঘৃণিত ও ধিকৃত।


আজ কোন কোন মানবতাবাদী সমাজে সন্তানরা পরিচয় পাচ্ছে তাদের মায়ের নামে, পিতার নামে নয়। নারী যে চরম কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে মানব সন্তানকে ধরণীতে নিয়ে আসছে, সেই সন্তানের পরিচয়ের ভিত্তি হবে মা। নারী আজ তার প্রাপ্য অধিকার ও কৃতিত্ব উপভোগ করতে শুরু করেছে মানবতাবাদী সমাজে। সেই সাথে ঐ সব সমাজ থেকে উঠে যাচ্ছে তথাকথিত জারজের ধারণা।


সূত্রঃ

[১] ইনসেস্ট, নারীকোষ, মাহমুদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ৫৫।

[২] ইদিপাস কমপ্লেক্স নারীকোষ, মাহমুদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ৫২।

[৩] ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স, নারীকোষ, মাহমুদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ৫৪।

[৪] জারজ, নারীকোষ, মাহমুদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ৯৭।

[৫]History of Islam (Part-1), Prof. Masudul Hasan, pp. 248 to 262

[৬]The Holy Qur'an, Translated by Yusuf Ali, Verse - 004.003

[৭] খায়রুল হাসর বা কেয়ামতের আলামত, শাহ রফীউদ্দিন মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ)

[অনুবাদঃ মওলানা মোহামমদ আবুল খায়ের সিদ্দিকী]

[৮]Zoroastrianism - by Mary Boyce.


ধন্যবাদ মোহামমদ আসঘর, আবুল কাসেম ও অভিজিৎ রায়কে, যাদের মন্তব্য এ রচনাটিকে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করেছে। – annomot.com

(নিবন্ধটি ২০ অক্টোবর, ২০০৪-এ অন্যমত [www.annomot.com] নামক ওয়েব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। - বঙ্গরাষ্ট্র)


অনলাইন: ১২ আগস্ট, ২০০৯

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive