Banner
স্বপ্ন আর বাস্তবতার কবি পাবলো নেরুদা -- এম, এ, আজিজ মিয়া

লিখেছেনঃ এম, এ, আজিজ মিয়া, আপডেটঃ November 22, 2010, 6:00 PM, Hits: 32083

 

১৯৭১ সালে নোবেল ভাষণে চিলির মহান কবি ও বিপ্লবী পাবলো নেরুদা বলেন যে, ‘... আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি যে, মানুষ তার ছায়ার সাথে, আচরণের সাথে, কবিতার সাথে যে আটকে আছে, মানুষের যে সমাজবদ্ধতার চেতনা, তা সম্ভব হয়েছে কারণ মানুষের একটা প্রচেষ্টা আছে স্বপ্ন আর বাস্তবকে এক সাথে মেলানোর। কবিতা এই স্বপ্ন আর বাস্তবকে মেলানোর কাজটা করে।’ তাঁর ভাষণটি ছিল সহজ, সরল ও নিরাভরণ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে চেতনা জাগানিয়া। এখানে তার মন, মানস ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্ফুটিত হয়েছে। স্বদেশের রোমান্টিক নিসর্গ, বিরামহীন বৃষ্টি, বুনোফুল, লতাগুল্ম, জীববৈচিত্র্য, নারীর প্রতি প্রবল আবেগঘন মুগ্ধতা ও মানব প্রকৃতির বন্দনা-গান তাঁর কবিতাকে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তাছাড়া শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন তিনি যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন তা তুলনাহীন। শ্রমজীবী মানুষের জন্য তার নৈকট্য আর সহমর্মিতা তার কবি স্বভাবকে করেছিল গহনতা সন্ধানী। আর এ ব্যাপারে তাঁর শিক্ষয়িত্রী চিলির আরেক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি গাব্রিয়েল মিস্ত্রাল শৈশব-অতিক্রান্ত দিনগুলোতে কবিতা চর্চার জন্য যে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন নেরুদার মধ্যে নেরুদা সারা জীবন জীবনচর্যা ও কাব্যপ্রীতি দ্বারা তা লালন করেছেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল আজ থেকে শত বর্ষ পূর্বে ১৯০৪ সালে ১২ জুলাই দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের দেশ চিলির তেমুকোতে। তাঁর বাবা ছিলেন রেলশ্রমিক এবং মা ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। জন্মের এক মাস পরেই মা যক্ষা রোগে মারা যান। পিতা আবার বিয়ে করেন। সৎমা হলেও তিনি নেরুদাকে আপন সন্তানের মত আদর করেছেন, স্নেহ করেছেন। সুতরাং শৈশব ও কৈশোর কাল তাঁর ভালভাবেই কেটে যায়।

১৯২১ সালে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাবলো নেরুদা সান্টিয়াগোতে গেলেন কলেজে ভর্তি হতে। কলেজে ভর্তি হলেন। শুরু করেন ফরাসী ভাষা শিক্ষা। কিন্তু পড়াশোনায় মন নেই। ঝুঁকেছেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। কেমন একটা ছন্নছাড়া জীবন শুরু হয়ে গেছে। কতিপয় তরুণ কবি বন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জন্মেছে। তাঁর কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। পিতৃ প্রদত্ত নাম পরিত্যাগ করে ইতিমধ্যে ‘পাবলো নেরুদা’ ছদ্ম নাম গ্রহণ করেছেন। পুত্রের কাব্যচর্চা পিতার ভাল লাগে নি। পিতা মাসোহারা বন্ধ করে দিলেন। মহা চিন্তায় পড়ে গেলেন নেরুদা। তিন তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার একটি উপন্যাস। কিন্তু অর্থ পেয়েছেন খুবই কম। এ দিকে জীবন আর চলে না। পিতার কাছেও হাত পাততে সায় দেয় না মন। চাকুরীর খোঁজাখুজি শুরু করেন। কয়েক মাস কেটে গেল। ঠিক সে সময় চিলির বিদেশ দপ্তর থেকে রেঙ্গুন অফিসের জন্য একজন লোক খোঁজ করা হচ্ছিল। রেঙ্গুন তখন বৃটিশ অধীনস্থ বার্মার রাজধানী। তিনি সেখানে কাজে যোগ দিলেন। পরিচিত কেউ নেই। কেউ ভাষাও বোঝে না। অফিসের কেউ কেউ অল্পস্বল্প স্প্যানিশ ভাষা বোঝে। কথা বলবার লোক নেই, অসহনীয় পরিবেশ। তবুও তিনি রেঙ্গুনে রয়ে গেলেন। এমন নির্জন প্রবাসে তার একমাত্র সঙ্গী কবিতা।


