Banner
বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো: একটি পর্যালোচনা — লেনিন আজাদ

লিখেছেনঃ লেনিন আজাদ, আপডেটঃ July 15, 2009, 6:00 PM, Hits: 19523

 

 

দীর্ঘদিন পর একটি পুরোনো বিতর্ক নতুন আঙ্গিকে বেশ গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছেন রইসউদ্দিন আরিফ। আত্মপ্রতিকৃতি-এর ২৩ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯) আরিফের প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল: বাংলাদেশের কৃষিতে ধনতন্ত্র’ না আধা সামন্ততন্ত্র’ বিতর্ক প্রসঙ্গে। লেখক কৃষি প্রশ্নের উপরকার বিতর্কে ধনতন্ত্র’ কিংবা আধা সামন্ততন্ত্র’-এ দু’-এর বাইরে অন্য কোনভাবে কৃষি ব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করার সুযোগ রাখেন নি তার বক্তব্যে, প্রবন্ধটির শিরোনাম দেখে সে রকমই মনে হয়। উক্ত প্রবন্ধের সূত্র ধরে টি আলী একটি দীর্ঘ পর্যালোচনা লিখেছেন। এটিও প্রকাশিত হয়েছে আত্মপ্রতিকৃতি-এর ২৯/৩০/৩১ সংখ্যায় (জুলাই, ২০০১)। লেখক দু’জনের মূল বক্তব্য এক, মাত্রা কিংবা প্রকৃতির মাঝে কিছু পার্থক্য রয়েছে মাত্র। দুটি প্রবন্ধেরই কিছু কিছু দিক নিয়ে ওখানে আলোচনা করা হবে, তবে রইসউদ্দিন আরিফের প্রবন্ধকে মূল প্রবন্ধ ধরে বর্তমান আলোচনাটি অগ্রসর হবে।

জনাব রইসউদ্দিন আরিফ কৃষক সমাজের আলোচনায় যে পদগুলি ব্যবহার করেছেন সে সবের কোনটিরই কোন সংজ্ঞা তিনি দেন নি, আবার পদগুলি সাধারণত যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সে অর্থেও তিনি সব সময় ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় নি। ফলে প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে খট্‌কা লেগেছে। তথাপি তাতে তার মূল বক্তব্যটি বুঝতে অসুবিধা হয় নি। তিনি খুব নির্দিষ্ট করে বলেছেন বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা আধা সামন্ততান্ত্রিক এবং তার ভিত্তি হিসাবে তিনি বলেছেন:

১. দেশের শতকরা ৭০ ভাগ জমি খোদ কৃষকের হাতে তথা ক্ষুদে ও প্রান্তিক চাষীর হাতে (প্রান্তিক চাষী বলতে তিনি মূলত মাঝারি কৃষককে বুঝিয়েছেন);

২. কৃষিতে আধাসামন্ততান্ত্রিকতার মূল ভিত্তি হল ক্ষুদে মালিকানা;

৩. আধা সামন্ততান্ত্রিক শোষণের মূল রূপ হল মহাজনী শোষণ, মহাজনদের মূল রূপ হল স্থানীয় মহাজন, সরকার মহাজন ও এনজিও মহাজন;

৪. কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্য হল টিকে থাকা, সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর, সুদসহ মহাজনের দায় পরিশোধ ও পারিবারিক খরচ নির্বাহের পর বর্ধিত পুনরুৎপাদনের জন্য বাড়তি কোন অর্থ কৃষকের হাতে থাকে না। তাই সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন অচলায়তন যা, মধ্যযুগীয় এশিয়াটির সমাজের মতই এ দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে পরিবর্তনহীন করে রেখেছে;

৫. আধা সামন্ততান্ত্রিক শোষণের মূল ভিত্তিটি এ দেশের জমির খাজনা শোষণ নয়, বরং শোষণের মূল রূপই হল মহাজনী শোষণ। ফলে সামন্ত জোতদারদের মাঝে শ্রেণী শত্রু অনুসন্ধান করতে গেলে শ্রমজীবী জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লব শ্রেণী শত্রু খতমের (ব্যক্তিসন্ত্রাসের) কানাগলিতে আটকা পড়ে যায়।

এ ছাড়াও আরিফ তার প্রবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য করেছেন। সেগুলির কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. ক্ষুদে ও মাঝারি কৃষকরা মূলত কোন প্রকার পুঁজিবাদী শোষণের চাপে নয়, বরং স্রেফ মহাজনী ও বন্ধকী শোষণের (সামন্ততান্ত্রিক শোষণের) চাপে সর্বদাই নিঃস্বতার পাকে ডুবে থাকে’ (পৃ-২৭)।

২. উৎপাদন উপায়ের (জমি, গরু ও লাঙ্গলের) মালিক হয়েও এবং জমিতে মজুর খাটিয়েও দেখা যায় মজুরের অবস্থা আর মালিকের অবস্থা একই রকম’ (পৃ-২৭)।

৩. নয়া ঔপনিবেশিক সমাজে জমির টুকরো টুকরো মালিকানার নিয়মই হলো উৎপাদন অবস্থার অবশ্য-পূরণীয় শর্তাবলীর ক্রমাগত অবনতি, পতন ও ধ্বংস’ (পৃ-২৮)।

৪. সাম্রাজ্যবাদের সুপরিকল্পিত নীল নকশার অধীনে তৈরী জমির ক্ষুদে মালিকানার আধা-সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন কাঠামোর অচলায়তন ভেঙ্গেই কেবল সত্যিকারের কৃষি বিপ্লব সম্পন্ন করা সম্ভব’ (পৃ-৩৫)।

৫. ... জমির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গণ্ডীভবনের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটাতে হবে। এই বিপ্লব ঘটাতে হবে দেশের বিপুল পরিমাণ জমি ও বিশাল শ্রমশক্তিকে ক্ষুদে উৎপাদন কাঠামোর শৃংখল থেকে মুক্ত করে তাকে বৃহৎ যৌথ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে’ (পৃ-৩৫)।

উপরোক্ত পাঁচটি ভিত্তি ও পাঁচটি মন্তব্য থেকে যা বের হয়ে আসে তা হল বাংলাদেশে আধা সামন্ততান্ত্রিকতার মূল রূপ হল দু’টিঃ এক. জমিতে ক্ষুদে মালিকানা এবং দুই. কৃষকের ওপর মহাজনী শোষণ। তবে উৎপাদন উপায়ের মালিক (জমি, গরু ও লাঙ্গল) হয়েও কেন এক জন খামার মালিক তার নিয়োজিত মজুরের মতই একই রকম জীবন যাপন করে তার ব্যাখ্যা কিন্তু আরিফ বিশদভাবে দেন নি। অথচ এই বিষয়টি পরিষকার হলে বোঝা যেতে পারত প্রকৃত অর্থেই ক্ষুদে উৎপাদন ও মহাজনী শোষণ বাংলাদেশের কৃষক সমাজকে নিঃস্ব করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে কিনা। নীচেই এ বিষয়ে কিছুটি আলোকপাত করা যাক।

বাংলাদেশের এক জন বড় খামার মালিক যদি নিজ ব্যবস্থাপনার অধীনে নিজের জমিতে কৃষি কর্ম পরিচালনা করতে যান তা হলে তার নিজের কাছে কোন নগদ টাকা না থাকলেও কৃষিতে বিনিয়োগের জন্য তাকে মহাজনের দ্বারস্থ হতে হয় না, তিনি একটু চেষ্টা করলে দেশের তফসিলী ব্যাংকগুলি থেকে বার্ষিক ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ হার সুদে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে পারেন, এ কাজটি করার জন্য এক জন বড় খামার মালিকের তেমন বেগ পেতে হয় না। তথাপি, শ্রমিক নিয়োগ করে এক জন বড় খামার মালিক আবাদ করার মাধ্যমে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে না কেন? এর পিছনে মূল কারণ হল বিশ্বপুঁজি ও নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রের রাষ্ট্রীয় শোষণ। কেননা, কৃষি উপকরণের যে অংশ এখন বাজার থেকে ক্রয় করতে হয় তার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে মূলত সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি ও রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলির বাইরেও আর যারা উক্ত সব কৃষি উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানী করে সেগুলির উপরও রাষ্ট্র এমন মাত্রায় কর ও রাজস্ব আরোপ করে যে, সামগ্রীটির খুচরো মূল্য অনেকাংশে বেড়ে যায়। এর ফলে কোন কৃষককে এখন বাজার থেকে যে সকল কৃষি উপকরণ ক্রয় করতে হয় তার মূল্যই ব্যয় করতে হয় কৃষির পিছনে মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। আর যদি বোরো ধানের মত কোন সেচ নির্ভর ফসলের আবাদ করতে যাওয়া হয় তা হলে উপকরণ খরচটা আরও বেড়ে যায়।

অন্য দিকে, এখনকার আধুনিক কৃষি যে পরিমাণ পরিচর্যা দাবী করে তাতে একক কোন ব্যক্তির পক্ষে ৩/৪ একরের বেশী জমির ওপর নজরদারী করা সম্ভব হয় না। ফলে বড় খামার মালিকের খামার পরিচালনার জন্যও লোক ভাড়া করতে হয়। এভাবে খরচ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবেলা করে ফসল মৌসুমে কৃষকের ঘরে যে ফসল ওঠে তাতে দেখা যায় কৃষি উপকরণ ও নিয়োজিত শ্রমশক্তির মূল্য বাদ দেওয়ার পর জমির ভাড়ার অর্থটুকুও পুরোপুরি ফিরে আসছে না। অধিকাংশ সময় নজরদারীর জন্য কোন মূল্যই জমির-মালিক ফসল থেকে ফিরে পাচ্ছে না।

সে কারণেই দেখা যায়, বড় খামার মালিকগণ এখন নিজের নিয়ন্ত্রণের চাষ ভেঙ্গে দিয়ে গোটা আবাদী জমি বর্গা কিংবা লিজ প্রদান করে নিজে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে, জমির ক্ষুদে মালিকানা কিংবা মহাজনী ঋণ বড় খামার মালিকের সামনে যে বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এমনভাবে দেখার সুযোগটা খুব কম। কেননা, বিষয়টা এমন নয় যে, জমির ক্ষুদে মালিকানার কারণে যে কৃষি মজুর পাওয়া একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠেছে তা নয়। বরং ব্যাপারটা এমন হতে পারে যে, কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ না করে ক্ষুদে কৃষকদের কাছে চড়া সুদে ধার প্রদান করাটা বেশী লাভ জনক বলেই অনেকে সে কাজে নিয়োজিত। এনজিও ঋণের কারণে কৃষি শ্রমিকের মজুরী যে কিছুটা বেড়ে গেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন মহাজনী পুঁজি খুব বেশী দূর অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এখানে কম। কেননা, ব্যাংক ও এনজিওগুলি যে হার সুদে ঋণ প্রদান করে থাকে সে তুলনায় স্থানীয় মহাজনী ঋণের সুদের হার কয়েকগুণ বেশী। তবে ব্যাংকগুলির ঋণ বণ্টন পদ্ধতি ও এনজিওগুলির ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি গ্রহণের নিয়ম ক্ষুদে কৃষি জোতগুলির জন্য সহায়ক নয়। এ কারণেই ক্ষুদে মাঝারী জোত মালিকগণ স্থানীয় মহাজনদের কাছে গিয়ে ধর্ণা দিতে বাধ্য হন। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনায় আমরা পরে যাব। তার আগে ব্যাংক ঋণ ও এনজিও ঋণের চরিত্র একটু আলোচনা করা প্রয়োজন।

