Banner
অধ্যায় ৪ ভারতে এখনও এত মানুষ হিন্দু কেন?

লিখেছেনঃ এম এ খান, আপডেটঃ July 20, 2012, 4:07 PM, Hits: 6557

উপরোক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ সুস্পষ্ট করে যে, হিন্দুরা কখনোই ইসলামের দ্বারা আকৃষ্ট হয় নিবরঞ্চ প্রবণতাটি ছিল এর বিপরীত: ইসলাম থেকে পুনরায় হিন্দুত্বে ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষাবিরল ক্ষেত্রে যখন কোন উদার মুসলিম শাসক ক্ষমতায় আসেন ও জনগণকে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুযোগ দেন, তখন ইসলামের অবনতি ঘটে এবং পাশাপাশি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্ম বিকশিত ও বিস্তৃত হয়এ কথা মুসলিম ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতগণই লিখে গেছেন

বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসনের পরও ভারতবর্ষে কেন প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ অমুসলিম রয়ে গেছে, উপরোক্ত আলোচনায় তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নিম্নে বর্ণিত হবে যে, ভারতীয় বিধর্মীরা সহস্রাব্দব্যাপী নিষ্ঠুর মুসলিম শাসনাধীনে দৃঢ়তার সাথে চরম সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে মর্যাদাহানি, অবমাননা ও বঞ্চনা এবং উৎপীড়ণ মূলক কঠোর করের বোঝা সহ্য বা বহন করেছে; এরপরও তারা পৈতৃক ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থেকেছে

এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনাযোগ্য যে, তাত্ত্বিকভাবে যদিও মুসলিমরা ১১শ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে, কিন্তু বাস্তবে তারা কখনোই গোটা দেশের উপর অধিকার বা শাসন বিস্তার করতে পারে নিমুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রীষ্টাব্দে সিন্ধু আক্রমণের পর প্রথম তিন শতাব্দে মুসলিম শাসন বিশাল ভারতের উত্তর-পশ্চিমের সামান্য অংশে সীমাবদ্ধ থাকেওসব অঞ্চলে মুসলিমদের এখনকার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এটাই প্রমাণ করে যে, দীর্ঘকালব্যাপী যে যে অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা শক্তভাবে বিরাজ করেছে, সেসব অঞ্চলে মুসলিম শাসকরা কার্যকরভাবে জনগণের উপর ইসলাম চাপাতে সক্ষম হন

কেবলমাত্র সম্রাট আকবরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বকালে (১৫৫৬-১৬০৫) ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীনে আসেকিন্তু আকবর ছিলেন ইসলামের সবচেয়ে বড় ধর্মত্যাগী; তিনি ইসলাম ধর্ম বিস্তারে কোনো সহযোগিতা করেননিতার সুদীর্ঘ পাঁচ দশকের শাসনামলে মুসলিম জনসংখ্যা বিস্তৃত হওয়ার পরিবর্তে সম্ভবত ক্রমশঃ হ্রাস পায়আকবরকে অনুসরণ করে পরবর্তী পঞ্চাশ বছর তার ছেলে জাহাঙ্গীর ও নাতি শাহজাহানের শাসনামলে ইসলামীকরণ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে শক্তিশালী হতে পারে নি

আকবরের প্রপৌত্র গোড়া আওরঙ্গজেব (রা. ১৬৫৮-১৭০৭) যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন ইসলামীকরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ রাষ্ট্রের মূল নীতির অন্তর্ভুক্ত হয়কিন্তু তার শাসনামলে আবার দেশের সর্বত্র বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেবার্নিয়ার-এর মতে, আওরঙ্গজেবের বর্বর নিষ্ঠুর শাসনামলে উদ্ধত রাজপুত ও মারাঠা যুবরাজগণ সবসময় ঘোড়ায় চড়ে সম্রাটের প্রাসাদ প্রাঙ্গনে যেততারা তাদের দেহরক্ষীদের সহযোগে সশস্ত্র অবস্থাতেই প্রাসাদে প্রবেশ করত47

আওরঙ্গজেব যখন ওমরের চুক্তি ও শরীয়া আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অমুসলিমদের জন্য অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন উদ্ধত ও ভয়ঙ্কর রাজপুতদেরকে এ আইনের আওতাবহির্ভূত রাখা হয়অমুসলিমদের প্রতি আওরঙ্গজেবের ভয়ঙ্কর ও স্বেচ্ছাচারী নীতি সত্ত্বেও তিনি যখন জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করেন, তার প্রতিবাদে শিবাজী ও রানা রাজসিংহের মতো বিদ্রোহীরা সম্রাটের কাছে পত্র পাঠায়সম্রাটের কর্মচারীরা (আমিন) কর আদায় করতে গেলে উদ্ধত প্রজারা তাদের একজনকে হত্যা করে ও অপর একজনকে হিন্দুরা চুল-দাড়ি কেটে অপমানিত করে খালি হাতে ফেরৎ পাঠায়48

এমন কি আকবর ও জাহাঙ্গীরের সুপ্রতিষ্ঠিত মুঘল শাসনামলেও দেশব্যাপী তাদের প্রভাব ছিল অনেকটাই ভঙ্গুরজাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথা তারিখ-ই-সেলিম শাহীতে লিখেছেন: ...অবাধ্য ও আনুগত্যহীনদের সংখ্যা মনে হয় কোনদিনও হ্রাস পাবে নাআমার পিতার ও পরবর্তীতে আমার শাসনামলে যেসব নজীর দেখা গেছে, তাতে মনে হয় সাম্রাজ্যে এমন কোনই প্রদেশ নেই, যার কোন না কোন অংশে অভিশপ্ত দুর্বৃত্তরা উঠে এসে বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরছে না; যার কারণে হিন্দুস্থানে কখনোই সম্পূর্ণ শান্তির সময় দেখা যায়নি হিন্দুদের ঔদ্ধত্য সম্পর্কে ডার্ক হ. কল্‌ফ লিখেছেন: লক্ষ লক্ষ সশস্ত্র মানুষ, চাষী অথবা অন্যরা, সরকারের প্রজা না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল আকবরের রাজ্যসভার সদস্য বাদায়ূনির জানান, হিন্দুরা জঙ্গলে তাদের গোপন আশ্রয়স'ল থেকে মাঝে মাঝেই মুসলিম বাহিনীর উপর হামলা করতোযারা জঙ্গলে পালিয়েছিল, তারা জঙ্গলের জংলা ফলমূল ও নানারকম শস্য-দানা যেখানে যতটুকু পেত তা খেয়েই জীবনধারণ করতো49 কেন ও কীভাবে ভারতবর্ষে দীর্ঘকালের ইসলামী শাসনের পরও শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী মানুষ হিন্দু রয়ে গেছে, এসব উদাহরণ সে সম্পর্কে পাঠককে যথেষ্ট ধারণা দিবে

ভারতে ইসলামে ধর্মান্তর ঘটে কিভাবে?