রেঙ্গুনে চার বছর কেটে গেল। এ সময় এক বর্মী তরুণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তরুণীটির মধ্যে উদ্দামতা দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই নেরুদা অনুভব করলেন তার মধ্যে এক আদিম বন্য উদ্দামতা। সে সময় তার সিংহলে বদলীর আদেশ হলে গোপনে সিংহল চলে যান । নেরুদার খোঁজে মহিলাটি সিংহল পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিল। এ বন্য প্রেমকে নেরুদা তার বহু কবিতায় অবিস্মরণীয় রূপ দিয়েছেন। তাছাড়া বার্মার নিঃসঙ্গ জীবন ভুলে থাকার জন্যও বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন। এ কবিতাগুলোর একটি সংকলন পরে প্রকাশিত হয়। সিংহলে কিছুদিন থাকার পর এলেন বাটাভিয়ায়। এখানে এক ডাচ তরুণী মারিয়া এন্তোনিয়েতাকে তার ভাল লাগে। বিয়ে করে কয়েক মাস ভালই কাটে জীবন। কিন্তু মারিয়া স্প্যানিশ ভাষা জানে না। স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষার জন্য মারিয়ার আগ্রহও ছিল না। নেরুদার কবিতার প্রতিও মারিয়া ছিল উদাসীন। দু’জনার দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শগত পার্থক্য ক্রমশই প্রকট হতে শুরু করে। তাই বাটাভিয়া ছেড়ে চলে গেলেন পিতার কাছে তেমুকোতে।

কিন্তু ততদিনে তেমুকোর পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। সেই বনভূমি ও নির্জন প্রকৃতি আর নেই। গড়ে ওঠেছে শহর। অসংখ্য মানুষের স্রোত। এ পরিবেশ তাঁর ভাল লাগে না। নিজেকে যেন পরবাসী মনে হতে থাকে। অরণ্য, মুক্ত প্রান্তর তাঁকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সংসারে মারিয়ার সাথে অশান্তি বেড়ে চলে। সম্ভব হয় না এক সঙ্গে থাকা। বিবাহ বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময়ে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘রেসিডেন্স অন আর্থê’ প্রকাশিত হয়। চারদিক থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন পেতে শুরু করেন। সে সূত্র ধরেই আর্জেন্টিনার তরুণী চিত্র শিল্পী দলিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। দু’জন দু’জনার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। অল্পদিনের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তাঁরা।

কাব্যখ্যাতি লাভ করলেও অর্থ প্রাপ্তি তেমনটা ঘটেনি। তাই আবার চাকুরী নিলেন বিদেশ দপ্তরে। ১৯৩৪ সালে চিলির কন্সাল হয়ে গেলেন স্পেনের বার্সিলোনায়। স্পেনের মানুষের মধ্যে নিজেকে খঁুজে পেলেন তিনি। সেখানকার মানুষের মুখের ভাষাই তার সাহিত্যের ভাষা। সেখানকার তরুণ কবিদের সঙ্গে তার পরিচয় হল। স্পেনের বুদ্ধিজীবীরাও স্বাগত জানান এ তরুণ কবিকে। স্পেনের সমকালীন রাজনীতি, গণমুখী সাহিত্য গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল নেরুদাকে। তিনি প্রকাশ করেন রেসিডেন্স অন আর্থ-এর সেকেন্ড পার্ট। স্পেনের সাহিত্য জগতে তা তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে প্রতিষ্ঠা পেলেন স্পেনে। তারপর তিনি চলে গেলেন মাদ্রিদে।