ব্যাংক ঋণ হল একটি আমানত নির্ভর ঋণ। অর্থাৎ কারো মালিকানায় কি মূল্যের সম্পদ আছে তার উপরই নির্ভর করে ব্যাংক থেকে সে কি পরিমাণ ঋণ পাবার যোগ্য। ফলে যার আমানত রাখার মত যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ আছে তার জন্য ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করা কোন কঠিন কাজ নয়। তবে ব্যাংক ঋণ বণ্টন প্রক্রিয়ার মাঝে রয়েছে বহু ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফলে এক জন খামার মালিক ঠিক যে সময় ঋণের প্রয়োজন বোধ করেন তখন তিনি তা সাধারণত পান না। উপরন্তু, কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ প্রধানত অলাভজনক। এই উভয়বিধ কারণে তফসিলী ব্যাংক থেকে গ্রামের খামার মালিকগণ যে ঋণ নিয়ে থাকেন ঋণের সে টাকা প্রধানত কৃষিতে বিনিয়োগ করা হয় না, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত মহাজনী কাজে তা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষক মহাজনী শোষণে আবদ্ধ হচ্ছে এমনটা বলা সমীচীন নয়।

অন্য দিকে, এনজিও ঋণ আমানতনির্ভর নয়। তবে তা অতিমাত্রায় তত্ত্বাবধাননির্ভর। রীতি অনুযায়ী ভূমিহীনরা এ ঋণের গ্রহীতা হলেও এ ঋণ যে শুধু ভূমিহীনরাই পায় তা নয়। তবে এ ঋণ গ্রহণের পরের সপ্তাহ থেকেই যেহেতু ঋণের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করতে হয় সেহেতু কোন কৃষক এ ঋণ কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করে না। কেননা, কৃষকের আয় আসে নির্দিষ্ট দু’তিনটি মৌসুমে। ফলে এ ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য থাকে দৈনন্দিন উপার্জন বৃদ্ধি। দৈনন্দিন উপার্জন বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে এখন যে খাতগুলি দরিদ্রদের জন্য রয়েছে সেগুলি হলো ছোট ব্যবসা কিংবা রিক্সা ভ্যান চালানো। এই উভয় ধরনের কর্মকাণ্ড কার্যত কোন নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, ফলে নতুন মূল্য সৃষ্টি করতেও তা পারে না। এ কাজে নিয়োজিত পূর্বের লোকদের দৈনন্দিন উপার্জনের উপর তা ভাগ বসায় মাত্র। এর ফলে এক দিকে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলি কৃষি শ্রম থেকে বিযুক্ত হচ্ছে, অন্য দিকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ইতিপূর্বে যারা নিয়োজিত ছিল (যেমন হাট বাজারের মাঝারী ব্যবসায়ী কিংবা অনেকগুলি ভ্যান রিক্সার মালিক) তাদের পুঁজি সঞ্চয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করছে কিংবা অসম্ভব করে তুলছে। অর্থাৎ এনজিও ঋণ সমাজে তেমন কোন নতুন মূল্য সৃষ্টি না করেই এমন একটি পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়া চালু করেছে যাতে গ্রামাঞ্চলের সম্পদ সঞ্চয়নের চিরায়ত পুঁজিবাদী ধারাটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিষয়টিকে এভাবে না দেখে এনজিও ঋণকে মহাজনী ঋণ হিসাবে গণ্য করার মধ্যে কোন যথার্থতা আছে বলে মনে হয় না। কেননা, এনজিও ঋণ কোন অর্থেই মহাজনী ঋণ নয়। কারণ, এ ঋণের জন্য কোন আমানত লাগে না। এ ঋণের সুদ ব্যাংক ঋণের তুলনায় বেশী হলেও মহাজনী ঋণের তুলনায় এক পঞ্চমাংশ কিংবা তারও কম। অতিরিক্ত সুদের কারণে কেউ এ ঋণ পরিশোধ করতে পারে নি এমনটি দেখা যায় না, এ ঋণ নিয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের অধিকাংশ হয় কোন দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল কিংবা ব্যবসায়ে মার খেয়েছিল। আর এ ঋণ যারা বণ্টন করে তাদেরকে সামন্ত স্বার্থের ধারক বা প্রতিনিধি বলার কোন উপায় নেই, তাদেরকে বরং বড়জোর মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি সংগঠন বলা চলে। এ পুঁজির চরিত্র অনুসারেই তা স্বাধীন স্থানীয় পুঁজির বিকাশকে বাধা দেয়। বাধা দেয় দু’টি পথে: স্থানীয় অকৃষি আয়কে পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে এবং কৃষি মজুরের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে কৃষি মজুরী বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। এটা আসলে মহাজনী শোষণের ফল নয়, বরং এটা নয়া ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার ফল।

একইভাবে সরকার-মহাজন কথাটাও যথার্থ নয়। কেননা, যে কোন সরকার রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাময়িক মুখপাত্র মাত্র। গত ত্রিশ বছরে যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিংবা সেনাবাহিনী রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েছে তাদের সকলেরই রাজনীতি ছিল বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে খুবই সংগতিপূর্ণ। ফলে এ সময়ে এ দেশের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডগুলিই সরকারী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে। এখন প্রশ্ন আসছে, সরকারের কোন কর্মকাণ্ডকে মহাজনী কর্মকাণ্ড হিসাবে গণ্য করা যায়? সরকারের ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড যে মহাজনী কর্মকাণ্ড নয় তা আগেই দেখা গেছে। বাকী যে কর্মকাণ্ডসমূহ সরকার পরিচালনা করে তার মধ্যে অর্থ বিষয়ক প্রধান কর্মকাণ্ড হল রাজস্ব ও কর উত্তোলন। এই রাজস্ব ও কর উত্তোলন নীতির মধ্যে অবশ্য কৃষক মালিকানাভিত্তিক তথা ক্ষুদে মালিকানাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত করার পক্ষে বেশ উদ্যোগ দেখা যায়। কিন্তু এটা মূর্তভাবে কখনই ফুটে ওঠে না যে, কৃষিতে ক্ষুদে মালিকানা কিভাবে সরকারকে উক্ত নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করছে।

কৃষিতে ক্ষুদে মালিকানা বিপুল সংখ্যক পরিবারকে পরসপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, চেতনাগতভাবে রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে রাখে এবং এটাই সমাজে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি টিকে থাকা ও বিস্তারের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে বটে কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে নিয়োজিত সরকারগুলির ওপর এদের প্রভাব ছিল কতটুকু। বরং ক্ষুদে উৎপাদনভিত্তিক কৃষক সমাজকে ব্যবহার করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় তারা নানা ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে। আর সরকারগুলি যে কৌশলগুলি গ্রহণ করে সমাজের উপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে তার মধ্যে মহাজনী শোষণের পর্যায়ে পড়ে এমন কোন কর্মকাণ্ড করেছে বলে মনে পড়ে না। সরকারগুলির আর্থিক কর্মকাণ্ডের মূল দিক ছিল প্রতিবছর দেশের আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিপুল অংকের রাজস্ব সংগ্রহ করা। এই রাজস্ব নীতির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলিতে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের সাথে ভারসাম্যহীনতা তৈরী করা এবং এই ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়ে ব্যাপকভাবে চোরাচালানের বিস্তৃতি ঘটানো ছিল সরকারগুলির নিয়মিত আর্থিক কর্মকাণ্ডের নেট ফলাফল।

সরকারগুলির রাজস্ব নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল (কিংবা বর্তমানেও চলছে) এমনসব সামগ্রিক মূল্য বৃদ্ধি করা যেগুলির উৎপাদন কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেমন আমাদের দেশে জ্বালানী তেলের ওপর আমদানী শুল্ক সবচেয়ে বেশী। এই একইভাবে দেশে উৎপাদন সহায়ক কাঁচামাল কিংবা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক অনেক বেশি। অথচ বিদেশে নির্মিত পাকা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয় খুবই কম হারে কিংবা পরিপূর্ণভাবে শুল্ক রেয়াত দেওয়া হয়। দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও এমন সব সামগ্রীর মূল্য বাড়িয়ে রাখা হয় যাতে যে কোন সামগ্রীর উৎপাদন মূল্য বেড়ে যায়। যেমন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের মূল্য অত্যাধিক। প্রতিবেশী কোন কোন দেশের তুলনায় কয়েকগুণ। এর মধ্যে মহাজনী চরিত্রটা কোথায়? এ সকল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রটিই ফুটে ওঠে। গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এর সুনির্দিষ্ট ফলাফল যা ঘটে তা হচ্ছে বড় খামারের অস্তিত্ব আর্থিক দিক দিয়ে অসম্ভব করে তোলা এবং একটি পরিবার প্রধানত পারিবারিক শ্রমশক্তি খাটিয়ে যতোটুকু জমি আবাদ করতে পারে সে ধরনের খামারকে টিকিয়ে রাখা। এভাবে সরকার ক্ষুদে আয়তনের খামারের অস্তিত্বকে স্থায়ী করার পক্ষেই কাজ করে চলেছে।