উপরোক্ত প্রমাণের আলোকে - দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের পরও কিভাবে ভারতের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ অমুসলিম রয়ে গেছে? - সেটি প্রশ্ন না করে, প্রশ্ন করা উচিত: ইসলামের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রবল বিদ্বেষ ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও কেন বা কীভাবে প্রায় ২০ ভাগ ভারতীয় মুসলিম হয়? অর্থাৎ বহু মুসলিম লেখক ও শাসকদের সত্যায়ন অনুযায়ী ইসলামের প্রতি হিন্দুদের বিরূপতা সত্ত্বেও কিভাবে মুসলিম জনসংখ্যা স্ফীত হয়?

তলোয়ার দ্বারা ধর্মান্তর

কুরআনের ৯:৫ আয়াতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী নবী মুহাম্মদ বহুঈশ্বরবাদীদেরকে হয় ইসলাম গ্রহণ অথবা মৃত্যু - এ দুটো উপায়ের একটি বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে তরবারীর দ্বারা ইসলামে ধর্মান্তরিত করা শুরু করেনসুতরাং মূর্তিপূজক হিন্দুদেরও ইসলাম কিংবা মৃত্যু - এ দুটোর একটি বেছে নেওয়ার কথামুহাম্মদ বিন কাসিম যখন সিন্ধু বিজয় শুরু করেন, তিনি বিজিত এলাকার লোকদেরকে মৃত্যুর যন্ত্রণায় ইসলামে ধর্মান্তরিতের নীতি প্রয়োগ শুরু করেনযারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, মৃত্যু হয় তাদের বিধিলিপি; বাকী নারী ও শিশুরা দাসত্ব বরণের মাধ্যমে মুসলিম হয়ে যাবেতবে তিনি সুযোগ দেন যে, কোন অঞ্চল যদি বিনা যুদ্ধে তার কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে তিনি গণহারে হত্যা বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করবেন নাতার কিছুটা নমনীয় নীতির খবর বাগদাদে তার পৃষ্ঠপোষক হাজ্জাজের কাছে পৌঁছালে তিনি কাসিমকে লিখেন:

...আমি জানতে পেরেছি যে, তুমি যে উপায়ে ও নিয়মে এগোচ্ছো তা (ইসলামের) আইনসম্মততবে তুমি শত্রু-মিত্রের ভেদাভেদ না করে, ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাইকে সুরক্ষা দিচ্ছঈশ্বর বলেন: অবিশ্বাসী পৌত্তলিকদেরকে কোনো সুযোগ না দিয়ে গলা কেটে ফেল জেনে রাখো, এটা মহান আল্লাহর নির্দেশতাদেরকে রক্ষার জন্য তোমার এতটা উদগ্রীব হওয়া উচিত নয়এরপর থেকে ইসলাম গ্রহণকারী ছাড়া কাউকে বাচিয়ে রেখো নাএটা একটা মূল্যবান প্রচেষ্টা ও তা মেনে চললে তোমার উপর মর্যাদাহানির কোন অভিযোগ আরোপিত হবে না50

হাজ্জাজের নিকট থেকে এ হুমকীপূর্ণ নির্দেশ পেয়ে কাসিম তার পরবর্তি ব্রাহ্মণাবাদ বিজয়ে আগাগোড়া তা অনুসরণ করে যারা ইসলাম-প্রত্যাখ্যানকারী কাউকে জীবিত রাখে নিআল-বিলাদুরীর জানান: ব্রাহ্মণাবাদ বিজয়ে আট কিংবা কারো কারো মতে ছাব্বিশ হাজার মানুষকে তরবারীর তলায় হত্যা করা হয়51 যাহোক, হিন্দুরা অগণিত সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে এতগুলো মানুষকে তলোয়ারের তলায় ফেলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়তৎপরিবর্তে তাদেরকে বাচিয়ে রেখে কর আদায় করা ছিল অত্যন্ত লাভজনক বিকল্পএ পরামর্শে কাসিম হাজ্জাজকে চিঠি লিখলে হাজ্জাজ উত্তর করেন:

আমার ভাতিজা মুহাম্মদ কাসিমের পত্র পেয়ে প্রকৃত ঘটনা অবগত হলামএতে জানা যাচ্ছে যে, ব্রাহ্মণাবাদের বিশিষ্ট নাগরিকরা তাদের বৌদ্ধ মন্দির মেরামত ও তাদের ধর্মানুসরণের সুযোগের জন্য আবেদন করেছেযেহেতু তারা আনুগত্য স্বীকার করেছে ও খলীফাকে কর দিতে সম্মত হয়েছে, সুতরাং তাদের কাছ থেকে আর কিছুই সঠিকভাবে আশা করা যায় নাতারা আমাদের সুরক্ষায় (ধিম্মি/জিম্মি হিসেবে) এসেছে, এবং আমরা কোনভাবেই তাদের জীবন বা সম্পদের উপর হস্ত প্রসারিত করতে পারি না 52

এভাবে হিন্দুরা জিম্মি প্রজা হিসেবে গৃহীত হয় এবং তরবারীর দ্বারা ধর্মান্তর করা থেকে অব্যাহতি পায়

উমাইয়া শাসকদের ধর্মান্তরকরণে অনীহা: আগেই বলা হয়েছে যে, ধার্মিক মুসলিমরা বরাবরই উমাইয়া শাসকদেরকে ঈশ্বরহীন বা ধর্মহীন বলে নিন্দা করেছেতার একটা কারণ, উমাইয়া শাসকরা অমুসলিমদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরকরণে কখনো আগ্রহী ছিল নাতৎপরিবর্তে তাদের কাছ থেকে উচ্চহারে কর আদায়ের মাধ্যমে রাজকোষ পূর্ণ করার দিকেই তাদের অধিকতর ঝোঁক ছিলউদাহরণস্বরূপ, হাজ্জাজ ইসলাম গ্রহণকারীদের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করতেন53 যখন একদল প্রজা তাকে জানাতে আসে যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, হাজ্জাজ তাদের ধর্মান্তর প্রত্যাখ্যান করেন ও তার বাহিনীকে হুকুম দেন ওসব নব্য মুসলিমদের তাদের গ্রামে ফেরত পাঠানোর জন্য54 মিসর বিজয়ের সময় মুয়াবিয়া (পরে প্রথম উমাইয়া খলীফা) মিসরীয় কপ্টরা (খ্রীষ্টান) গণহারে মুসলিম হয়ে যায় কিনা, সে চিন্তায় উদগ্রীব হয়ে উঠেনকেননা তিনি মনে করেন: সবাই ইসলাম গ্রহণ করলে জিজিয়া কর দেওয়া থেকে মুক্ত হয়ে তারা অর্থভাণ্ডারের বড় একটা লোকসান ঘটাবে 55