সে সময় মাদ্রিদ স্পেনের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও নাট্যকারদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এদের অনেকের সঙ্গে নেরুদার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। তখন স্পেনে আবির্ভাব ঘটেছিল এক মহা স্বৈরাচারী শাসক ফ্রাঙ্কোর। দেশজুড়ে শুরু হয় গৃহ যুদ্ধ (১৯৩৫-১৯৩৯)। ফ্রাঙ্কো উত্তর আফ্রিকা আক্রমণ করে। সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। স্পেনের গৃহ যুদ্ধে যোগ দেয় দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং        চিন্তাবিদেরা। ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কোর বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রায় শতাধিক কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে ক্রিস্টোফার কডওয়েল, র্যাল্‌ফ ফক্স, গার্থিয়া লোরকা (১৮৯৯-১৯৩৬) অন্যতম। ফ্যাসি বিরোধী জনযুদ্ধে যোগ দিতে পৃথিবীর ৫৪টি দেশ থেকে ৩০,০০০ মানুষ যোগ দেয়। রোমাঁ রোলা, পাবলো নেরুদা সহ কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা পৃথিবীর সকল দেশে ফ্যাসি বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলেন। ট্রেঞ্চে যুদ্ধ করার পাশাপাশি কবিতাও হয়ে ওঠে জনযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার। পাবলো নেরুদা লিখলেন তাঁর ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ ‘স্পেন ইন মাই হার্ট’ (১৯৩৮)। ফ্যাসিস্ট ফাঙ্কোর বাহিনী রাজপথে বইয়ের বহ্নুৎসব করলো। কবি বন্ধুদের হারিয়ে এমনকি কনসালের পদটি হাড়িয়েও তিনি দমে যান নি। সরবে কবিতাকে শ্রোতাদের কানে তুলে দেন। এ ব্যাপারে স্ত্রী দলিয়াও তাঁকে আন্তরিকভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন। সন্তান সম্ভবা দলিয়াকে নিয়ে স্পেন ত্যাগ করে প্রথমে তিনি প্যারিসে চলে যান এবং পরে চিলিতে।

চিলিতে এসেও তিনি রাজনৈতিক আন্দেলন থেকে নিজেকে নিবৃত করেন নি। জোরাল ভাষায় স্পেনের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। দেশে দেশে সংগ্রামী মানুষদের কাছে প্রচার করতে থাকেন তাঁর রচনা। এ সময় তাঁর কবিতা সংকলন ‘দ্য ফিউরাস অ্যান্ড দ্য পেইনস’ প্রকাশিত হয়। প্রথম যৌবনে তিনি লিখেছিলেন প্রেমের কবিতা, আর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন সংগ্রমের কবি।

আমি যখন প্রেমের কবিতা লিখি,

আমার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে

ঝর্ণার মত কবিতার ধারা......


