Banner
শহীদ মতিউরের পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই

লিখেছেনঃ কাজী মোহাম্মদ শীশ, আপডেটঃ May 28, 2009, 6:00 PM, Hits: 14638

 

 

আমরা যারা পঞ্চাশ-ষাট দশকে স্কুল-কলেজে পড়েছি অথবা আর একটু বড় পরিসরে বলা যায় যারা ষাট ও সত্তর দশকে বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানকে দেখেছি - তাঁদের সঞ্চয়ে আছে অনেক গৌরবোজ্জ্বল দিনের স্মৃতি। আবার একই সাথে গৌরব ও বেদনা-বিধুর স্মৃতির সাথে জড়িত পরিবারের বর্তমান দুঃসহ জীবন-যাপনের কথা জেনে দুঃখ-লজ্জা-গ্লানিতে সংকুচিত হয়ে পড়ি। ’৬৯-এর ২৪ শে জানুয়ারী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবসে পাকিস্তানী স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ-ইপিআরের গুলিতে ঢাকার নবকুমার ইনিস্টিটিউটের ছাত্র কিশোর মতিউর রহমানের শহীদ হওয়ার স্মৃতিটি আজও যেমন মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করছে তেমনি সমগ্র জাতিকে আজ অপরাধী মনে হয় যখন কাগজে পড়ি আজও মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি মতিউরের বাবা-মায়ের। দুঃখের কথা ইতোমধ্যে মতিউরের পিতা ৮৪ বয়সে ২০০৭ সালের মে মাসের ১০ তারিখে ভোর পাঁচটায় ৭৬ বৎসর বয়স্কা তাঁর সহধর্মিণীকে হারান। এ লেখাটিতে মনের জ্বালা ও আত্মগ্লানিক লাঘবের জন্য ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। উনসত্তরের সেই আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের দিনগুলির কথা শুরু করলে লেখার খেই হারিয়ে ফেলবো। কঠিন হয়ে উঠবে কেবল মতিউর ও তাঁর পরিবারের মধ্যে রেখা টেনে রাখতে।

২৪শে জানুয়ারী দিনটির কথা বেশী করে গেঁথে আছে আমার মণিকোঠায়। পুরো দেশ জুড়ে চলছে গণ-আন্দোলন। ২০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শহীদ হয়েছেন আসাদুজ্জামান। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছে চব্বিশ ঘন্টার হরতাল। সারা শহর মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গেছে। গন্তব্য পল্টন ময়দান। সেখানে ছাত্র-জনতার সমাবেশ-সভা হোত প্রতিদিন। ঘোষিত হতো পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচী। আরও অনেকের সাথে আমার এক ফুপাতো ভাইকে নিয়ে বর্তমান জি. পি. ও-এর অপর পারে ফুটপাত ধরে পল্টনের দিকে এগোতে চেষ্টা করছি। সাথে ছোট ভাইয়ের বন্ধু খোকন। অন্যদিকে সেক্রেটারিয়েটের সামনের রাস্তা দিয়ে বিশাল জনসমুদ্র পল্টনের দিকে এগোচ্ছিল। পুলিশের সাথে ইপিআর নামানো হয়েছে। এ কথা সকলের জানা ছিল। সমুদ্র-উত্তাল জনতার ভয়ে তারা ভীত। মিছিল কিছুটা এগোতেই পল্টন ময়দানের দিক থেকে শুরু হল গুলি বর্ষণ। আমরাও দ্রুত পিছিয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজতে লাগলাম। খবর ছড়িয়ে পড়ল মারা গেছেন অনেকে। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে জানা গেল মিছিলেন সামনে থাকা গোপীবাগ এলাকার মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। পরে শুনেছি রুস্তম, মকবুল, আলমগীরসহ আরও পাঁচজন মারা গেছেন।