হিন্দুদের প্রতি ধর্মহীন উমাইয়া শাসকগণ প্রদর্শিত এ নমনীয়তা ছিল স্পষ্টতঃই কুরআন ও হাদীস নির্দেশিত ইসলামের আদর্শ আইনের অমান্যকরণইসলামের অবমাননাকারী এ দৃষ্টান্ত বা ছাড় পরবর্তীতে হানাফী আইনে অঙ্গীভূত হয়, যদিও ইসলামের অন্যান্য সব আইনশাস্ত্রগুলো পৌত্তলিকদেরকে ইসলাম গ্রহণ কিংবা মৃত্যুর রায় বহাল রেখেছেকাজেই, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের ক্ষেত্রে ভারতীয় হিন্দুরা নমনীয় উৎপীড়নের সম্মুখীন হয়

৭৫০ সালে ঈশ্বরহীন উমাইয়া রাজবংশকে নিশ্চিহ্ন করে অধিকতর গোড়া ইসলামী আব্বাসী শাসকরা ক্ষমতায় এলে অনেক ক্ষেত্রে হিন্দুদেরকে মৃত্যুর ভয়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়সাফারাইদ শাসক ইয়াকুব লাইস ৮৭০ সালে কাবুল দখল করে কাবুলের রাজকুমারকে বন্দী করেনতিনি আর-রাখাজ-এর রাজাকে হত্যা করে মন্দিরসমূহ ধ্বংস ও লুণ্ঠন করেনএছাড়াও ইয়াকুব লেইস আর-রাখাজের বাসিন্দাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেনতিনি লুণ্ঠনের মালামাল বোঝাই করে রাজধানীতে ফিরে যান, যার মধ্যে ছিল তিন রাজার মস্তক ও ভারতীয় পূজার্চনার অনেক মূর্তি56

সুলতান মাহমুদের মন্ত্রী আবু নাসের আল-উত্‌বী লিখেছেন, সুলতান মাহমুদের কনৌজ বিজয়কালে নাগরিকরা হয় ইসলাম গ্রহণ করে অথবা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে ইসলামের তরবারীর খাবারে পরিণত হয় 57 উত্‌বী আরও লিখেছেন, বারান দখলের সময় আল্লাহর তরবারী খাপমুক্ত করে শাস্তির চাবুক তোলা হলে ১০ হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হতে ও মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান করতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠে 58

শিক্ষিত, মার্জিত ও ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকাহ্‌) পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত সুলতান মাহমুদ এক একটি শহর জয়ের পর সাধারণত পরাজিত পক্ষের যুদ্ধ করতে বা অস্ত্র ধরতে সক্ষমদের গণহারে হত্যা করতেন, তাদের নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাস হিসেবে কব্জা করতেন এবং অবশিষ্টদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতেনতিনি প্রায়শই এভাবে ধর্মান্তরিত এক রাজপুত্রকে সিংহাসনে বসাতেন, যে অবশ্যই ইসলামী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং ইসলামের বিস্তার ও প্রতিমা-পূঁজা প্রতিরোধের তদারকী করবেএরূপ এক ধর্মান্তরিত যুবরাজ ছিলেন নওশা শাহআল উত্‌বী লিখেছেন, ‘সুলতান মাহমুদের ভারত ত্যাগের পর নওশা শাহর উপর শয়তান ভর করে, কারণ তিনি পুনরায় মূর্তি-পূঁজার দিকে ঝুঁকে পড়েনসুতরাং সুলতান ঝড়ের বেগে সেখানে গিয়ে শত্রুর রক্তে তরবারী রঞ্জিত করেন59 এর অর্থ দাঁড়ায় যে, সুলতান মাহমুদ তার ভারত অভিযানের সময় শুধুমাত্র তলোয়ার দিয়ে জনগণকে ধর্মান্তরিতই করেন নি; তিনি গজনী ফিরে যাবার পর নব্য মুসলিমরা যাতে তাদের পিতৃপুরুষের ধর্মে ফিরে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতেনএমনকি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের সময়ও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েক মিলিয়ন অমুসলিমকে মৃত্যুর মুখে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় (দেখুন এ লেখকের ইসলামী সাম্রাজবাদ বইটি)


ক্রীতদাসকরণের মাধ্যমে ধর্মান্তর

ভারতে ইসলামের প্রথম সফল অনুপ্রবেশেই মুহাম্মদ বিন কাসিম দেবল, ব্রাহ্মণাবাদ ও মুলতানে বিপুল সংখ্যক মানুষকে হত্যা করেনসাধারণত অস্ত্র বহনে সক্ষম এমন বয়সের যুবা-বৃদ্ধ যারাই মুসলিমদের আক্রমণের সময় তার বাহিনীর সামনে পড়ে, তাদের সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়নিঃসন্দেহে এ অবস্থায় তারা জীবন বাঁচাতে প্রিয়জন স্ত্রী-সন্তানকে বিপন্ন অবস্থায় রেখে যে যেদিকে পেরেছে পালিয়েছেতাদের নারী ও শিশুদেরকে বিজয়ী বীরেরা ক্রীতদাস হিসেবে ধরে নিয়ে যেতচাচনামায় লিখিত হয়েছে যে, কাসিমের রাওয়ার আক্রমণে ৬০,০০০ লোক ক্রীতদাস হয়, এবং সিন্ধু বিজয়ের চূড়ান্ত পর্বে ১০০,০০০ নারী ও শিশু ক্রীতদাসে পরিণত হয়60