ওরা আমাকে বলেছে, ‘কি মহান তুমি থিওকরিটাস’।


আমি বলেছি, আমি থিওকরিটাস নই।

জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে পেয়েছি,

জয় করেছি, চুম্বন করেছি।

তারপর প্রবাহিত মানুষের জীবনের

মুখোমুখি হওয়ার জন্য

হেঁটে গিয়েছি

পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, খনির গুহাগর্ভে।

দু‘বছর কেটে গেল কর্মহীন জীবন। ১৯৪০ সালে কনসাল জেনারেল হিসেবে তাঁকে পাঠানো হল মেক্সিকোতে। তিন বছর তিনি সেখানে ছিলেন, সাহিত্যচর্চাও করেছেন। যোগাযোগ রেখেছেন চিলির রাজনৈতিক জগতের অনেকের সাথে। তখন চিলিতে চলছে পালা বদলের পালা। চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে এলেন চিলিতে। বই বিক্রি বাবদ নিয়মিত অর্থ পাচ্ছেন। অর্থের অভাব ছিল না। ঘুরে বেড়ালেন বৈচিত্র্যময় দক্ষিণ আমেরিকা। বিমুগ্ধ হয়ে দেখলেন প্রকৃতির অপরূপ শোভা। পেরুতে এক রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে লিখলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘দ্য হেইট অব মাচ্ছু পিচ্ছু’। শুধু প্রকৃতি নয় দক্ষিণ আমেরিকার শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের জীবন-যাত্রা ও দুঃখ-বেদনার কথাও গভীরভাবে তিনি উপলব্ধি করলেন। তিনি ভাবলেন এসব মানুষের মুক্তির কথা। চিলিতেও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র মার্কসবাদই পৃথিবীর তাবৎ শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে। ১৯৪৫ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে তিনি চিলির আইনসভার সিনেটর নির্বাচিত হন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দান করেন এবং আমৃতুø পার্টির সভ্য ছিলেন। সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করে তিনি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের মুক্তির পক্ষে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর কবিতা নতুন বাঁক নেয়। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের কবি, কৃষক-শ্রমিক, খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের কবি। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল সমস্ত অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সংগাÞমের প্রতীক হিসেবে।


১৯৪৮ সালে চিলির স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট ভিদেলার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বিরোধ ঘটে। ভিদেলা কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইউরোপের বহু দেশের সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন। সংবাদ পেয়ে সঙ্গী দলিয়াকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন নেরুদা। এক শহর থেকে আরেক শহর। কোথাও বেশী দিন থাকতে পারেন না। শেষে সীমান্ত পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় এসে আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবনেও তাঁর কলম থেমে থাকে নি। এ সময়কার লেখা ছোট ছোট কবিতাগুলো হাজার হাজার মানুষের মুখে মন্ত্রধ্বনির মত উচ্চারিত হতে থাকে। বহু ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়।

পলাতক জীবনে কবির পরিচয় হয় মাতিলদে উরুতিয়া নামক চিলির এক তরুণীর সাথে। দু          ’জনের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিবাদ দেখা দেয় দলিয়ার সঙ্গে এবং অবশেষে দীর্ঘ ১৬ বছর পর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। চিলির রাজনৈতিক জীবনেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। তিনি চিলিতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এবং সমুদ্রের ধারে একটি বাড়ী নির্মাণ করেন। মাঝে মধ্যে একাই বেড়িয়ে পড়তেন এবং মাইলের পর মাইল বেলাভূমিতে ঘুরে বেড়াতেন, জেলেদের সাথে গল্প করতেন, ঝিনুক কুড়াতেন আর সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে কবিতা লিখতেন। ছোট ছোট সাধারণ বস্তুই তার কবিতার বিষয় ছিল। ইউরোপের বহু দেশ থেকে তিনি আমন্ত্রণ পেলেন। তিনি রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, বৃটেন ভ্রমণ করলেন। সবর্ত্রই অভূতপূর্ব সম্মান আর সংবর্ধনা। রাশিয়া থেকে তাঁকে ‘স্ট্যালিন পুরষ্কার’ দেয়া হয়। দেশে ফিরে আসার এক বছর পর প্রকাশিত হল তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘জেনারেল সঙ (১৯৫৪) ও এলিমেন্টাল ওড্‌স (১৯৫৪)। কবিতার মত কবি ভেসে গেলেন স্ত্রী মাতিলদে উরুতিয়ার প্রেমের জোয়ারে। শুরু করলেন আবার প্রেমের কবিতা লিখতে। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হল ‘ওয়ান হান্ড্রেড লাভ সনেট’। এ কবিতাগুলোর মধ্যে আত্মমগ্নতার সুর প্রবল হয়ে উঠেছিল। জীবনে খ্যাতি, ঐশ্বর্য, অর্থ, সম্মান, সুখ পেয়েও নিজেকে হারিয়ে ফেলেন নি কবি। তাঁর আত্মজীবনী ‘ইসলা দেগরা’ তে লিখেছেন ছেলেবেলার কথা, চেনাজানা মানুষের কথা, জীবন ও সংগ্রামের কথা এবং জন্মস্থান তেমুকোর কথা। গদ্যের ভাষা সেখানেও ছন্দময় হয়ে উঠেছে।