বাংলাদেশের বড় খামারগুলিতে সেভাবে মুনাফা না হলেও ছোট খামারগুলির অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। অধিকাংশ ছোট খামারের গড় উৎপাদন হার বড় খামারগুলির তুলনায় কয়েকগুণ। তথাপি এ ছোট খামার মালিকদের দারিদ্র্য কখনও ঘোচে না। আর এ পিছরে মূল কারণ হচ্ছে তাদের মহাজনী ঋণের নির্ভরতা। এরা যদি তাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক ঋণ পেতো কিংবা এনজিও ঋণ গ্রহণের সুযোগ পেতো তা হলে তাদের অন্তত সচ্ছল জীবন যাপনের একটা নিশ্চয়তা আসত। গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদে খামার মালিকদের মধ্যে যারা কিছুটা সচ্ছল জীবন-যাপন করেন তাদের যে কারও উদাহরণকে সামনে আনলেই বিষয়টি পরিষকার হয়ে ওঠে। গ্রামের এক জন ছোট খামার মালিক যার দেড়-দু’ একর জমি আছে, তার যদি আগে থেকেই জমি আবাদ করার মত নগদ টাকা থাকে কিংবা নিজের জমির কাগজপত্র ঠিক থাকে যাতে সে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অংকের টাকা সংগ্রহ করতে পারে, তা হলে করতে পারে। নিজের তত্ত্বাবধানে আবাদ করার সময় নিজে যেমন তার জমিতে কাজ করে, তেমনই মৌসুমের সময়গুলিতে সে কিছু সংখ্যক মজুর ভাড়াও করে। ধান-গমের মত মৌসুমী ফসলের আবাদের পাশাপাশি নানা ধরনের মসলা কিংবা সবজীর আবাদ করে সে বছরশেষে ঋণের টাকা সুদসহ ফেরত দিয়েও কিছু নগদ টাকা হাতে রাখতে পারে। এই গোটা উৎপাদন কর্মের মধ্যে যে তার কোন মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য ছিল না তা নয়। মুনাফাও যে একেবারে তার হয়নি তাও নয়। কিন্তু মুনাফার উক্ত অর্থ সে বাড়তি কোন পুনঃ উৎপাদনের পিছনে বিনিয়োগ করে কিনা সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, সামর্থ্যের দিক থেকে যেহেতু তার হাতে নতুন বছরে নগদ কিছু টাকা আছে সেহেতু সে ইচ্ছা করলেই আগের বছরের সমপরিমাণ এমন কি কিছু বেশী অর্থও ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় কিছুটা বাড়তি উৎপাদনের কাজে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু কৃষক তার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সে কাজটি করে না। কেননা, সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে ফসলের যে অস্থিতিশীল বাজার এবং কৃষি উপকরণের যে অগ্নি মূল্য তাতে তার গোটা আবাদের বিভিন্ন অংশ যে পরিমাণ মনোযোগ দাবী করে তার একটু হেরফের হলেই পুরো উৎপাদন এককটিই সাংঘাতিক ধরনের এক বিপর্যয়ের সমমুখীন হবে। ফলে কোন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে সে যেতে চায় না। ফলে আগের বছর সে যতটুকু আবাদ করেছিল পরবর্তী বছর সে প্রধানত ততোটুকুর মধ্যেই তার আবাদকে সীমাবদ্ধ রাখে। তার পুরো আবাদ থেকে যা মুনাফা হয় তা দিয়ে সে নিজের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করে। কিন্তু যে কৃষক ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয় তাকে হয়তো ঋণের সুদ প্রদান করতে গিয়েই আবাদ থেকে তার মুনাফার পুরো অর্থ, এমন কি মাঝে মাঝে আসল থেকেও কিছু অংশ প্রদান করতে হয়। সে কারণেই তার দারিদ্র্য ঘোচে না।

শুধু ছোট খামার মালিক নয়, এমন কি প্রান্তিক খামার মালিক, যার খামারের আয়তন হয়তো বা এক বিঘা কিংবা তার চেয়েও কম, তাদের মাঝেও কিন্তু জমি থেকে মুনাফা অর্জন করার তীব্র আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য, এখানে যে মুনাফার কথা বলা হচ্ছে তা একটু বিশ্লেষণের দাবী রাখে। উৎপাদকের উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য করলে অবশ্যই তা মুনাফা। কিন্তু ছোট ছোট উৎপাদন এককগুলিতে যে ধরনের বিশেষায়িত শ্রমশক্তি প্রয়োজন হয়, বিশেষভাবে যে ধরনের নজরদারীর প্রয়োজন হয় এবং পারিবারিক নিষিক্রয় শ্রমশক্তির যে ব্যাপক সক্রিয় ব্যবহার সেখানে হয় তাতে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে যে মুনাফা আসে তা উক্ত উৎপাদনে ব্যবহৃত পুরো শ্রমশক্তির মূল্য অপেক্ষা এতটুকুও বেশী কিনা তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। তথাপি তা যেহেতু একটি দরিদ্র পরিবারকে কিছুটা আর্থিক সুবিধা দান করে সেহেতু পরিবারটির কাছে তা মুনাফা বা লাভ হিসাবেই পরিগণিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যদি সে লাভের অংশ আরও বাড়তি লাভের জন্য বিনিয়োগ করা হয় তা হলেই বিশৃংখলা দেখা দেয়। কেননা, এক বিঘা কিংবা তার চেয়ে ছোট খামারের মালিকগণ প্রধানত শ্রমের বাজারের মানুষ। এদের মধ্যে হয়তো বা কেউ এনজিও-এর ঋণ পেয়ে রিক্সা ভ্যান চালনা কিংবা ছোট ব্যবসার সাথে যুক্ত। ফলে এক বিঘা জমি কিংবা নিবিড় আবাদের ক্ষেত্রে আরও স্বল্প পরিমাণ খামারের মালিক যখনই তার নিজের খামারে বেশী শ্রমশক্তি ব্যয় করতে যায় তখনই তার নিয়মিত উপার্জনে টান পড়ে। এই উভয়বিধ ক্ষেত্রে জমির ক্ষুদে মালিকানা কিংবা মহাজনী শোষণের কোন ভূমিকা নেই। এখানে মূলত কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তি দ্বারা সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্যের পুরোটাই নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রের রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা কৃষকের ঘরে ফসল ওঠার আগেই অগ্রিম কর্তন করে নেয়। পরবর্তী সময়ে ফসলের সাংঘাতিক রকমের অস্থিতিশীল অবস্থা অভাবী পরিবারগুলিকে বড় ধরনের লোকসানের সমমুখীন করে।

যে কৃষক কোন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পায় না সে আসলে কৃষকদের কোন অংশের অন্তর্ভুক্ত? যে কৃষকের ব্যাংকের কাছে আমানত রাখার মত জমির বৈধ কাগজপত্র নেই কিংবা যে পরিবারে ব্যাংকের পিছনে বিপুল সময় ধরে ঘোরাঘুরি করার মত বাড়তি কোন সদস্য নেই সে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পায় না। এরা প্রধানত এ দেশের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদে খামার মালিক, যাদের মালিকানায় জমি রয়েছে এক একর থেকে আড়াই একরের মধ্যে। এরা মূলত তাদের কৃষক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বক্ষণ পরিশ্রম করে যেতে বাধ্য হয়। কৃষকদের এ অংশটি কৃষিকাজ করার বাইরে অন্য কোন কাজে এতটুকু মনোযোগ দিতে পারে না। ফলে তাদের অকৃষি আয়ের পরিমাণ একেবারেই কম। অন্য দিকে, এদের কৃষি থেকে যে উপার্জন হয় তা আসে বিশেষ কয়েকটি মৌসুমে। ফলে এরা এনজিও-এর কাছে থেকেও ঋণ নেওয়ার সাহস পায় না। কেননা, এনজিও ঋণ সুদ-আসলে ফেরত দিতে শুরু করতে হয় ঋণ গ্রহণের পরবর্তী সপ্তাহ থেকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে। এই ছোট খামার মালিকগণই মূলত তাদের সংকটের সময় স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আর যে কৃষক জীবনে এক বার কোন মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয় তার পক্ষে তার কৃষক অস্তিত্ব যতোদিন পর্যন্ত থাকে ততোদিনের মধ্যে স্থিতিশীলতার মুখ দেখা সম্ভব হয় না। মহাজনী ঋণ গ্রহণের পর ওই যে এক বার সে ঘাটতিতে পড়ে গেল আর কোন দিন তার সে ঘাটতি পূরণ হয় না। প্রতি বছর তার জমি বন্ধক দেওয়া কিংবা কিছুটা করে জমি বিক্রি করার পালা চলতেই থাকে। এ অবস্থার ইতি ঘটে যখন সে পরিবারের সদস্যগণ শ্রমের বাজারে নাম লেখায়। অর্থাৎ ক্ষুদ্রে খামার মালিকানা সত্তাটির মাঝে প্রচণ্ড অস্থিরতার সৃষ্টি হয় এবং খামার মালিককে মজুরে পরিণত না করে মহাজনী সত্তাটির বিরাম থাকে না। আসলে অচলায়তন সৃষ্টি হয় খামার মালিক শ্রমের বাজারে প্রবেশ করার পর। কেননা, কোন পরিবার যখন জমি হারাতে হারাতে শ্রমের বাজারে প্রবেশ করে তখনও তার মালিকানায় কিছু জমি থেকে যায়। শ্রমের বাজারে প্রবেশ করার পর আর জমি হারাতে হয় না। তার দৈনন্দিন উপার্জনের একটা রাস্তা হয়। সে সাথে এনজিও ঋণ নিয়েও সে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে পারে। আবার এই কিছুটা জমি পারিবারিক মালিকানায় থাকার কারণে পরিবার সদস্যগণ স্বাধীন মজুরে পরিণত হতেও পারে না। অবস্থা চলতে থাকে দীর্ঘ দিন ধরে। এটাই আসলে বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর অচলায়তনের প্রধানতম দিক। এই অচলায়তনের ক্ষেত্রে ক্ষুদে জোত মালিকানার সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক থাকলেও মহাজনী শোষণের কোন সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর অচলায়তনের আর একটি ক্ষেত্র হল মাঝারী ও বড় খামারগুলি। এই উভয় ধরনের খামারের আওতায় এতটা পরিমাণ জমি আছে যে, প্রধানত পারিবারিক শ্রমশক্তির উপর নির্ভর করে তা আবাদ করা যায় না। তা ছাড়া, মাঝারী খামারগুলির উপরের অংশ এবং বড় খামারগুলিতে আবাদ করতে গেলে তো পারিবারিক শ্রমশক্তি দিয়ে তত্ত্বাবধানের কাজটাও ভাল মত সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। ফলে সে কাজের জন্য তাদের বাজার থেকে বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তিকে ভাড়া করতে হয়। বাংলাদেশের মাঝারী খামারগুলির উপরের অংশ এবং বড় খামার মালিকগণ যদি এভাবে তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করার মাধ্যমে খামারের আওতাভুক্ত পুরো জমি নিজস্ব নিয়ন্ত্রণভুক্ত আবাদের আওতায় আনত তা হলে সে ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার অধীনস্থ না করে কোন উপায় থাকত না কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটছে না। এর প্রায় এক মাত্র কারণ হচ্ছে কৃষি উপকরণের মূল্য ও ফসলের মূল্যের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। ফলে মাঝারী খামার মালিকদের অনেকে এবং বড় খামার মালিকদের প্রায় সকলে নিজের নিয়ন্ত্রিত আবাদ ভেঙ্গে দিয়ে বড় খামার মালিকগণ কি অবস্থান গ্রহণ করে যে, তাকে আমরা সামন্ততান্ত্রিক শোষণ বলতে পারি?