সবগুলো মুসলিম অভিযানে ক্রীতদাস হিসেবে ধৃত নারী ও শিশুদের সংখ্যা পদ্ধতিগতভাবে লিখিত হয় নিধারণা করা যেতে পারে যে, সেহওয়ান, ধালিলা, ব্রাহ্মণাবাদ ও মুলতানের মত প্রধান প্রধান আক্রমণে প্রায় সম সংখ্যক মানুষ বন্দী হয়কাজেই ভারতের সিন্ধু সীমান্তে কাসিমের তিন বছরের (৭১২-১৫) সংক্ষিপ্ত, অথচ কৃতিত্বপূর্ণ, অভিযানে সম্ভবত কয়েক লাখ লোক ক্রীতদাস হিসেবে ধৃত হয়কাসিম সব সময় কুরআন, নবীর দৃষ্টান্ত ও শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী (কোরান ৮:৪১) বন্দী ও অন্যান্য লুণ্ঠিত সামগ্রীর এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রের হিস্যারূপে দামেস্কে খলীফার নিকট প্রেরণ করে অবশিষ্টাংশ তাঁর সৈনিকদের মাঝে বিতরণ করে দিতেনএভাবে ক্রীতদাস নারী ও শিশুরা মুসলিমদের সম্পদে পরিণত হয় ও ইসলামে প্রবেশ করেকয়েক বছরের মধ্যেই এসব ক্রীতদাস শিশুরা যখন পরিণত বয়সী মুসলিম হয়ে উঠে, তখন তারা হিন্দুদের বিরুদ্ধে আয়োজিত নতুন পবিত্র যুদ্ধে লিপ্ত হতে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়অথচ যে হিন্দুদের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হতো, তারা কয়েক বছর আগে ছিল তাদেরই আত্মীয়-স্বজন, একই ধর্মের অন্তর্ভুক্তঅর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে দাস হিসেবে কব্জাকৃত এসব শিশুরা মুসলিম রাষ্ট্রের হাতিয়ারে পরিণত হয় - ইসলামের পরিধি বিস্তারে জিহাদে লিপ্ত হয়ে পরাজিত অবিশ্বাসীদেরকে তলোয়ারের হুমকিতে ধর্মান্তরকরণ, তাদের নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাস বানানো এবং তাদের ধনসম্পদ লুণ্ঠনের জন্যএমনকি ১৯৪৬-৪৭ সালে ভারত ভাগের আন্দোলনকালেও প্রায় ১০০,০০০ হিন্দু ও শিখ নারীদের দাসী বানানো হয়তাদেরকে বাড়ী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে মুসলিমের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় (দেখুন ইসলামী সাম্রাজবাদ)

বংশবৃদ্ধির যন্ত্ররূপে ক্রীতদাস নারী

কুরআন ও নবীর প্রথা বা হাদীস অনুযায়ী নারী-বন্দীরা তাদের মুসলিম মালিক বা প্রভুদের দ্বারা যৌনদাসীরূপে ব্যবহৃত হতো (ইসলামে চর্চিত দাসপ্রথা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন এ লেখকের ইসলামী দাসত্ব বইটি)সুতরাং তারা দাসীরূপে ধৃত মুসলিম হয়ে সরাসরি মুসলিম জনসংখ্যা তো বৃদ্ধি করেই, পরন্তু মুসলিমদের জন্য সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েও তারা মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে মূল্যবান ভূমিকা রাখেবিশেষত সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হিন্দু নারীদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ভয়ে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুরা ফিরে এসে দেখতো যে, তাদের নারী ও সন্তানরা আর নেইএর ফলে হিন্দুরা সন্তানাদি জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সঙ্গী থেকে বঞ্চিত হয়অর্থাৎ যেখানেই মুসলিমরা সফল আক্রমণ করেছে সেখানেই হিন্দুদের বংশবৃদ্ধি থমকে যায় বা দ্রুত হ্রাস পায়অপরদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে যে কয়েক হাজার মুসলিম যোদ্ধা ভারতে এসেছিল, তারা পর্যাপ্ত বা উপচে-পড়া সংখ্যায় যৌনসঙ্গী পাওয়ায় সর্বোচ্চ হারে বংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়আকবর তার হারেমে ৫,০০০ সুন্দরী রমণীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেনমরক্কোর সুলতান মাউলে ইসমাইল (১৬৭২-১৭২৭) তার ২,০০০-৪,০০০ হাজার স্ত্রী ও উপপত্নীর মাধ্যমে প্রায় ১,২০০ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন61 পরাজিত হিন্দুদেরকে ব্যাপকহারে ক্রীতদাসকরণ - বিশেষ করে নারীদেরকে, যারা মুসলিম সন্তান উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয় - তা মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে

সুতরাং মুসলিমরা ভারতের যেখানেই সার্থকভাবে আক্রমণ করেছে, সেখানেই হিন্দু পুরুষদেরকে গণহারে হত্যা ও তাদের নারী-শিশুদেরকে বন্দী করে হিন্দু জনসংখ্যা সরাসরি হ্রাস করেছেপরোক্ষভাবে, সন্তান উৎপাদনক্ষম নারীদেরকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে হিন্দু পুরুষদেরকে যৌনসঙ্গী থেকে বঞ্চিত করে হিন্‌দুদের বংশবৃদ্ধিতে অন্তরায় সৃষ্টিও হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস করেছেযেহেতু হিন্দু পরিবারগুলোর নারীরা পরবর্তীকালে মুসলিম সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত হয়, সেহেতু গণহারে ক্রীতদাসকরণের চূড়ান্ত ফলাফল দাঁড়ায়: হিন্দু জনসংখ্যার দ্রুত হ্রাস ও মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধিআর দ্রুত বর্ধিত এ মুসলিম জনসংখ্যার রক্ষণাবেক্ষণ হতো পরাজিত হিন্দু বা অমুসলিমদেরকে নিষ্পেষিত করা করের মাধ্যমেএটা মূলত সে একই আচরণ-বিধি, যা নবী মুহাম্মদ বানু কুরাইজা ও খাইবারের ইহুদীদের উপর প্রয়োগ করেছিলেন

সুতরাং মুহাম্মদ বিন কাসিমের তিন বছরব্যাপী ভারত আক্রমণ ও শাসনকালে শুধুমাত্র ক্রীতদাস হিসেবেই সরাসরি কয়েক লাখ হিন্দু ইসলামে যুক্ত হয় নি, বন্দী নারীরাও মুসলিম সন্তান উৎপাদনের যন্ত্ররূপে ব্যবহৃত হয়ে মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বিস্তার ঘটায়নবীর শুরু করা এ প্রক্রিয়া পরবর্তী মুসলিমরা সর্বত্র প্রয়োগ করেছেভারতে ইসলাম-বর্জনকারী সম্রাট আকবর ১৫৬৪ সালে এ চর্চা সাময়িকের জন্য নিষিদ্ধ করলেও তা মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েসুলতান মাহমুদ তার ভারতে অভিযানে ব্যাপকহারে হিন্দু নিধন করে অগণিত নারী ও শিশুকে দাসরূপে নিয়ে যানআল উত্‌বি লিখেছেন যে, সুলতান মাহমুদ তার ১০০১-১০০২ সালের ভারত অভিযানে ৫০০,০০০ বন্দীকে গজ্‌নিতে নিয়ে যান; পাঞ্জাবের নিন্দুনা আক্রমণে তিনি বিপুল সংখ্যক ক্রীতদাস আটক করেন; হরিয়ানার থানেশ্বরে মাহমুদ ২০০,০০০ লোককে ক্রীতদাস বানান এবং ১০১৯ সালে ৫৩,০০০ ক্রীতদাসকে নিয়ে ফিরে যান62