১৯৬৯ সালে তিনি আবার কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত হন। কেননা তাঁর বিশ্বাস ছিল রাজনীতি ও সংগ্রামই মানুষের মুক্তির পথ। ১৯৭০ সালে চিলির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হলেন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ হতে। বামপন্থী দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে নামলেন বন্ধু সালভাদর আলেন্দে। প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিলেন বন্ধু আলেন্দের পক্ষে। নির্বাচিত হলেন আলেন্দে। চিলির এক নতুন যুগের সূচনা হল। নেরুদা রাষ্টদূত হয়ে গেলেন ফ্রান্সে। এক বছর পর ১৯৭১ সালে তাঁর অসাধারণ সাহিত্য কর্মের জন্য তাঁকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হল। চিলির জনগণের পক্ষ হতে তাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হল। চিলির জননন্দিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে বন্ধু নেরুদাকে অভিনন্দন জানাতে প্যারিস ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘নেরুদার কবিতায় সমগ্র চিলি রূপায়িত। চিলির নদী, পাহাড় আর চিরন্তন তুষার মৌলি পর্বত শ্রেণী আর রুক্ষ মরুভূমি সবই তাঁর কাব্যে স্থান পেয়েছে, কিন্তু তা সবচেয়ে বেশী স্পর্শ করেছে সাধারণ মানুষকে।’ চিলির ভাগ্যাকাশে তখন দুর্যোগের ঘনঘটা শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তখন ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে সমাজতন্ত্রী সরকারকে উৎখাতের জন্য। অসুস্থ নেরুদার কলম শাণিত হয়ে ওঠে। তিনি লেখেন, ‘আমি কোন সমালোচক বা প্রবন্ধকার নই, আমি সাধারণ এক কবি। তবুও কখনো এমন সময় আসে যখন আমাকে কিছু বলতে হয়, বিশেষত আর সকলে যখন নীরব হয়ে থাকে। আমি চিৎকার করে দেখিয়ে দিই সেই শত্রুদের যারা যুদ্ধ চায়, যুদ্ধের আগুনে ধ্বংস করে মানুষের সৃষ্টিকে।

১৯৭৩ সালে মার্কিনীদের প্ররোচনায় ও সরাসরি হস্তক্ষেপে চিলিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১১ সেপ্টেম্বর প্রথমে নৌবাহিনী ও পরে সেনাবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রেসিডেন্টের ভবন আক্রমণ করে। সাম্রাজ্যবাদের পাচাটা দালাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলেন প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। সামরিক জান্তা পিনোচেটের বাহিনী সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করে। মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন চিলির জনগণ। জেনারেল প্রেসিডেন্ট যে কত শিল্পী, সাহিত্যিক ও সৃজনশীল মানুষকে বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। হত্যা করেছে চিলির আর লাতিন আমেরিকার বিবেকী কণ্ঠস্বর কণ্ঠশিল্পী ভিক্টর হারাকে। নিজ গৃহে বন্দী করে রাখলেন অসুস্থ কবি নেরুদাকে। তখন শোনা গিয়েছিল নেরুদাকে মেরে ফেলা হয়েছে। লাতিন আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের মানবতাবাদী ও সাহিত্য প্রেমী মানুষেরা দারুণ উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। আলেন্দের মৃতুøর  পর সে দেশের ঘৃণ্য সেনাবাহিনী নেরুদার বাসভবনটি ঘিরে রেখেছিল। তাঁর কানে পৌছাচ্ছিল কেবল গোলাবারুদের শব্দ আর মানুষের মর্মভেদী আর্তনাদ। হত্যা, রক্ত, বারুদ আর ধোঁয়ার গন্ধ কেবল বাতাসে ভাসছিল। সকল প্রচার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। কর্কট রোগ ও এমনি মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে তিনি নিঃসঙ্গ ও একা ছিলেন। সেবা ও চিকিৎসার জন্যও কোন ব্যবস্থা ছিল না। পার্শ্ববতী দেশ থেকেও সাংবাদিকেরা কোন সঠিক সংবাদ দিতে পারেন নি। বিছানায় শুয়েই মৃতুø পথযাত্রী কবি লিখলেন তাঁর সর্বশেষ কবিতাঃ