সমাজে এমন উদাহরণ পাওয়া খুব দুষকর যে, নিজের আবাদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর কেউ জমিজমা থেকে পারিবারিক উপার্জনের প্রধান অংশটি অর্জনের আশা করে। তবে এ কথা ঠিকই যে আবাদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর কোন ব্যক্তি নতুন যে পেশার সাথে যুক্ত হয় সে পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে সম্পদ বা অর্থ সে ব্যবহার করে তার মূল উৎস জমিজমাই। হয়তো বা প্রধান ফসল মৌসুমের পর আবাদ ভেঙ্গে দিয়ে ফসলের মূল্যকে অন্য কোন কাজে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। অথবা অপেক্ষাকৃত কম উর্বর জমিগুলিকে ধীরে ধীরে নিজের আবাদ থেকে বাদ দিতে দিতে কয়েক বছরের মাথায় পুরো আবাদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়। অবশ্য, এ ক্ষেত্রে জমি নিজের আবাদের বাইরে চলে গেলেও তা থেকে উপার্জন বন্ধ হয়ে যায় না। সে জমিটা বর্গা দেওয়া হয় কিংবা লিজ প্রদান করা হয়। এখানে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি এসে পড়ে তা হল বড় খামার মালিকের আবাদ বহির্ভূত উক্ত জমি কে গ্রহণ করে এবং কেন গ্রহণ করে? যেখানে নিজের জমিতে আবাদ করেই তা থেকে লাভ করা যায় না, সেখানে বর্গা বা লিজচুক্তির মাধ্যমে অন্যের কাছ থেকে যারা জমি গ্রহণ করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও প্রশ্নটা জাগতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এমন বিপুল সংখ্যক কৃষক পরিবার আছে যাদের পারিবারিক শ্রম শক্তির মোট সামর্থ্যের তুলনায় জমি রয়েছে অনেক কম। এ পরিবারগুলি নিজের খামারের কাজ সমাপ্ত করার পরও লক্ষ্য করে অধিকাংশ সময় তাদের শ্রমশক্তি ব্যবহারের কোন ক্ষেত্র নেই। এই সময়গুলিতে শ্রমশক্তির চাহিদাও তেমন থাকে না যে, বেকার সময়গুলিতে বাজারে গিয়ে ভাল দামে শ্রমশক্তিকে বিক্রি করা যাবে। এ সাথে কৃষক পরিবারগুলির মর্যাদার প্রশ্নও রয়েছে। এ ধরনের পরিবারের কাছে কর্মক্ষম সদস্যদের আংশিক বেকারত্বকে ঘোচানোর জন্যও বর্গা বা লিজচুক্তির মাধ্যমে অন্যের জমি নিজের আবাদের অধীনস্থ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে, উক্ত জমির ফসলের একাংশ প্রদান করা কিংবা তার মূল্য অগ্রিম প্রদান করার পর যা কৃষকের হাতে থাকে তার বাজার মূল্য হয়ত সেই জমিতে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির গড় বাজার মূল্যের চেয়েও কম কিন্তু তা সত্ত্বেও উক্ত শর্তে কৃষকদের জমি গ্রহণ করার ব্যাপারে উৎসাহ প্রবলই থাকে। কেননা, বর্গা বা লিজচুক্তিতে জমি নিয়ে সারা বছরে পরিবারগুলি যে পরিমাণ শ্রমশক্তি সে জমিতে নিয়োগ করে সে পরিমাণ শ্রমশক্তি সন্তোষজনক মূল্যে বিক্রির সুযোগ তারা পেতো না। এটাই তাদের প্রথম লাভ। তাদের দ্বিতীয় লাভ হল কৃষক-গৃহস্থ পদমর্যাদা থেকে নেমে গিয়ে কৃষি শ্রমিকের পরিচয় তাকে বহন করতে হল না। এই পরিবারগুলি নিজের জমির সাথে বর্গা বা লিজ নেওয়া অপরের কিছু জমিতে সারা বছর ধরে প্রচণ্ডভাবে পরিশ্রম করে। ভাল ফসল ফললে হয়তো বা কিছুটা ভাল থাকে, আর ফসল ভাল না হলে কৃষি শ্রমিক বা ক্ষেত মজুরদের থেকেও তাদের আর্থিক অবস্থা নীচে নেমে যায়। ফলে প্রায়ই পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্য কিংবা পরবর্তী মৌসুমের আবাদের জন্য প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহ করার জন্য তাকে ঋণগ্রস্ত হতে হয়। এর পরবর্তী মৌসুমে যদি আবারও তার ভাল ফসল না ফলে তা হলেই তাকে জমি বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু তবুও কৃষক অন্যের জমি বর্গা বা লিজ গ্রহণ করে। এভাবে অন্যের জমি গ্রহণ না করলে হয়তো বা কয়েক বছর আগে থেকেই তার নিজ মালিকানাধীন জমি হারাবার প্রক্রিয়াটি শুরু হত। তাই মহাজনী ঋণ এখন কৃষক সমাজের অচলায়তনকে দীর্ঘায়িত করার কাজে ভূমিকা পালন করে না, বরং অপ্রাতিষ্ঠানিক মহাজনী ঋণ কৃষক সমাজের অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তোলে। স্বল্প জমির মালিক উক্ত কৃষক পরিবারগুলি যদি ব্যাংক কিংবা এনজিও ঋণ পেতো তা হলেই তাদের জীবনে স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু বাস্তবতা হল এ ধরনের কৃষক পরিবারগুলি উক্ত উভয় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণে সুযোগ সেভাবে পায় না।

 

আধা সামন্ততান্ত্রিকতার সাথে নয়া ঔপনিবেশিকতার সম্পর্ক

আমাদের এ উপমহাদেশের কেউ কেউ এমন একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, আধা সামন্ততান্ত্রিকতা যেন নয়া ঔপনিবেশিকতার ফল কিংবা তার অনুষঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর ২০ বছরের পরিস্থিতির দিকে তাকালে তেমনটাই যেন মনে হয়। বাস্তবে কিন্তু তার আগেও বিশ্বে আধা সামন্ততান্ত্রিকতা ছিল। এমন কি, গোটা ইউরোপ জুড়ে শিল্প বিপ্লব ঘটে যাবার সময়ে কিংবা তার পর পরই ইউরোপের বহু দেশে আধা সামন্ততান্ত্রিকতার প্রকাশ সপষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমে পুরো পশ্চিম ইউরোপের গ্রামীণ সমাজে সামন্ত প্রভুদের কর্তৃত্বের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পরও বহু দশক কিংবা একাধিক শতাব্দী ব্যাপী জমির মালিকদের কর্তৃত্ব থেকে যায়। এবং সে কর্তৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল জমির মালিকানা। সেই সমাজের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল মহাজনী শোষণ। কিন্তু সে মহাজনী শোষণ কখনও অচলায়তনকে প্রলম্বিত করে নি, বরং অতি দ্রুত কৃষকদেরকে নিঃস্ব করে ঘর ছাড়া করেছে। নিঃস্ব গ্রামীণ মানুষগুলি অপেক্ষাকৃত সহজেই শহরের কারখানাগুলিতে বিকল্প কর্মক্ষেত্রের সন্ধান করতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে নি। ঔপনিবেশিক যুগে তো নয়ই, নয়া ঔপনিবেশিক যুগেও শহরের কর্মক্ষেত্র তেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায় নি। গ্রামীণ সমাজে সামন্ততান্ত্রিক কিংবা আধা সামন্ততান্ত্রিক শোষণের নিঃস্ব হয়ে কৃষকগণ শহরে এসে বিকল্প কাজের সন্ধান করতে পারে নি। ফলে গ্রামেই অধিকতর আনুগত্যকে স্বীকার করে নিয়ে জমির মালিকদের দ্বারস্থ হয়েছে। ভাগ চাষ আর মহাজনী শোষণের যাঁতাকলে পড়ে বাড়তি উৎপাদনের শক্তিই তারা হারিয়ে ফেলে। ফলে গোটা গ্রামাঞ্চল ক্রমশ অধিকতর পশ্চাৎপদতার নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। গ্রামীণ সমাজের এই অবস্থার সাথে ঔপনিবেশিক স্বার্থের একটি সপষ্ট বিরোধ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কেননা, ক্রয় করবার মত মানুষ না থাকলে বিশ্বপুঁজি বা সাম্রাজ্যবাদের পুঁজি ও পণ্যের বাজার কিভাবে বিস্তৃত হবে? জমির মালিকদের জমির উপর নির্ভর করে ভাল জীবন যাপনের নিশ্চয়তা থাকলে উক্ত অবস্থার পরিবর্তনের কোন সুযোগ থাকে না। আবার এ পশ্চাৎপদতার ধারা দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে গ্রামের সস্তা শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে গ্রামীণ সমাজেই উদয় ঘটতে পারে একটি পুঁজিপতি খামার মালিক শ্রেণীর, যে শ্রেণী অচিরেই হয়ে উঠতে পারে বিশ্বপুঁজির একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেণী। এ দুটি সংকটকে এড়াবার লক্ষ্যেই মূলত বিশ্বপুঁজি তার উপর র্নিভরশীল আমলা-মুৎসুদ্দী পুঁজিপতি শ্রেণীকে নতুনভাবে বিন্যাস করে, রাষ্ট্রের উপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ভার এই শ্রেণীর উপর অর্পণ করে।

এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের উপর থেকে সামন্ত শ্রেণীর কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। এ সুযোগে রাষ্ট্র শক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ফলে ক্রমশ রাষ্ট্র ক্ষমতাই হয়ে ওঠে বিত্ত ও কর্তৃত্ব অর্জনের প্রধানতম উপায়। তথাপি, ততোদিন পর্যন্ত গ্রামীণ সমাজে আধা সামন্ততান্ত্রিকতার অবসান ঘটে নি যতোদিন পর্যন্ত জমির মালিকানাই গ্রামীণ কর্তৃত্ব কাঠামোর নিয়ামক উপাদান হিসেবে টিকে ছিল। বহু সংখ্যক ভূমি সংস্কার কর্মসুচী গ্রামীণ কর্তৃত্ব কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে নি, কিন্তু গোটা কয়েক কৃষি সংস্কার কর্মসূচীই গ্রামের গোটা কর্তৃত্ব কাঠামোকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। আর সে সকল কৃষি সংস্কারের মূল লক্ষ্য কৃষি উৎপাদনকে অলাভজনক করে ফেলা। এ কর্মসূচীর অংশ হিসাবেই কৃষি উপকরণের মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়িতে দেওয়া হয়, এনজিও-এর মাধ্যমে মাইক্রোক্রেডিট প্রদান করার মাধ্যমে গ্রামীণ মধ্য শ্রেণীর বিকাশকে প্রায় রুদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং এই সুযোগে শহরের আমলা-মুৎসুদ্দী শ্রেণী গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি ও সমাজের উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব অর্জন করে। আর তাইতো গ্রামে বসবাসকারী ৫০ বিঘা জমির মালিক পরিবার সদস্যদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই সরকার দলীয় এক জন রাজনৈতিক কর্মী অনেক বেশী কর্তৃত্ববান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রাজনৈতিক কর্মীর কোন জমিই নেই কিংবা সামান্য জমি আছে।