মুসলিম ইতিহাসবিদদের তথ্যের ভিত্তিতে অধ্যাপক কে. এস. লাল-এর হিসাব অনুযায়ী উত্তর ভারতে সুলতান মাহমুদের পুনঃপুনঃ আক্রমণের ফলে প্রায় ২০ লাখ হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস পায়63 এদের মধ্যে আক্রমণকালে অনেককে হত্যা করা হয়েছিল এবং অবশিষ্ট বিপুল সংখ্যককে তরবারীর মুখে ক্রীতদাসরূপে কব্জা করা হয়, যারা স্বভাবতই মুসলিম হয়ে যায়

অতঃপর সুলতান মোহাম্মদ ঘোরী (মুইজুদ্দিন, মৃত্যু ১২০৬) ও তার সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবক ভারতে মুসলিম শক্তি সুসংহত করার কাজে যোগ দিয়ে ১২০৬ সালে দিল্লীর সুলতানাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে প্রত্যক্ষ মুসলিম শাসন শুরু করেনমোহাম্মদ ফেরিশতার তথ্যমতে, মুইজুদ্দিন কর্তৃক দুই থেকে তিন লাখ খোখার (হিন্দু) ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল ফখর-ই-মুদাবী্বর মুইজুদ্দিন ও আইবকের নির্যাতন ও ক্রীতদাসকরণের চিত্রটি তুলে ধরেছে এভাবে: এমনকি গরিব (মুসলিম) বস্তিয়ালাও অসংখ্য ক্রীতদাসের মালিক বনে যায়64

ইসলামত্যাগী আকবরের শাসনকাল (১৫৫৬-১৬০৫) পর্যন্ত যুদ্ধে বন্দীদেরকে দাসকরণ মুসলিম-শাসিত ভারতবর্ষে একটা সাধারণ নীতি হিসেবে বহাল থাকেযুদ্ধক্ষেত্রে গণহারে ক্রীতদাস বানানোর প্রক্রিয়া আকবর নিষিদ্ধ করেনকিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তার আমলেই যুগ-যুগ ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্য প্রবলভাবেই বহাল থাকেতার মুক্তচিন্তক উপদেষ্টা আবুল ফজল হতাশার সাথে আকবর নামায় লিখেছেন: অনেক খারাপ মনের অবাধ্য অফিসার লুণ্ঠন করতে গ্রামে ও মহলে অগ্রসর হয়এসব লুণ্ঠনে সাধারণত নারী ও শিশুদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হতোমোরল্যান্ড উল্লেখ করেছেন যে, আকবরের রাজত্বকালেও স্পষ্ট কোনো যুক্তি ছাড়াই একটা বা অনেকগুলো গ্রাম একজোটে হানা দেওয়া ও (হিন্দু) বাসিন্দাদেরকে দাসরূপে নিয়ে যাওয়া একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিলো65 এ প্রেক্ষাপটে আকবরের এক সেনানায়ক আব্দুল্লাহ খান উজ্‌বেক যখন নিম্নোক্ত ঘোষণা দেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকে না:

আমি পাঁচ লাখ (৫০০,০০০) নারী ও পুরুষকে বন্দী করে বিক্রি করেছিতারা সবাই মোহাম্মদী হয়েছে বিচারের দিন তাদের বংশধররা এক কোটিতে পরিণত হবে66

আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের পরবর্তী শাসনকালে ইসলামীকরণ উত্তরোত্তর পুনরুজ্জীবিত হতে থাকেশাহ ফাত-ই-কাংগ্রা উদার ও দয়ালু শাসকরূপে পরিচিত জাহাঙ্গীর সম্বন্ধে লিখেছে: তিনি তার সমস্ত প্রচেষ্টা মোহাম্মদী ধর্ম প্রচারে উৎসর্গ করেন এবং তার সমস্ত প্রয়াস সর্বদা পৌত্তলিকতার অগ্নি নির্বাপিত করার জন্য পরিচালিত হয়67 ইনি-খাব-ই-জাহাঙ্গীর শাহী কিতাব অনুসারে গুজরাটের জৈনরা যখন একটা সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে, যা বিপুল সংখ্যক ভক্তের দৃষ্টি কাড়ে, সম্রাট জাহাঙ্গীর তাদেরকে দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করতে ও তাদের মন্দিরটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে নির্দেশ দেনতাদের মূর্তিগুলোকে মসজিদের সিঁড়ির সবচেয়ে উপরের ধাপে স্থাপনের হুকুম দেওয়া হয়, যাতে করে মুসলিম নামাজীরা মসজিদে প্রবেশের পথে সেগুলোকে পদদলিত করতে পারে68 ওদিকে সম্রাট শাহজাহান তার পিতা জাহাঙ্গীরের চেয়েও অনেক গোঁড়া ছিলেন

আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭) রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় দাসকরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণকে আবার পূর্ণোদ্যমে ফিরিয়ে আনেনএমনকি ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশদের বাংলা দখলের পরও গোটা ভারতে মুসলিম শাসকদের দাসকরণ অব্যাহত থাকেসিয়ার-উল-মুতাখিরিন গ্রন্থ অনুযায়ী, ১৭৬১ সালে পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালীর বিজয়ের পর খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে কাতর মৃতপ্রায় বন্দীদেরকে দীর্ঘ সারি বেধে কুচকাওয়াজে বাধ্য করে অবশেষে শিরশ্ছেদ করা হয়এরপর বন্দীকৃত তাদের ২২ হাজার নারী ও সন্তানদেরকে দাসরূপে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের মধ্যে অনেকেই ছিল দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল শ্রেণীর69 এর প্রায় দুই দশক আগে (১৭৩৮) ইরানের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেনঅবর্ণনীয় ভয়াবহ ধ্বংসলীলা, স্বেচ্ছাচারিতা ও লুটতরাজের পর হাজার হাজার লোককে দাস বানিয়ে বিপুল ধন্তসম্পদ নিয়ে তিনি দেশে ফিরেননাদির শাহ তার অভিযানে প্রায় ২০০,০০০ ভারতীয়কে হত্যা করেন