‘নিক্সন ফ্রেই নিকোচেত

১৯৭৩ এ ভয়ঙ্কর সেপ্টেম্বর মাস

....    আমাদের ইতিহাসের

ক্ষুধার্ত হানেয়ার দল।

আমাদের বিজয় পতাকাকে

ছিন্ন ভিন্ন করেছে, লুণ্ঠন করেছে

নিউইয়র্কের ক্ষুধার্ত নেকড়ে গুলো

বেশ্যার দালাল...

শুধুই অত্যাচার আর অত্যাচার, কোন আইন নেই

শুধু ক্ষুধা আর চাবুক।’

হেনরিক বোরোডিকের দেওয়া এক তথ্য থেকে জানা যায় যে, ‘১৯ সেপ্টেম্বর নেরুদার অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে। তাকে ভর্তি করা হয়      সান্তামারিয়া হাসপাতালের ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডে। হাসপাতালে ভর্তি করা মাত্র ঐ ওয়ার্ডটিকে সামরিক কতৃêপক্ষ পরিণত করল কয়েদখানায়। তাঁর কাছে কাউকে যেতে দেওয়া হল না, এমনকি তাঁর সঙ্গে আত্নীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হল। এর পর ২৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় তাঁর হৃৎস্পন্দন থেমে গেল চিরকালের জন্য।’ মৃতুøর সময়েও ভুবন-বিখ্যাত এ মহান কবিকে মানবিক ভালবাসার স্বাদ স্পর্শ করতে দেয় নি ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনী। সবকিছু ছিল তাঁর জন্য নিষিদ্ধ, শুধু মৃতুø ছাড়া। মৃতুø-মুহূর্তেও চরম অবমাননা করেছে এ মহান কমিউনিস্ট কবিকে। মৃতুøর অল্প সময়ের মধ্যে ফ্যাসিস্ট বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাঁর বাড়ীটির উপর। শুরু করে দেয় তাণ্ডবলীলা। হেনরিক বোরোভিকের ভাষায়, ‘তারা রাইফেলের বাট দিয়ে ঘরের দরজা-জানালা ভাঙ্গল আর ঘর থেকে বাইরে ছঁুড়ে ফেলতে লাগল কবির পাণ্ডুলিপি ও বইপত্র। কোন কাগজে লেখা কোনো শব্দ যাতে তাদের সন্ত্রস্ত করতে না পারে সে জন্য কাপুরুষেরা তল্লাশীর সময়ে টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ল হিসাবের খাতা, মেঝেতে পাতা বোর্ডগুলো, প্লাস্টারের কাজ। নীতিহীন এ আকাট মূর্খরা তাদের হাতের নাগালে যা কিছু পেল সবই ধ্বংস করল। এমনকি মহান শিল্পী পাবলো পিকাসোর চিত্রকলাও তারা বেয়োনেটের খোঁচায় ছিঁড়ে ফেলল, আর ভারতীয় চীনা মাটির অপূর্ব কারুকার্য খচিত অমূল্য সম্পদগুলো মেঝের উপর আছড়ে ভাঙ্গল। বুক শেলফ, শার্সি, দরজা, কোন কিছুই রেহাই পেল না, ধ্বংস করা হল সবকিছু। অবশেষে চলে যাবার সময় তাদের ফ্যাসিস্ট দসুøবৃত্তিকে সম্পূর্ণ করার জন্য সমস্ত জলের কলের মুখ খুলে দিল। একই দৃশ্য অভিনীত হল কবির ইসলা নেগ্রাতে, ভোরের আবছা অন্ধকারে’।... এ যেন বাংলাদেশের আরেক একাত্তর।