শুধু রাজনৈতিক কর্মীই নয়, সরকারী দপ্তরের এক জন ছোট কর্মচারী কিংবা এক জন টাউটের ক্ষমতার কাছেও অনেক বেশি জমির মালিকগুলির প্রভাব একেবারে ম্রিয়মান বলেই মনে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মী, ছোট কর্মচারী কিংবা এমন কি টাউটও বেশি জমির মালিক হতে পারেন কিন্তু হিসাব নিলে দেখা যাবে জমির আয়ের উপর নির্ভর করার মতো ধৈর্য আর তারা ধারণ করতে পারছে না। রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইতোমধ্যেই অর্থ উপার্জনের ভিন্নতর খাত তারা বের করে নিয়েছে। আমাদের দেশে এ পরিবর্তন কিন্তু বেশী দিনের নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী চার দশক জুড়ে এ দেশে যে নয়া ঔপনিবেশিক শাসন চলেছিল সে শাসন আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলকে পশ্চাৎপদ করে রেখে গ্রামীণ সামন্ত স্বার্থকেই রক্ষা করে চলেছিল। কিন্তু গত দেড় দশকে বিশ্বপুঁজির নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ কৌশলে যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে তার অভিঘাতে সামন্তস্বার্থ সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ক্ষমতা অনেকাংশেই হারিয়ে ফেলেছে। কৃষি উৎপাদন যদি লাভজনক হতো তা হলেও এতদিনে হয়তোবা আধা সামন্ততন্ত্রের অবলুপ্তি ঘটতো কিন্তু সে স্থানটা পূরণ করতো এসে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক। সে রকমটা ঘটে নি। যা ঘটেছে তা হল গোটা কৃষক সমাজ শুধুমাত্র টিকে থাকার বিনিময়ে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে চলেছে বিশ্বপুঁজির ভাণ্ডারকে পূর্ণ করে দেবার কাজে। আর তাই নিতান্ত পুঁজিবাদী সম্পর্কগুলির মধ্যেও এখন আর পুঁজিবাদের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামের লিজচুক্তিগুলির দিকে লক্ষ্য করলেও বিষয়গুলি বোঝা যায়।

 

লিজচুক্তির মধ্যে পুঁজিবাদী উপাদান

সাধারণভাবে লিজচুক্তি পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ককেই নির্দেশ করে। কোন জমি কিংবা অন্য কোন কিছু লিজ গ্রহণের ক্ষেত্রে শর্তই থাকে এমন যে, তাতে নির্দিষ্ট অংকের অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত জমি কিংবা যন্ত্রকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উপায়ে ব্যবহার করার অধিকার অর্জন করা যায়। এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে কোন কিছু গ্রহণ করলে উৎপাদন বিরোধী কোন শর্ত সে চুক্তির মধ্যে থাকে না। ফলে জমিকে কেন্দ্র করে যে লিজচুক্তিগুলি হয় তাতে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মালিকের নিয়ন্ত্রণ আর প্রত্যক্ষভাবে থাকে না, জমিতে উৎপাদিত সামগ্রীর উপরও জমির মালিকের কোন অংশীদারিত্ব কিংবা হস্তক্ষেপ থাকে না। এ দিক থেকে চুক্তির এ রূপটি অনেকটা গণতান্ত্রিক, তথা চুক্তির এ ধরনকে আর সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। তবে সুনির্দিষ্ট উক্ত চুক্তিটি কতটা সামন্ততান্ত্রিকতার গণ্ডি ছেড়ে বের হয়ে আসতে পারে তা বিশেষ কিছু বাস্তবতার উপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে জমিকে নিয়ে যে লিজচুক্তিগুলি হয় সেগুলিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলি হচ্ছে মৌসুমী (কয়েকমাসের জন্য), বাৎসরিক এবং কয়েক বছরের জন্য।

 

মৌসুমী লিজচুক্তি

 

সাধারণভাবে বোরো ধান, গোলআলু বা তামাকের মত মৌসুমী ফসল উৎপাদনের জন্য দেশের ব্যাপক অংশ জমি লিজচুক্তিতে লেনদেন করা হয়। এক মাত্র বোরো ধান আবাদ ছাড়া বাকী ক্ষেত্রগুলিতে বিশেষভাবে পুঁজির ব্যবহার করা হয় এবং সে ক্ষেত্রে স্বল্প পুঁজির ব্যবহার নেই বললেই চলে। এ সকল ক্ষেত্রে যারা লিজ গ্রহণ করে, তারা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদনের লক্ষ্যে পুঁজি বিনিয়োগ করতে কার্পণ্য করে না। পুঁজি বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট সামর্থ না থাকলে কেউ জমি লিজ নিয়ে এ ধরনের আবাদের দিকে আগায় না। তবে শুধু মাত্র বিক্রির উদ্দেশ্যে উৎপাদিত এ সকল ফসলের আবাদ রংপুর, কুমিল্লা বা আর দু’ একটি জেলার কিছু অঞ্চল ছাড়া সারা দেশে তেমন হয় না। অন্য দিকে, একটি মৌসুমের জন্য লিজ নিয়ে বোরো ধান আবাদের প্রচলন এখন বেশ ব্যাপকতা পেয়েছে। তবে বোরো চাষের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে মুনাফার উদ্দেশ্যটি খুব সপষ্ট নয়। বরং কৃষকের পারিবারিক শ্রমশক্তি, সেচযন্ত্র কিংবা কলের লাঙলের সামর্থ্যকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যটি থাকে অনেক বেশী সপষ্ট। অবশ্য, এ সকল সামর্থ্যের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে কৃষক সমাজের মধ্যেও রয়েছে প্রচণ্ড বিরোধ। স্বভাবতই দেখা যায়, একটি সেচযন্ত্র যতটুকু জমির বোরো চাষের জন্য পানি সরবরাহ করতে পারে ততোটুকু জমিতে আবাদ করার সুযোগ সেচ যন্ত্রের মালিক প্রায় কখনই পায় না। কেননা, কৃষকদের জমিখণ্ডগুলি বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো-ছিটানো। আবার জমিগুলির উর্বরতার মানও সমান নয়। ফলে কৃষকদের পরসপরের মধ্যে বিনিময় করে যে জমি এক জায়গায় নিয়ে আসা যাবে তাও নয়।

ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন কৃষক নিজের বড় জমি খণ্ডের উপর সেচ যন্ত্র বসায় এবং তার কাছাকাছি স্থানে অবস্থিত অন্যদের জমি শুধুমাত্র বোরো মৌসুমের জন্য বর্গা কিংবা লিজ চুক্তি নেয়। এ ক্ষেত্রে লিজচুক্তি কিংবা বর্গাচুক্তির মধ্যে কোন মর্মগত পার্থক্য নেই। লিজ কিংবা বর্গা যে চুক্তিই হউক না কেন সেখানে জমির মালিক কিংবা গ্রহীতার এ চুক্তির শর্ত নির্ধারণে তেমন কোন ভূমিকা থাকে না, বাজার চলতি অনুযায়ীই শর্ত নির্ধারিত হয়ে থাকে। বর্গা চুক্তির ক্ষেত্রে স্থান ভেদে ফসলের অর্ধেক, দশআনা, ছয়আনা, তিন ভাগের দুই ভাগ কিংবা এমন কি চার ভাগের তিনভাগও বর্গা গ্রহীতা পেয়ে থাকে। অন্য দিকে, লিজ চুক্তির ক্ষেত্রে জমির মালিক সর্বনিম্ন তিন থেকে সর্বোচ্চ দশ মণ ধান কিংবা তার সমপরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। এ উভয় ক্ষেত্রে যে কৃষক নিজের অর্থ, যন্ত্র ও শ্রমশক্তি নিয়োগ করে আবাদ করে তার উৎপাদনের উদ্দেশ্যের মধ্যে মুনাফার লক্ষ্যটি খুব সপষ্ট নয়। নিজের অর্থ, শ্রমশক্তি ও অন্যান্য উপকরণ যে সামর্থ্য ধারণ করে সেটারই যথাযথ ব্যবহারকে সে নিশ্চিত করতে চায়। এর বাইরে সেচ যন্ত্রের মালিকের আরও একটি উদ্দেশ্য থাকে পানি বিক্রি করা এবং এ ব্যাপারেই সে বেশী আগ্রহী থাকে। কেননা, এতে কিছুটা লাভজনকভাবে পানি বিক্রি করে সে কিছু অর্থ উপার্জন করে। এই নগদ অর্থ দিয়ে সে তার আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপরকণ সংগ্রহের সুযোগ পায়। এসব করে মৌসুমশেষে কৃষক যা উপার্জন করে তা দিয়ে তার পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর পর এমন কোন উদ্বৃত্ত অর্থ তার হাতে থাকে না যা দিয়ে আগের মৌসুমের চেয়ে নিবিড় কোন আবাদে সে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে।

অর্থাৎ অনেকগুলি পুঁজিবাদী অনুষঙ্গকে সাথে নিয়েই কৃষক যা উপার্জন করছে তার কোন অংশকেই সে পুঁজিতে উত্তরিত করতে পারছে না। ফলে পুঁজিবাদের মূল উপাদান পুঁজির অনুপস্থিতি এখানে থেকেই যাচ্ছে, আর এই মূল উপাদনটির অনুপস্থিতির কারণে গ্রামের অপেক্ষাকৃত সামর্থবান কৃষকদের অবস্থানটিও পুঁজিতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারছে না।

বোরো চাষকে কেন্দ্র করে লিজ চুক্তির সাথে সম্পর্কিত আরও একটি কৃষকগোষ্ঠীকে দেখতে পাওয়া যায়। এরা সংখ্যায় বিপুল কিন্তু তারা মূলত খণ্ডকালীন কৃষক। এদের প্রধান পেশা কৃষি নয়, তবে বোরো মৌসুমে এসে তারা নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে কিছুটা জমি আবাদ করে। এদের অধিকাংশই ভূমিহীন। ফলে এরা অন্যের জমি লিজ নেয় কিংবা বর্গা নেয়। এই ভূমিহীনদের আবাদে অংশগ্রহণ নিয়ে সমাজে তেমন কোন দ্বন্দ্বও দেখা দেয় না। এরা প্রধানত দিন মজুর, রিক্সা-ভ্যান চালক কিংবা ছোট ব্যবসায়ী। এদের কম হলেও একটা দৈনন্দিন উপার্জন আসে। এদের আয়ত্তে মূলত কোন কৃষিযন্ত্রপাতি নেই। ফলে নগদ অর্থের বিনিময়ে সামর্থ্যবান কৃষকদের কাছ থেকে তারা সে সকল যন্ত্রের সেবা গ্রহণ করে। বোরো আবাদের পুঁজি সরবরাহের যে বৈশিষ্ট্যটি এখন বিদ্যমান তার অন্তর্গত দিকটির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এই শ্রমজীবী ভূমিহীনদের একটা অংশ খণ্ড কালের জন্য আবাদের সাথে যুক্ত হচ্ছে বলেই একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ আবাদ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে। তাদের বিনিয়োগকৃত এ অর্থ শুধু তাদের লিজ বা বর্গা নেওয়া জমির আবাদকেই নিশ্চিত করছে না, তাদের এ অর্থ কলের লাঙলের মালিক কিংবা সেচ যন্ত্রের মালিকদের কাছে যাচ্ছে বলেই তাদের নিজেদের মাঝারী বা বড় আয়তনের খামারের উপকরণ খরচ নির্বাহ করা সম্ভবপর হচ্ছে। এই ভূমিহীনদের বিনিয়োজিত অর্থই যে বোরো চাষের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অনেকটা সরবরাহ করে থাকে তা অন্য একটি তথ্যের দিকে দৃষ্টি দিলেও বোঝা যায়। সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত এক গবেষণা থেকে দেখা যায়, ছোট ও মাঝারী আয়তনের খামার মালিকদের মধ্যে যাদের হালের বলদ নেই, কলের লাঙল নেই কিংবা সেচযন্ত্র নেই তাদের প্রায় কেউই নিজের দায়িত্বে বোরো চাষ করে না, অথচ একই ধরনের ভূমিহীনগণ বিপুল সংখ্যায় বোরো আবাদের সাথে যুক্ত হয়, যাদের সেচযন্ত্র বা কলের লাঙল আছে তারা যদি উক্ত ভূমিহীনদের কাছে নগদ মূল্যে তাদের সেবা বিক্রির সুযোগ না পেত তা হলে তাদের পক্ষে নিজেদের খামারভুক্ত বোরো আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে উঠতো।