এখন এটা অনুধাবন করা কঠিন হবে না যে, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যার স্ফীতিতে হিন্দুদেরকে দাসকরণ সম্ভবত অন্য যে কোন উৎসের তুলনায় বেশী ভূমিকা রাখেজেনারেল আব্দুল্লাহ খান উজ্‌বেকের উপরোক্ত আত্মগর্বী উক্তিটি এ দাবীর সত্যতা প্রতিফলিত করেমুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নারী-ক্রীতদাসদের অবদান সম্পর্কে আর্নল্ড বলেন: বিপুল সংখ্যক বন্দীকৃত নারীদাসীরা উপপত্নীরূপে ব্যবহৃত হয়ে দ্রুততার সঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারতো70 এর সাথে সায় দিয়ে মোহাম্মদ আশরাফ মনে করেন: ক্রীতদাসরা ভারতের বর্ধিত মুসলিম জনসংখ্যার সাথে যুক্ত হয়েছে71 এ ক্ষেত্রে আশরাফ কিছুটা বেঠিক এ জন্য যে, ক্রীতদাসরা শুধু বৃদ্ধিশীল মুসলিম জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্তই হয়নি, বরং প্রাথমিক বছর ও দশকগুলোতে ক্রীতদাসরাই মুসলিম জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ ছিলএবং পরবর্তি সময়ে একদিকে ক্রীতদাসরা অব্যাহতভাবে যুক্ত হতে থাকে, অন্যদিকে প্রধানত নারীদাস কর্তৃক উৎপাদিত সন্তানেরা মুসলিম জনসংখ্যাকে স্ফীত করে

উপরোক্ত বিশ্লেষণ এটা প্রতীয়মান করে যে, আধুনিক ইসলামী পণ্ডিত শেখ আল-কারাদাউই, ডঃ জাকির নায়েক ও ডঃ ফজলুর রহমান প্রমুখের মতামতের বিপরীতে, ঠিক বিজয়ের মুহূর্তে স্পষ্টতঃই ধর্মান্তর ও মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুরু হয়সুলতান মাহমুদ ও ইয়াকুব লাইসের মত হানাদারদের দ্বারা বিজিতদেরকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মাধ্যমে এবং তরবারীর ফলার মুখে নারী-শিশুকে ব্যাপকহারে ক্রীতদাস বানিয়ে তাদেরকে মুসলিমকরণের মাধ্যমে তা শুরু হয়নবী মুহাম্মদের সময় থেকেই নারী, বিশেষত তরুণীরা, মুসলিমদের ক্রীতদাসকরণের প্রধান লক্ষ্যবস্ত ছিলসেসব ক্রীতদাসকৃত নারীরা মুসলিম সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়

ধর্মান্তরকরণে অমুসলিমদের উপর অবমাননা ও অর্থনৈতিক বোঝার প্রভাব

ইসলাম একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ও ইহুদীদেরকে জিম্মি প্রজা রূপে গণ্য করেযদিও আল্লাহ বহুঈশ্বরবাদী হিন্দু, বৌদ্ধ ও সর্বপ্রাণবাদী প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে হয় ধর্মান্তর কিংবা মৃত্যুবরণ বেছে নেওয়ার রায় দিয়েছে, কিন্তু ঈশ্বরহীন উমাইয়া শাসকরা ভারতের সিন্ধু বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণে অনিচ্ছুক বিপুল সংখ্যক বহুঈশ্বরবাদী লোককে হত্যা করার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়সাধারণত মুহাম্মদের ধর্ম বিস্তারের পরিবর্তে বিজিতদের উপর চড়া হারে কর আরোপের মাধ্যমে রাজকোষ পূর্ণ করতে অধিক আগ্রহী উমাইয়া শাসকরা ভারতের বিপুল সংখ্যক বহুঈশ্বরবাদীকে রাজস্ব যোগানদাতা হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে মৃত্যু থেকে রেহাই দেয়অতএব উমাইয়ারা কুরআনের নির্দেশ (কোরান ৯:৫) লঙ্ঘন করে এসব বহুঈশ্বরবাদীকে জিম্মি শ্রেণীর প্রজায় উন্নীত করেজিম্মিরা সাধারণতঃ সামাজিকভাবে চরম মর্যাদাহানি ও অবমাননা এবং অর্থনৈতিকভাবে শোষণের শিকার হয়, যা তাদেরকে প্রচণ্ড দুর্দশনার মধ্যে পতিত করে শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ওমরের চুক্তিতে (কোন কোন লেখকের মতে খলীফা দ্বিতীয় ওমর; রা. ৭১৭-৭১৯) ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী মুসলিম রাষ্ট্রে জিম্মি প্রজাদের প্রতি আচরণ নির্দিষ্ট করা হয়েছে

ওমরের চুক্তি: ইসলামের শাফী আইনশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফীর কিতাব-উল-উম্ম (‘গ্রন্থের মাতা) গ্রন্থে এ চুক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছেআরবদের সিরিয়া দখলের পর খলীফা ওমরের নির্দেশে সিরিয়ার খ্রীষ্টানদের প্রধান ও খলীফার মাঝে এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়এতে মুসলিম নিয়ম-কানুনের প্রতি জিম্মিদের পূর্ণাঙ্গ ও অবমাননাকর অধীনতা দাবী করে বলা হয়েছে যে, তাদের আনুগত্যের প্রমাণস্বরূপ তারা বৈষম্যমূলক কর প্রদান করবেএছাড়াও সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের জন্য মর্যাদাহানিকর ও অমানবিক অক্ষমতার শর্ত যুক্ত হয়েছে এ চুক্তিতেখলীফা ওমর সিরিয়ার খ্রীষ্টান প্রধানকে ইসলামের কাছে তাদের আনুগত্যের শর্ত নির্ধারণ করে একটা চুক্তিপত্র পাঠানচুক্তিটির প্রধান শর্তগুলো হলো:72

আমি ও সমস্ত মুসলিম তোমার ও তোমার খ্রীষ্টান সদস্যদের নিরাপত্তার অঙ্গীকার করছি যতদিন তোমরা তোমাদের উপর আরোপিত শর্তসমূহ মেনে চলবেশর্তগুলো হলো:

১)   তোমরা শুধু মুসলিম আইনের অধীনস্ত হবে, অন্য কারো নয়এবং আমরা তোমাদেরকে যা করতে বলব, তা অস্বীকার করতে পারবে না

২)   যদি তোমাদের মধ্যে কেউ নবী, তাঁর ধর্ম বা কুরআন সম্বন্ধে অশালীন কিছু বলে, সে আল্লাহর, বিশ্বাসীদের সেনাপতির ও সমস্ত মুসলিমের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেযে শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল, তা বাতিল হবে ও তোমাদের জীবন হবে আইনের সীমার বাইরে