নেরুদার কাব্য নিষিদ্ধ করা হল অঘোষিতভাবে; বহ্নি উৎসব করা হল তাঁর গ্রন্থের। তাঁর মৃতুøর পর জেনারেল পিনোচেট শোকসভা, শোকমিছিল পযর্ন্ত করতে দেয় নি চিলির জনগণকে। সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে আগুন চাপা হৃদয়ে অগণিত ছাত্র-যুবক-নারী আর শ্রমিকা সৈন্যদের উদ্যত বেয়োনেট অগ্রাহ্য করে শবানুগমনে এগিয়ে চলে। তাঁর কবিতাকে কণ্ঠে ধারণ করে গান গাইলেন নীরবে-নিঃশব্দে। ফুলে ফুলে ভরে গেল তাঁর কফিন। দীর্ঘ শোক শোভাযাত্রা। আকস্মিক বজ্রপাতের মত শত শত শবানুগামীর মধ্য থেকে কে যেন গেয়ে উঠল ইন্টারন্যাশনাল। আর মৃতুøর পর দ্রুত প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আত্মজীবনী, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এক কবির জীবনালেখ্য। কিছুদিন পরে বেরুল পর পর কয়েকটি কবিতা। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হল। নেরুদার মৃতুøর পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘গণ সাহিত্য’ পত্রিকা একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সেখানে কবি বিঞ্চুদে অনূদিত দু’টি কবিতা পত্রস্থ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পাবলো নেরুদা বাঙালী ও ভারতীদের হৃদয়ে বহুকাল ধরেই শ্রদ্ধার ভিন্ন আসন করে নিয়েছিলেন। ১৯২৮, ১৯৫০ ও ১৯৫৭ সালে তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন। চিন্মোহন সেহানবীশের সঙ্গে তিনি কবি বিষ্ণুদের বাড়ীতে যান এবং অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হন। ১৯৫৮ সালে সাহিত্য পত্রে বিষ্ণুদে-কৃত নেরুদার কবিতার অনুবাদ বের হয়। এবং পরে বিষ্ণুুদে’র ‘হে বিদেশী ফুল’ গ্রন্থে এ অনুবাদ গুচ্ছ স্থান লাভ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর নৈতিক সমর্থনের কথা কোনদিন ভুলবার নয়।

পাবলো নেরুদা তাঁর নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার কবিতা এবং আমার জীবন প্রবাহিত হয়েছে এক আমেরিকার নদীর মতো, দক্ষিণ পার্বত্য অঞ্চলের গোপন হৃদয়ের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া ঘূর্ণিময় চিলির জলের মতো, যা অবিশ্রান্ত স্রোত প্রবাহ বজায় রাখে সমুদ্রের দিকে। প্রবাহে বয়ে আনা কোন কিছুকেই আমার কবিতা বাতিল করে না; গ্রহণ করে ভাবাবেগের তীব্রতায়, ... আর কাজ করে যায় জনগণের হৃদয়ে। আমিতো কষ্ট করেছি, লড়াই করেছি ভালবাসতে কিংবা গান গাইতে গিয়ে। পেয়েছি বিজয় ও পরাভবের ভাগ। স্বাদ পেয়েছি রুটি ও রক্তের। একজন কবি আর কি চায়! ... আমি বেঁচেছি আমার কবিতার জন্য এবং আমার প্রার্থিত সব কিছু পুষ্টি পেয়েছে আমার কবিতায়।’ নিজের সম্পর্কে তিনি নিজেই সুন্দর মূল্যায়ন করেছেন। এর অধিক কিছু কেউ মূল্যায়ন করেছেন -- আমাদের জানা নেই। আজ শত বর্ষ পরে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে তাঁর কথা দিয়েই শেষ করছি, ‘আজকের সমাজ মনস্ক কবি পুরোনো কালের পুরোহিতের মতো। পুরোনো কালে তিনি হাত মিলাতেন অন্ধকারের সঙ্গে আর এখনকার কবি অবশ্যই ব্যাখ্যাতা হবেন আলোর।’

তথ্য সূত্রঃ

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষী -- মাইকেল এইচ. হার্টি।

সংবাদ সাময়িকী, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪।

সাপ্তাহিক একতা, সেপ্টেম্বর ২০০৪।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive
 
সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