বোরো চাষের জীবন প্রদীপকে জ্বালিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিহীনরা যে অসামান্য ভূমিকা পালন করে থাকে সেই ভূমিহীনদের বোরো চাষে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য কি? কোন ব্যাখ্যার অবতারণা না করেই বলা যায়, লাভ বা মুনাফার জন্য নয়, একেবারেই টিকে থাকার জন্য বছরের কয়েক মাসের খাবার ঘরে মজুদ করার জন্য পরিবারের বাড়তি শ্রমশক্তিকে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নিজেদের সীমিত সঞ্চয় কিংবা দৈনন্দিন উপার্জনের একটা অংশকে তারা বোরো চাষ করার পিছনে ব্যয় করে। অর্থ সংকুলানের অভাবের কারণে তাদের আবাদের অধীনস্থ জমিতে অন্যদের চেয়ে কম ফসল হয়, কোন কোন সময় তাদের নিয়োজিত শ্রমশক্তির মোট বাজার মূল্যটুকুও ফিরে আসে না, তবুও তারা এ কাজে লিপ্ত হয় শ্রমশক্তির বাজার মূল্যের অস্থিতিশীলতা ও শ্রমশক্তি বিক্রয়ের অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ভূত অস্থিত্বের সংকটকে মোকালেবা করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অথচ এরাও জমি লিজ নেয় এবং তার মোট আয়তনও নেহায়েত কম নয়।

 

বাৎসরিক লিজচুক্তি

বাৎসরিক চুক্তিতে জমি লিজ গ্রহণের যে রীতিটি চালু আছে তা সাধারণত গ্রহণ করে ছোট ও প্রান্তিক খামার মালিক কৃষকগণ। পারিবারিক শ্রমশক্তির তুলনায় জমির পরিমাণ কম থাকার কারণে উক্ত কৃষকদের দক্ষতা খুবই নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। এক জন দক্ষ কৃষক তার সামান্য অর্থ ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার আবাদের অধীনস্থ জমি খণ্ডগুলিতে ফসল ফলায়। অন্যের জমি লিজ নিয়ে এলাকার অন্যান্য জমির গড় উৎপাদন থেকে বেশী উৎপাদন করে বলেই কৃষক অন্যান্য বর্গা চাষীর চেয়ে সচ্ছল জীবন যাপন করে। এ ধরনের কৃষকের উদ্যোগে যে উৎপাদন প্রক্রিয়াটি গড়ে ওঠে তার মধ্যে কৃষকের পারিবারিক শ্রমশক্তি ও ভাড়া করা শ্রমশক্তি মিলেমিশে থাকে। বিনিয়োজিত গোটা অর্থই কৃষক নিজে সংগ্রহ করে। তাদের সংগৃহীত অর্থের উৎস প্রধানত দুটি: ১. ব্যক্তিগত সঞ্চয় এবং ২. মহাজনী ঋণ। এরা এনজিও ঋণ পাওয়ার যোগ্য হলেও এনজিওদের শর্ত মেনে এরা সাধারণত ঋণ নিতে চায় না। কেননা, এদের উপার্জন মৌসুমী, ফলে প্রতি সপ্তাহে এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা এদের পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। অন্য দিকে মহাজনী ঋণও এরা গ্রহণ করে সামান্য সময়ের জন্য। এদের সব ফসল ভাল হলে মহাজনের দ্বারস্থ হতে হয় না। যে বছর এদের সব ফসল ভাল হয় সে বছর তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক ব্যয় মিটিয়েও কিছু অর্থ হাতে থাকে। এ অর্থ তারা নতুন কোন জমিখণ্ড ক্রয় কিংবা বাড়ীতে নতুন ঘর তৈরীর পিছনে ব্যয় করে। কিছুটা জমিতে বাড়তি বিনিয়োগও তারা করে, তবে একটি ব্যাপারে তারা খুবই সজাগ থাকে যে, তার আবাদের অধীনস্থ খামারের আয়তন যেন কোন ক্রমেই তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশী হয়ে না পড়ে। কেননা, তা হলেই তার পারিবারিক শ্রম সামর্থ্য দ্বারা তার গোটা খামারের আবাদকে লাভজনকভাবে ব্যবস্থাপন করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এতে গোটা খামারের উৎপাদন বিপর্যয়ের সমমুখীন হয়ে পড়তে পারে।

 

দু’বছর কিংবা তার চেয়ে বেশী সময়ের জন্য লিজ

বাংদেশের অনেক আগে থেকেই শুধু মাত্র বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আখচাষ হয়ে আসছে। বিভিন্ন জাতের পাকা কলাও বেশ কিছু দিন ধরে বিক্রির উদ্দেশ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে। আখের আবাদ ইদানীং কমে এলেও যতোটুকু যা এখন হচ্ছে তার মধ্যকার একটা বড় অংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের আওতায় এসে পড়েছে। পাকা কলার আবাদ তো এখন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এই পাকা কলা আবাদের প্রায় পুরোটাই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে সম্পন্ন করা হয়। কেননা, যার পক্ষে পুরো ১৪ মাস বিনিয়োজিত অর্থের কোন অংশ ফেরত না পেয়েও টিকে থাকা সম্ভব কেবলমাত্র তেমন বিনিয়োগকারীর পক্ষেই এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব। ফলে বাড়ীর আঙ্গিনা বা তার আশেপাশের কিছু অংশ জমিতে কলার আবাদ হয়তো বা কিছু কিছু কৃষক করে থাকে কিন্তু বেশী পরিমাণ জমিতে কলার আবাদের ঝুঁকি সাধারণ কৃষকগণ গ্রহণ করে না। অন্য দিকে, পাকা কলার আবাদ যোগ্য জমির লিজ মূল্য অন্য জমি অপেক্ষা দেড় থেকে দুই গুণ। ফলে যার যেটুকু কলা চাষ যোগ্য জমি আছে তার অধিকাংশটুকুই লিজচুক্তির অধীনে কলা চাষের আওতায় চলে গেছে।

কলা কিংবা আখ সাধারণভাবে এক বছরের ফসল হলেও মাত্র এক বছর আবাদ করে এ থেকে তেমন মুনাফা করা যায় না। আবাদে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয় সে তুলনায় মুনাফা তেমন বেশী হয় না, একই জমিতে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বছরে মূলধন বিনিয়োগ করতে হয় অনেক কম; অথচ এ থেকে ফসল ফলে প্রায় সমপরিমাণ। ফলে একই পরিমাণ লিজ মূল্য প্রদান করে মুনাফা হয় অনেক বেশী পরিমাণে। এ রকম দীর্ঘ দিনের জন্য বিনিয়োগ করার ক্ষমতা সাধারণ ছোট মাঝারি কৃষক পরিবারগুলির থাকে না। যাদের থাকে তারা হয় একেবারেরই কৃষক নয়, কিংবা গ্রামের আধা কৃষক বিত্তবান পরিবারগুলি। এই কলা, আখ বা এ ধরনের অন্য কোন অর্থকরী ফসল উৎপাদন পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার অধীনস্থ।

উপরে লিজ চুক্তির যে প্রকৃতিসমূহের বিবরণ দেওয়া হল তার কোন পরিসংখ্যান গত তথ্য এখানে উপস্থাপন করা হয় নি। সে ধরনের তথ্য উপস্থাপন করারও সমস্যা রয়েছে। কেননা, কি পরিমাণ জমি লিজচুক্তির অধীনস্থ সে তথ্য পাওয়া গেলেও লিজ নেওয়া কোন জমিতে কি ফসল ফলানো হচ্ছে তার কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য এ দেশে নেই। তথাপি, লিজগ্রহণের প্রক্রিয়াসমূহ সম্পর্কে যে আলোচনা এখানে উপস্থাপিত হয়েছে সেগুলির দিকে লক্ষ্য করলেই এ কথা সপষ্ট হয়ে উঠে যে, লিজ চুক্তির অধীনে যে জমি লেনদেন হয় সে জমির প্রধান অংশই এখনও অধনবাদী একটি উৎপাদন প্রক্রিয়ার অধীনস্থ। এখানে অবশ্য সংগতভাবেই একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে যে চুক্তিটা হচ্ছে তার চরিত্র ধনতান্ত্রিক হলেও সে জমিতে যে উৎপাদন প্রক্রিয়াটা চালু করা হচ্ছে তা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উত্তরিত হতে পারছে না কেন? সেখানে বাধা দিচ্ছে কে? সমাজের বিদ্যমান সামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষসমূহ, না অন্য কিছু?