৩)   যদি তোমাদের মধ্যে কেউ কোনও মুসলিম নারীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয় কিংবা কোনো মুসলিম নারীকে বিয়ে করে, বা পথে কোনো মুসলিমের উপর ডাকাতি করে, অথবা কোনো মুসলিমকে ইসলাম থেকে ধর্মচ্যুত করে, অথবা আমাদের শত্রুকে সাহায্য করে, অথবা কোনো গুপ্তচরকে আশ্রয় দেয়, তাহলে সে চুক্তি ভঙ্গ করবে এবং তার জীবন ও সম্পদ আইনের বাইরে

৪)   কোনো মুসলিমের সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি এর চেয়ে কম ক্ষতি যে করবে সে উপযুক্ত শাস্তি পাবে

৫)   মুসলিমদের সঙ্গে তোমাদের আচরণ আমরা পর্যবেক্ষণ করবোএবং তোমরা মুসলিমদের প্রতি বেআইনী কিছু করলে আমরা এ চুক্তি বাতিল ঘোষণা করবো ও তোমাদেরকে শাস্তি দিব

৬)   যদি তোমরা কিংবা অন্য অবিশ্বাসীরা বিচার চায়, আমরা মুসলিম আইন অনুযায়ী বিচার করবো

৭)   কোনো মুসলিম শহরে ক্রুশ প্রদর্শন করবে না, অথবা (যীশুর) মূর্তি নিয়ে মিছিল করতে পারবে না, তোমাদের প্রার্থনার জন্য কোনো গির্জা নির্মাণ বা সমবেত হওয়ার স্থান সৃষ্টি করতে পারবে না; (চার্চের) ঘণ্টা বাজাতে পারবে না; বা কোনো মুসলিমের কাছে মেরীর পুত্র যীশু সম্বন্ধে কোনো পৌত্তলিক ভাষা (অর্থাৎ যীশু ঈশ্বরের পুত্র) ব্যবহার করতে পারবে না

৮)   তোমরা পোশাকের উপরে জুন্নর (ফিতা, খ্রীস্টানের চিহ্ন স্বরূপ) পরিধান করবে, যা কখনোই লুকাতে পারবে না

৯)   ঘোড়ায় চড়তে তোমরা বিশেষ গদী ব্যবহার করবে ও ভিন্ন ভঙ্গি করবে এবং একটা চিহ্ন দ্বারা তোমাদের কালানুয়াস (টুপি) মুসলিমদের টুপি থেকে আলাদা করবে

১০)  মুসলিমরা উপস্থিত থাকলে তোমরা রাস্তার অগ্রভাগে যাবে না বা সমাবেশের প্রধান আসনে বসবে না

১১)  প্রত্যেক সুস্থ সাবালককে জিজিয়া বা বশ্যতা কর দিতে হবে, নতুন বছরে পূর্ণ মাপের এক দিনার করেকর না দেওয়া পর্যন্ত সে শহর ত্যাগ করতে পারবে না

১২)  কোন গরীব লোক নিজস্ব জিজিয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত দায়গ্রস্ত থাকবেদারিদ্র্য জিজিয়া প্রদানের দায়িত্ব বাতিল করবে না, যেমন করে না তোমাদেরকে প্রদত্ত সুরক্ষাকে বাতিলতোমাদের যা আছে তাই আমরা নিয়ে নিববণিক হিসেবে ছাড়া যতদিন তোমরা মুসলিম ভূখণ্ডে বসবাস ও ভ্রমণ করবে, ততদিন জিজিয়াই তোমাদের একমাত্র বোঝা

১৩)  কোনো অবস্থাতেই তোমরা মক্কায় প্রবেশ করবে নাপণ্যদ্রব্যসহ যদি ভ্রমণ কর, তাহলে তার এক-দশমাংশ মুসলিমদেরকে দিতে হবেমক্কা ব্যতীত তোমরা ইচ্ছামতো অন্য যে কোনো স্থানে যেতে পারোহেজাজ ব্যতীত অন্য যে কোনো মুসলিম দেশে তোমরা থাকতে পারোহেজাজে তিন দিনের বেশী অবস্থান করতে পারবে না

এগুলো হলো আদর্শ শর্তাবলী, যা একটা আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রে খ্রীষ্টান ও ইহুদী প্রজাদের (হানাফী-আইনের অধীনস্থ রাষ্ট্রে পৌত্তলিকদের উপরও) উপর অবশ্যই আরোপিত হবেজিম্মিদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কিত ওমরের চুক্তিটি সুস্পষ্টভাবেই আল্লাহর কুরআন (আয়াত ৯:২৯) ও নবীর দৃষ্টান্তের সঙ্গে সমন্বিতঅতএব অষ্টম শতাব্দীর বিখ্যাত হানাফী আইনশাস্ত্রবিদ আবু ইউসুফ লিখেছেন: ওমরের চুক্তি পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত বৈধ ও চালু থাকবে73 ইহুদী ও খ্রীষ্টান (ভারতে হিন্দুরাও), যারা ছিল তাদের স্ব-স্ব জন্মভূমিতে ন্যায্যভাবে মুক্ত ও সম্মানিত মানুষ, তাদেরকে হানাদার মুসলিম শাসকদের কাছে এরূপ অবমাননাকর আনুগত্য স্বীকার করতে হয়জিম্মিদের প্রতি এরূপ আচরণ তাদের মাঝে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য কী প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে সেটি কল্পনা করা আদৌ কঠিন নয়


জিজিয়া ও অবমাননা: মুসলিম রাষ্ট্রে জিম্মি প্রজাদেরকে কিরূপ অবমাননাকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে, তাদের উপর আরোপিত জিজিয়া কর আদায়ের আনুষ্ঠানিকতা তার স্পষ্ট ধারণা দেবেজিজিয়া কর প্রদান চট করে একটা চেক লিখে দেওয়া কিংবা কালেক্টরের অফিসে টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার মত নয়আল্লাহর দাবী অনুযায়ী, জিম্মিদেরকে জিজিয়া প্রদান করতে হবে এমনভাবে যে, তা তাদের মাঝে বশ্যতা স্বীকার ও স্বেচ্ছায় অবমানিত হওয়ার অনুভব সৃষ্টি করে (কুরআন ৯:২৯)বিখ্যাত ইসলামী বিশ্লেষক আল-জামাকশারী (মৃত্যু ১১৪৪) জিজিয়া প্রদানের উপর কুরআনের ৯:২৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে:74