তারপরের দৃশ্যগুলো চোখ বন্ধ করলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। ডায়েরী লেখার অভ্যাস না থাকায় ঘটনাগুলোর সুসপষ্ট ও সঠিকভাবে মনে থাকলেও সময় ও ছোটখাটো দু’একটা স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা হয়ে থাকতে পারে। এরপর যা ঘটলো তো অবিস্মরণীয়। অভূতপূর্ব। মতিউর রহমানের মৃতদেহ বহন করে সহস্র জনতা বিষণ্ন অথচ দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চললো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সামনের মাঠে। তৈরী ছিল ছোট একটি মঞ্চ। ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ। মতিউর রহমান সামনে শায়িত। মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত বিপুল ছাত্র-জনতা নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রোষে জ্বলছেন। এক সময় হালকা-পাতলা-দীর্ঘ এক ব্যক্তিকে মাইকের সামনে আনা হল। তিনি হলেন শহীদ মতিউর রহমানের বাবা শ্রদ্ধেয় আজহার আলী মল্লিক। সামনে স্কুল পড়া কিশোর ছেলের নিথর দেহ। তা দেখে বাবার শরীর কাঁপছে। তাঁকে ধরে আছেন তখনকার ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা শামসুদ্দোহা। বিশাল ছাত্র জনতাকে উদ্দেশ্যে করে শহীদ মতিউরের বাবা বললেন, আজ এক মতিউরকে হারিয়ে আমি লক্ষ মতিউরকে পেয়েছি।’ (ওখানে উপস্থিত ছিলেন এমন কারো লেখায় যেন দেখেছি ----হাজার মতিউরকে পেয়েছি।’) যদিও প্রতীক হিসাবে ওখানে লক্ষ-হাজার সমার্থ। ওখানে উপস্থিত ছিল আমার ছোট ভাই দিশু। তার ও আমার স্মৃতি একই রূপ। পরে গোপীবাগের এক অপরিসর-অজ্ঞাত গোরস্থানে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদ মতিউর রহমানকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হল। মতিউর রহমানের বাবা আজহার আলী মল্লিক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের একজন কর্মচারী ছিলেন। থাকতেন গোপীবাগ এলাকার মধুমিতা সিনেমা হলের পিছনে ব্যাংকেরই একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে। আমাদের বাসা ছিল তাঁর বাসা থেকে ৩/৪ মিনিটের হাঁটার পথের দূরত্ব। আমি তখন চাকরী করি। আর মতিউর কিশোর বালক। স্কুলের ছাত্র। আমার ছোট ভাইরা যারা স্কুলের ছাত্র ছিল তাদের খেলার সাথীদের মধ্যে মতিউর রহমানও ছিলেন। আর ছোট ভাইয়ের কাছে শুনেছি মতিউর রহমানের আর এক নাম ছিল গুড্ডু। খেলার মাঠে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তিনি এ নামেই পরিচিত ছিলেন। গোপীবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় দীর্ঘদিন বসবাসের শেষে সরকারী কোয়ার্টারে অন্যত্র স্থানান্তরের পরও মতিউরের পরিবারের কথা আমরা ভুলতে পারিনি। ’৬৯-এর বেশ কয়েক বছর পর নিউমার্কেটের একটি বইয়ের দোকানে মতিউরের বাবাকে কাজ করতে দেখি। আমি তাঁকে চিনি। কিন্তু তাঁর তো চেনার কোন সুযোগ নেই। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি শহীদ মতিউরের বাবা? কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে ছোট্ট উত্তর দেন, হ্যাঁ। তারপর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমী এসব এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। তাঁর পাশে আসন খালি থাকলে সেখানে বসতে আগ্রহী হয়েছি। ছোট ছোট দু’একটা কথা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত উত্তর পেয়েছি। জেনেছি নিউমার্কেটের দোকনে এখন আর বসেন না। ব্যক্তিগত কথা আর নয়।

আমরা একটু দেখার চেষ্টা করি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের শহীদ মতিউরের বাবা এখন কেমন আছেন? তাঁর মা কেমন ছিলেন? তাঁদের চাওয়া-পাওয়ার সামান্য হিসাব মেলাতে জাতি ও সরকারের বিবেকের কাছে শহীদের বাবা-মায়ের কোন প্রশ্ন আছে কিনা? কী দায়িত্ব আমরা পালন করেছি? এখনো কি কিছু করতে পারি না আমরা?