আসলে সামন্ততান্ত্রিকতা থেকে উৎসারিত বিষয়গুলি বাধা দেয় মূলত চুক্তি প্রক্রিয়াতে। বাংলাদেশের অবশিষ্ট সামন্ততান্ত্রিকতার এখন এমন শক্তি নেই যে, জমিকে নিয়ে যে কোন ধরনের লিজচুক্তিকে সে বাধা দিতে পারে। এই শক্তি অর্জনের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক সংযোগ প্রয়োজন গ্রামে বসবাসকারী কোন পরিবারের পক্ষে তা কোন ক্রমেই অর্জন করা সম্ভব নয়।

অন্য দিকে, বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক সামগ্রী বাংলাদেশে বাজারজাত করছে। সরকারের নির্ধারিত কিছু কর ও ডিউটি দিয়ে তারা ইচ্ছামত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছে। এ সকল সামগ্রী আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি কোন রকম ভ্রূক্ষেপ না করে এ দেশে উঁচু মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এ সকল কীটনাশক সামগ্রী যারা আমদানী করে তারা সামগ্রীগুলি দেশব্যাপী বণ্টনের আগে নিজেদের দায়িত্বে তা রিপ্যাকিং করে এবং প্যাকেটগুলির গায়ে ইচ্ছামত মূল্যের লেবেল লাগিয়ে দেয়। সারাদেশে সামগ্রীগুলি পৌঁছে দেবার জন্য এসকল প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী তাদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এই নেটওয়ার্কের সদস্যগণ মূলত কমিশনভোগী। এ সকল কীটনাশক কোম্পানীর মূল প্রতিনিধি বড় জোর কয়েক’শ জন করে, অনেক ক্ষেত্রে এক জন ব্যক্তিই একাধিক কোম্পানীর প্রতিনিধি। এ সকল কোম্পানীর প্রতিনিধি হওয়ার জন্যও যে পরিমাণ আর্থিক সংগতি ও নানা ধরনের সংযোগের প্রয়োজন হয় তা গ্রামে বসবাসকারী কারো পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর বাইরে এনজিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যে সকল কৃষি উপকরণ আসে তার উপর খোদ কৃষকদের নিয়ন্ত্রণের তো কোন সুযোগই নেই। একইভাবে কৃষিযন্ত্রপাতি যারা আমদানী করে তারাও গ্রামের কৃষকদের থেকে অনেক দূরের মানুষ। তবে যে সকল ব্যবসায়ী এগুলি আমদানী করে তাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা অনেক কম এবং বহু সংখ্যক কোম্পানী এ সকল পণ্যের সরবরাহকারী। ফলে এগুলির বাজারদর সেগুলির আন্তর্জাতিক বাজারদর অপেক্ষা খুব বেশী হওয়ার সুযোগ কম। অবশ্য, এর বাজারদরটা নির্ভর করে সরকারের কর কাঠামোর ওপর। অন্য দিকে, কৃষকগণ যা বিক্রি করে তার বাজারদরও সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। সাধারণতই কৃষকরা যখন ফসল ঘরে তোলে তখন তাদের ফসলের মূল্য পাওয়ার ব্যাপারে কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয় না। সরকারী প্রচারণাতে ধান-গমের মত পণ্য সামগ্রীর জন্য গ্রহণযোগ্য একটা দর বেঁধে দেওয়া হলেও সে দরের সুবিধা কৃষক সমাজ কখনও ভোগ করতে পারে না, সে সুবিধা ভোগ করে সরকারী কর্মচারী ও সরকার দলীয় কিছু স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এই স্থানীয় নেতৃবৃন্দেরও কেউ যে কৃষি উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত নয় তা সহজেই অনুমান করা যায়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা বেশ সপষ্টভাবেই অনুমান করা যায়। কিন্তু তারপরও কেন লিজচুক্তিগুলি পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার অধীনস্থ হতে পারছে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে বিদ্যমান গ্রামীণ সমাজ ও তার কর্তৃত্ব কাঠামো এবং তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর চলমান বাজার ব্যবস্থা, সরকারের আমদানী-রপ্তানী নীতি ও তার রাজস্ব নীতি এবং সর্বোপরি গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত যে ভূমিকা পালন করে চলেছে তার মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে। উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ই বিশাল আলোচনার দাবী রাখে। বর্তমান প্রবন্ধে সে সকল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তবে গ্রামীণ সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার উপর গ্রামের বাইরের যে বিষয়গুলি সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিক্রিয়া ফেলে সেগুলি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হবে।

 

গ্রামীণ সমাজের উপর বাজার ব্যবস্থার প্রভাব

সাধারণভাবে গ্রাম সমাজের মানুষের জীবনে এখন বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। চাল, কিছু শাক-সবজী ছাড়া তাদের ভোগ তালিকার প্রায় কোন কিছুই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ উৎপাদন করে না। অন্য দিকে, তারা যা উৎপাদন করে তার মধ্যে এক মাত্র ধান-চালের একাংশ বাদে বাকী সকল কৃষিপণ্য তারা বাজারে বিক্রি করে এবং উক্ত কৃষিপণ্য বিক্রির অর্থ দিয়েই তারা তাদের ভোগ তালিকার নানাবিধ সামগ্রী ও বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করে।

এখন কৃষকদের বিক্রি করার মত সামগ্রী যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই ক্রয়ের মত কৃষি উপকরণের পরিমাণও বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন রকমের কীটনাশক ও কৃষিযন্ত্র চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল, মোবিল ছাড়াও আরও বিভিন্ন যে উপকরণ এখন কৃষকগণ ব্যবহার করে তার তালিকা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইদানীং আবার বীজ ও কিছু কিছু বিশেষ সার বাজারে এসে কৃষকদেরকে আকৃষ্ট করছে। এ সকল কৃষি উপকরণের বাজারের উপর কৃষকদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এ বাজারটা প্রধানত রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অবশ্য, রাষ্ট্র দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছু কৃষি উপকরণ এখন বাজারে আসছে, সে সকল উপকরণের প্রধান অংশ ব্র্যাকের মত বড় বড় এনজিওগুলি নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউরিয়া সারের প্রায় পুরোটা এবং অন্যান্য রাসায়নিক সারের কিছু অংশ সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারখানাগুলিতে দেশেই উৎপাদিত হয়। এ সকল কৃষি উপকরণের পুরোটার উপরই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রত্যক্ষ। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত রাসায়নিক সারও বণ্টন করে সরকার নিজেই। দেশ ব্যাপী কয়েক হাজার যে বড় বড় ডিলার আছে তারা হচ্ছে রাষ্ট্রের স্থানীয় প্রতিনিধি। সরকারের বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার হওয়ার জন্য যে আর্থিক সংগতি দেখাতে হয় তা থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের কারো স্বার্থই কৃষক সমাজের স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। সরকারের বিশাল আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখতে হলে যে রাজস্ব আয়টা প্রয়োজন তা সংগ্রহ করতে হলে সরাসরি কৃষক সমাজের স্বার্থ বিপন্ন না করে আর কোনভাবে বর্তমান বাস্তবতায় তা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। কেননা, বিদ্যমান সমাজের সরকারগুলির যে বিষয়টির উপর সব চেয়ে বেশী আগ্রহ সেটি হলো উন্নয়ন বাজেট। কেননা, উন্নয়ন বাজেটের নামে যে তহবিল গড়ে তোলা হয় সেই তহবিলের টাকাটা নির্বিঘ্নে সরকারদলীয় নেতৃবৃন্দ ও আমলারা মিলে ভাগবণ্টন করে নিতে পারে। আর সে তহবিলটা স্ফীত হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ থেকে ঋণ ও অনুদানের টাকা আসার মধ্য দিয়ে। উক্ত উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান আসার শর্তই হলো দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলিকে অলাভজনক করে ফেলবার মত নীতিমালা গ্রহণ করা। যেমন তারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার করে আসছে বিনা শুল্কে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানীর পক্ষে, অথচ ডিজেলের মত কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য তারা অব্যহতভাবে চাপ দিয়ে আসছে। এবারও ঋণ প্রদানের পূর্বশর্ত হিসাবে তারা তেল-গ্রাস, বিদ্যুৎসহ উৎপাদন সহযোগী বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধির জন্য কঠিনভাবে চাপ দিয়েছে। এ সকল সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি হলে বাংলাদেশের গোটা উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এটা বুঝেও সরকার এটা করছে। কারণ যে শ্রেণীর রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে সে শ্রেণীর স্বার্থের উপর দেশের উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির কোন প্রতিক্রিয়া নেই। তার প্রতিক্রিয়া হয় বিদেশী ঋণ বা অনুদান আসা কমে গেলে। ফলে যে কোন শর্তে তারা বিদেশ থেকে ঋণ বা অনুদান গ্রহণের জন্য চুক্তি করতে প্রস্তুত থাকে। সে চুক্তিসমুহের প্রতিক্রিয়া পড়ে গোটা বাজার ব্যবস্থার উপর এমনভাবে যে গোটা কৃষক সমাজ তাতে দিশাহারা হয়ে ওঠে, সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করেও তারা তেমন কিছু সঞ্চয় করতে পারে না। এ কারণেই কৃষকের হাতের কোন টাকা কখনও পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় না।

উপরের আলোচনাটুকু বাজার ব্যবস্থাকেন্দ্রিক হলেও এ আলোচনার প্রয়োজনে সরকারের আমদানী-রপ্তানী নীতি ও রাজস্ব নীতির যতোটুকু পরিচয় পাওয়া গেছে সেটুকুই সম্ভবত বর্তমান বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য যথেষ্ট। এখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে আরও একটু ঘনিষ্ঠ আলোচনা প্রয়োজন।

 

গ্রাম সমাজ ও তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রভাব

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রশাসন, আইন ও বিচার পৃথক এই তিনটি বিভাগের সমন্বিত রূপ হিসাবে রাষ্ট্রকে দেখা হয়ে থাকে। সরকার সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে। সেনা শাসন না থাকলে আইন বিভাগটা মূলত পার্লামেন্টকে নিয়ে গঠিত হয়। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে। ফলে সরকার দলীয় সাংসদ কিংবা সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দের রাষ্ট্রের বাকী দু’টি বিভাগের উপর বিশেষ প্রভাব বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ দেশে যদি কথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকে তা হলে শাসন ও বিচার এ দু’টি বিভাগ সব সময়ের জন্য একই থাকে এবং আইন বিভাগের পাঁচ বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন ঘটে। আইন বিভাগ তথা সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধি সরকার দলীয় এমপি ও সরকার দলীয় স্থানীয় নেতৃবৃন্দেরও পাঁচ বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন হয়। আগেই বলা হয়েছে সরকার দলীয় সাংসদ কিংবা স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কেউ কৃষি উৎপাদনের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু তা হলেও পাঁচ বছর অন্তর অন্তর তাদের গ্রামের কৃষকদের কাছে যেতে হয়। সেই যাওয়াটা না গেলে ভোট ভিক্ষা পাওয়াটা দুষকর হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছে নির্বাচনের বিষয়টি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক বিষয়। জনসাধারণ অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক খেলার চূড়ান্ত পর্বের মত করে নির্বাচনকে উপভোগ করে। বর্তমানে নির্বাচনের সময় প্রতিযোগিতার প্রাণবন্ত চরিত্রের জন্য হানিকর বহু ধরনের উপাদান এর সাথে যুক্ত হয়েছে, সে কারণে এ প্রতিযোগিতাটা অনেক সময় পানসে হয়ে ওঠে। প্রয়োজনের তুলনায় অধিক অর্থের সমাগম, পেশীশক্তির ব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতা ও নানা ধরনের অন্ধতা প্রতিযোগিতার অনেক সুন্দরতম দিকের হানি ঘটায় কিন্তু তার পরেও দেখা যায় নির্দিষ্ট কোন রাজনীতিকে আশ্রয় করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়টা নির্ধারিত হয় খুব কম ক্ষেত্রেই। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত মূল ভূমিকাটা পালন করে নির্বাচনপূর্ব সামাজিক মেরুকরণ। নির্বাচনপূর্ব সামাজিক মেরুকরণের ব্যাপারটা কিভাবে নির্ধারিত হয়?

স্বাধীনতা পরবর্তী ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে এ দেশের কৃষকসমাজ বুঝেছে সরকার পরিবর্তনের সাথে তাদের জীবন-জীবিকার পরিবর্তনের কোন সম্পর্ক নেই। সে কারণে জাতীয় রাজনীতির বিষয় নিয়ে তারা তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু তথাপি তারা সব সময়ই দুই কিংবা ততোধিক ধারায় মেরুভূত হয়ে অবস্থান করে। তারা যে সমাজে বসবাস করে সেখানে বসবাস করতে গেলে এ ভিন্ন কোন উপায় নেই। কেননা, বিদ্যমান গ্রামীণ সমাজে যে মূল্যবোধটা প্রচলিত আছে তার ঊর্ধ্বে সেখানকার কেউ নয়। মান-মর্যাদা, নিরাপত্তা, আত্মীয়তা, গোষ্ঠী ইত্যাদি বিষয়ে যে গড় মূল্যবোধ সেখানে চালু আছে তা দ্বারাই সেখানকার মানুষের সামাজিক অবস্থানটি নির্ধারিত হয়। সেই মূল্যবোধ দিয়ে যেমন সামাজিক সম্পর্কগুলিকে রক্ষা করতে হয় তেমনই সেই মূল্যবোধ দিয়েই পারিবারিক সমমান ও মর্যাদাকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতে হয়। সে সাথে রয়েছে সামাজিক সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েন এবং জমিসহ নানাবিধ বিষয় সংশ্লিষ্ট সম্পর্কসমূহ। এ নিয়ে সেখানে রয়েছে নানাবিধ বিরোধ। আর এ সকল বিরোধ মীমাংসার জন্য প্রায়ই সেখানে অনুষ্ঠিত হয় মীমাংসা সভা বা সালিশ। সালিশ কোন সমাধান দিতে না পারলে কিংবা যে কোন এক পক্ষের সালিশের সিদ্ধান্ত অস্বীকার করার কারণে বিষয়টি থানা-পুলিশ কিংবা কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। এ ধরনের বিষয় এক বার থানা-পুলিশ বা কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে বিরোধের সাথে সম্পর্কিত দুটি পক্ষই সীমাহীনভাবে আর্থিক ক্ষতির সমমুখীন হয়। সে কারণে গ্রামের সাধারণ মানুষ সেখানকার সমাজের কর্তৃত্ব ব্যবস্থার ব্যাপারে অনেক বেশী পরিমাণে আগ্রহী থাকে। এই বিষয়টিই এখন রাষ্ট্র প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের সাথে গ্রামের জনসাধারণের যোগসূত্রের মূল ক্ষেত্র।

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম এখন দুই বা ততোধিক সামাজিক দলে বিভক্ত। গোষ্ঠী, আত্মীয়তা ও ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সামাজিক দল গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে বটে, তবে সেগুলিই গ্রামীণ সমাজের সামাজিক দল গঠনের মুখ্য উপাদান নয়। সামাজিক দল গঠনের ক্ষেত্রে মুখ্য উপাদান হল স্বার্থগত বিষয়সমূহ। আর এই সামাজিক দলসমূহকে নেতৃত্ব দেয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষিশ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন, নিকটস্থ শহরের সরকার দলীয় কিংবা প্রধান বিরোধী দলীয় নেতার সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ। এই সম্পর্কের কারণে দলভুক্ত পরিবারগুলির জমি সংক্রান্ত কিংবা অন্যান্য মামলা-মকদ্দমার কাজ তারা দেখা-শোনা করে দেয়। অন্য দিকে, নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে সরকারের কাছ থেকেও জনসাধারণের জন্য কিছু সেবা এনে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। এ সকল ভূমিকার মধ্য দিয়ে নিজের সামাজিক দলের উত্থান ঘটার ফলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমাজসমূহের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বসেছে।

বর্তমানে অধিকাংশ গ্রামের সমাজসমূহ সামাজিক দলসমূহ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। আগের সমাজগুলি যে সকল গোষ্ঠী ও পরিবার নিয়ে টিকে ছিল সেগুলির অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল হিসাবে বিভিন্ন সামাজিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এই সামাজিক দলসমূহ ক্রমশ জাতীয় রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে এবং প্রতিবেশী অন্যান্য গ্রামের সমমনা সামাজিক দলসমূহের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছে। এর ফলে গ্রামের জনসাধারণের শ্রেণীগতভাবে মেরুভূত হওয়ার কোন সুযোগ থাকছে না। এখানে একটি নির্দেশক বিষয় হচ্ছে, বেশী জমির মালিক হয়েও এখনও যারা গ্রামে বসবাস করেন তাদের প্রায় কেউই এখন উক্ত সকল সামাজিক দলে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছেন না। গ্রামে তাদের অবস্থানটি এখন অনেকাংশে নিরপেক্ষ। গ্রামে তাদের অবস্থানটি এখন খুবই ক্ষয়িষ্ণু। বাড়ির চাষাবাদ ভেঙ্গে দিয়ে জমি বর্গা ও লিজপ্রদান করে যা পায় তাই দিয়েই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কোন পার্শ্ব আয়েরও ব্যবস্থা করতে পারে না, বর্গা দেওয়া জমির ফসল কিংবা জমির লিজ মূল্য আদায় করার ধান্দা নিয়েই তাদের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে হয়। প্রায় প্রতিটি গ্রামের এ ধরনের পরিবারগুলি যেন একেবারে নিঃসঙ্গ। পুরুষানুক্রমে গ্রামীণ কর্তৃত্ব কাঠামোর শীর্ষে থেকেও এখন তারা সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এর পিছনে মূল কারণ হলো, কৃষিকর্ম অলাভজনক হয়ে ওঠা। যতোদিন চাষাবাদ লাভজনক ছিল ততোদিন পরিবারগুলি তাদের ভোগ তালিকায় যা অন্তর্ভুক্ত করতে পারতো এখন তা পারে না, ততোদিন সামাজিক কর্মকাণ্ড কিংবা নিজের প্রভুত্ব জাহির করতে যে ধরনের বাড়তি খরচ করতে পারতো এখন তা পারে না, জমি বর্গা নেওয়ার জন্যও কেউ এখন আনুগত্য প্রকাশ করে তার পিছন পিছন ঘোরে না। ফলে সমাজের উপর প্রভুত্ব বজায় রাখার জন্য তার হাতের ঐতিহ্য উপকরণগুলিই এখন হাত ছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও টিকে আছে তার মূল্যবোধ। কোনভাবে শিক্ষিত হয়ে পরিবারের তরুণ সদস্যগণ যদি ইতোমধ্যেই গ্রামের বাইরে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ না করতে পারে, তা হলে এ ধরনের পরিবারের পুরুষ সদস্যগণ না হতে পারে মাস্তান কিংবা না নিতে পারে কোন ঝুঁকি। মেয়েরা প্রাচীন মূল্যবোধের শিকার হয়ে গৃহের অভ্যন্তরেই বন্দী হয়ে থাকে এবং তারা ধারণ করে নানা ধরনের কুসংস্কার ও অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব। ফলে তাদের পক্ষে গ্রামের নারী সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয় না।

এ রকম ধরনের সামাজিক বাস্তবতায় শাসক শ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলি গ্রামের মানুষের ভোট সংগ্রহের জন্য গ্রামের সামাজিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দকে দলের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর একটি সামাজিক দলের নেতৃবৃন্দের কর্মকাণ্ড যদি ভাল না হয় তা হলে উক্ত সামাজিক দলটির সদস্য সংখ্যা হ্রাস পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্র প্রকাশ্যে এর তেমন প্রতিক্রিয়া পড়ে না, তবে ভোটের সময় সে প্রতিক্রিয়াটা সপষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের গত দু’তিন যুগের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এই গোটা সময়টাতেই শ্রেণী দাবী নিয়ে গ্রামের কৃষককে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা সব সময়ই কম-বেশি অব্যাহত ছিল। কিন্তু কৃষকরা সেই শ্রেণীর দাবীতে সংগঠিত না হয়ে মেনে নিয়েছে শ্রেণীর দাবী বিবর্জিত সামাজিক দলসমূহের নেতৃত্ব।

তা হলে কি এ কথা মেনে নিতে হবে যে, গত সময়গুলিতে গ্রামীণ সমাজের পরিবারগুলি যাতে সপষ্ট কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে না পড়তে পারে সে লক্ষ্যেই দেশের অর্থনীতি পরিচালিত হয়েছে? আর সেটাই কি ছিল গত সময়ের শাসকদের রাজনৈতিক অর্থনীতি? এক জন উৎপাদকের কিংবা কোন উদ্যোক্তার যদি মুনাফা করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে, মুনাফার অর্থ যদি লাভজনক কোন খাতে পুনঃবিনিয়োগের কোন সুযোগ না থাকে তা হলে সেখানকার পরিবারগুলি উৎপাদন সম্পর্কের বিচারে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ার কোন সুযোগ পায় না। আর্থিক জীবনে শ্রেণীগতভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় না বলেই এদেশের গ্রামীণ জনসাধারণ শ্রেণীগতভাবে সংগঠিত হবার জন্য কোন তাগিদ অনুভব করে না। আর তাই বাম রাজনৈতিক দলগুলির নেতা-কর্মীদের বিপুল আত্মত্যাগ আর নিষ্ঠাযুক্ত প্রচারণা কৃষকদের কাছে অরণ্যে রোদনের মতই মনে হয়। তাই এ কথা এখন ভাবার সময় এসেছে ’বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা ধনতান্ত্রিক না আধা সামন্ততান্ত্রিক’-এ বিতর্ক আর কত দিন চলবে।

বাস্তবতা হল এ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে সামন্তবাদ পরিপূর্ণভাবে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু পুঁজিবাদ সেভাবে গড়ে ওঠে নি। পুঁজিবাদ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে বিশ্বপুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এ দেশীয় রাষ্ট ব্যবস্থা ও তার দ্বারা পুষ্ট আমলা-মুৎসুদ্দী শ্রেণী। এ দেশের অর্থনীতি এখন নয়া ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অধীন। জাতীয় অর্থনীতির এই নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রই কৃষি অর্থনীতির আধা সামন্ততান্ত্রিকতা ভেঙ্গে ফেলেছে, পুঁজিবাদকে প্রতিস্থাপিত হতে দেয় নি, গড়ে উঠেছে এক নতুন ধরনের অর্থনীতি যাকে শুধু মাত্র নয়া ঔপনিবেশিক অর্থনীতি’ নামক শব্দ গুচ্ছ দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব।

২৬/০১/২০০২ ইং

(বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজ গবেষক ডঃ লেনিন আজাদ কর্তৃক লিখিত নিবন্ধটি “বাংলাদেশ তত্ত্ব বিষয়ক ত্রৈমাসিক” “আত্মপ্রকৃতি”-এর ১২/২ (শ্রাবণ-আশ্বিন ১৪১০) এবং ১২/৩ ও ৪ (কার্তিক-চৈত্র ১৪১০) এই দুইটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। - বঙ্গরাষ্ট্র)

অনলাইন: ১৬ জুলাই, ২০০৯

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive
 
সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