মতিউর রহমানের বাবার বয়স এখন ৮৪। তাঁর মা ছিরাতুননেসা ৭৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তাঁদের বাস এখন সবুজবাগের একটি স্বল্প ভাড়ার বাসায়। তাঁর বাবার নিজস্ব একমাত্র আয় মাসিক পেনশন ২ হাজার ৫০ টাকা। তাঁদের ঢাকা বা দেশের কোথাও একখণ্ড জমি নেই, মাথা গোঁজার বাসস্থান নেই। মল্লিক সাহেবের সাত ছেলের মধ্যে মতিউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। প্রথম ছেলে মমতাজ উদ্দিন জন্মান্ধ ও হাফেজে কোরআন। তৃতীয় ছেলে আজিজুর রহমান ১৯৭২ সাল থেকে ভারতে আছেন। চতুর্থজন মিজানুর রহমান এক কোরিয়ান কোম্পানীর চাকুরী নিয়ে সৌদি আরবে চলে যান। তিনি ধরেছিলেন সংসারের হাল। কিন্তু মতিউরের বাবা-মার কপালে সে সুখ সইল না। মাত্র চার মাস পরে তার লাশ ফিরে আসে। জানানো হয় দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। পঞ্চম সন্তান সোনালী ব্যাংক চাকরী করেন। তিনি বাবা-মায়ের খাওয়ার খরচ দেন। ষষ্ঠ ছেলে মাহবুবুর রহমান ময়মনসিংহের একটি সোনার দোকানে চাকরী করেন। শেষ জীবনে অসুস্থ মায়ের মাসে তিন হাজার টাকার ওষুধের প্রয়োজন হতো। তারই একটা অংশ ১৫শ টাকা এই সন্তান দিতেন। ছোট ছেলে শহীদুর রহমান বাসাবোর একটি কনফেকশনারির দোকান চালান। তিনি সংসারের তেল সাবান যোগান। মল্লিক সাহেবের ছেলেরাও স্বল্প ভাড়ার বাসায় থাকেন সবাই। সৌদি আরবে মিজানুর রহমানের মৃত্যুর শোকের আঘাতে তাঁর মার মস্তিষেক রোগ দেখা দেয়। এছাড়া হাঁপানী, উচ্চ রক্তচাপ, বক্ষব্যাধিতেও তিনি আক্রান্ত ছিলেন। শহীদ মতিউর রহমানের বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের এমন করুণ, দুঃসহ-অসহায় জীবন-যাপনের মধ্যেও মতিউর রহমানকে নিয়ে তাঁরা সব সময় গর্ব বোধ করেছেন। কিন্তু তাঁদের অতি সামান্য এক চাহিদা রয়েছে। জীবনের বাকি অংশ নিজেদের একটা ছোট্ট বাড়িতে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বৃদ্ধ পিতামাতা। এজন্য আজহার আলী মল্লিক সরকারের কাছে নানাভাবে আবেদন-নিবেদন করে আসছেন। কখনো মৌখিকভাবে সহানুভূতি পেয়েছেন। কখনো সরকারী নথি অচল হয়ে থেকেছে। আবার কখনো বা সচল হয়ে অজানা কারণে এগোয়নি। একের পর এক সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। সকল সরকারের কাছে শহীদ মতিউরের বাবা একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দের জন্য আবেদন করে আসছেন। কিন্তু পাননি তিনি একটি ছোট্ট আশ্রয় স্থল। প্রতি বছর যথাযথ মর্যাদার সাথে গণঅভ্যুত্থান দিবসে শহীদ মতিউর রহমানকে স্মরণ করা হয়। বিশেষ করে নব কুমার ইনিস্টিটিউটে তাঁর স্মরণে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি কেন্দ্র তাঁকে স্মরণ করতে ভুলে না কখনো। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানায় যথাযথ মর্যাদার সাথে। তাঁর বাবা দিনটি এই কেন্দ্রেই কাটান। অনেক আগেই জনাব মল্লিকের আবেদন বিবেচনা করা সরকারের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। শহীদ মতিউর রহমানের বাবা আজাহার আলী মল্লিকের দীর্ঘদিন ধরে সস্ত্রীক একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেয়ার আবেদনের আজ পর্যন্ত কোন ফল পাওয়া যায় নাই। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শহীদ মতিউরের মাও ইহলোক ত্যাগ করেছেন। দেশবাসী চায় সরকার একটু বিবেকের তাগিদ অনুভব করুক এবং উদ্যোগী হউক মতিউরের পরিবারের জন্য একটি বাড়ী বরাদ্দের। শহীদ মতিউর রহমানের বাবা আজাহার আলী মল্লিক আবাসনের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবেন এটা তো কারো কাম্য হতে পারে না।

(দৈনিক সংবাদের মুক্ত আলোচনা’ পাতায় মাঘ ১৬, ১৪১৩; জানুয়ারী ২৯, ২০০৭ সালে লেখাটির অংশবিশেষ প্রকাশিত। নিবন্ধটি কাজী মোহামমদ শীশ-এর ’কালের চোখে আমার দেশ’ থেকে সংকলিত। প্রকাশক - জনান্তিক, আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেট, বইপাড়া, শাহবাগ, ঢাকা। প্রকাশ কাল - একুশে বই মেলা, মাঘ ১৪১৪; ফেব্রুয়ারী ২০০৮ ।)

অনলাইন : ২৯ মে, ২০০৯

 

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive
 
সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