তাদের নিকট থেকে জিজিয়া নেয়া হবে অবমাননা ও মর্যাদাহানিকরভাবে। (জিম্মিকে) সশরীরে হেঁটে আসতে হবে, ঘোড়ায় চড়ে নয়যখন সে জিজিয়া প্রদান করবে, তখন কর-আদায়কারী বসে থাকবে আর সে থাকবে দাঁড়িয়েআদায়কারী তার ঘাড় ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলবে: জিজিয়া পরিশোধ কর! এবং জিজিয়া পরিশোধের পর আদায়কারী ঘাড়ের পিছনে একটা চাটি মেরে তাকে তাড়িয়ে দেবে

ষষ্ঠদশ শতকে মিশরের বিখ্যাত সূফী পণ্ডিত আস-সারানী তার কিতাব আল-মিজান গ্রন্থে জিজিয়া প্রদান সম্বন্ধে নিম্নরূপ বর্ণনা দেন:75

খ্রীষ্টান বা ইহুদী জিম্মি নির্দিষ্ট দিনে বশ্যতা কর (জিজিয়া) গ্রহণের জন্য নিয়োজিত আমিরের কাছে সশরীরে হাজির হবেতিনি বসে থাকবেন একটি উঁচু আসনেজিম্মি তার সম্মুখে হাজির হয়ে হস্ত প্রসারিত করে কর প্রদানের প্রস্তাব করবেআমীর এমনভাবে সেটি গ্রহণ করবে যাতে তার হাত উপরে থাকে, জিম্মির হাত নিচেঅতঃপর আমীর তার ঘাড়ে একটা চাটি মারবে এবং আমীরের সামনে উপসি'ত লোকেরা (মুসলিম) তাকে রূঢ়ভাবে হটিয়ে দিবে। ...এ দৃশ্য দেখার জন্য সাধারণ জনগণের উপস্থিতির অনুমতি ছিল

এখন আমরা দেখব ভারতে কিভাবে জিজিয়া কর আদায় করা হতোসম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে ভারতে জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন (স্বধর্মত্যাগী আকবর কর্তৃক ইতিপূর্বে বাতিলকৃত) করে জিজিয়া প্রদানের নিম্নোক্ত পদ্ধতি ঘোষণা করেন:

মৃতব্যক্তি ও ইসলাম গ্রহণকারীর উপর জিজিয়া প্রযোজ্য হবে নাঅমুসলিম ব্যক্তি নিজে জিজিয়া নিয়ে আসবেসে তার কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে পাঠালে তা গৃহীত হবে নাজিজিয়া প্রদানের সময় অমুসলিম অবশ্যই দাঁড়িয়ে থাকবে এবং আদায়কারী উপবিষ্ট থাকবেনঅমুসলিমের হাত নীচে থাকবে এবং আদায়কারীর হাত থাকবে উপরেএবং তিনি বলবেন, হে অমুসলিম, জিজিয়া প্রদান কর76

খারাজ বা ভূমিকর আদায়ের ব্যাপারে সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী বিজ্ঞ ইসলামী পণ্ডিত কাজী মুঘিসুদ্দিনের কাছে উপদেশ চাইলে, কাজী একই পদ্ধতির বর্ণনা দিয়ে তার সঙ্গে যোগ করেন যে:

আদায়কারী যদি তার (খারাজ দাতার) মুখে থু-থু দিতে চান, তাহলে সে মুখ হা করবেতার উপর এ চরম অপমান ও আদায়কারী কর্তৃক তার মুখের ভিতরে থু-থু দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো এ শ্রেণীর উপর আরোপিত চরম বশ্যতা, ইসলামের গৌরব ও বিশ্বাসের প্রতি মহিমান্যতা এবং মিথ্যা ধর্মের (হিন্দুত্ববাদ) প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন77

একইভাবে কাশ্মীরের সহনশীল সুলতান জয়নুল আবেদীনের (১৪১৭-৬৭) কাছে লেখা এক চিঠিতে পারস্যের ইসলামী পণ্ডিত মোল্লা আহমদ লেখেন:

তাদের উপর জিজিয়া আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে অবমানিত করাঈশ্বর তাদেরকে অসম্মানিত করার জন্যই জিজিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেনএর উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে অপমানিত এবং মুসলিমদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা78

জনপ্রিয় সূফী সাধক শেখ আহমদ সিরহিন্দী (১৫৬৪-১৬২৪) অমুসলিমদের প্রতি সম্রাট আকবরের উদার ও সহনশীল নীতিতে অসস্তুষ্ট হয়ে তাকে ইসলামী আইনের লংঘন আখ্যায়িত করে তার দরবারে চিঠি পাঠানচিঠিটিতে সিরহিন্দী লিখেন:

ইসলামের সম্মান কুফরী (অবিশ্বাস) ও কাফির (অবিশ্বাসী) কে অপমান করার মধ্যে নিহিতযে কাফিরকে সম্মান দেয় সে মুসলিমকে অমর্যাদা করেতাদের উপর জিজিয়া আরোপের উদ্দেশ্য হলো, এমন করে তাদেরকে অবমানিত করা যাতে তারা ভাল পোশাক পরতে বা জাঁকজমকের সঙ্গে বাস না করতে পারেতারা ভীতসন্ত্রস্ত ও কম্পমান থাকে

অমুসলিমদের উপর জিজিয়া আরোপ সম্পর্কে একই রকম মনোভাব ছিল সূফী সাধক শাহ ওয়ালিউল্লাহ (মৃত্যু ১৭৬২) ও ভারতে মুসলিম শাসনকালের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ইসলামী পণ্ডিত ও সূফী সাধকদের79

জিম্মিদের প্রতি এরূপ চরম অবমাননাকর আচরণের অর্থ হলো, মুসলিম রাষ্ট্রে তাদের অত্যন্ত হীন আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াহিন্দুদের প্রতি এ চরম অবমাননা ও অমর্যাদাকর আচরণ তাদের উপর ইসলাম গ্রহণের জন্য কী ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল, সেটি অনুধাবন করতে আদৌ কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়এ সকল অবমাননার সঙ্গে যুক্ত ছিল অতিরিক্ত ও অসহনীয় বৈষম্যমূলক জিজিয়া, খারাজ ও অন্যান্য করের অর্থনৈতিক ভার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রলোভনঅর্থনৈতিক বোঝার মাত্রায় জিজিয়া ছিল অবমাননার পাশে তুলনামূলক কম গুরুভারসবচেয়ে গুরুভার ছিল খারাজ বা ভূমিকরসুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর শাসনামলে (১২৯৬-১৩১৬) কৃষকরা আক্ষরিক অর্থে সরকারের ক্রীতদাসে পরিণত হয়ে যায়, কারণ এ সময় খারাজ হিসেবে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ সরকার নিয়ে যেতোএমনকি আকবরের শাসনামলে খারাজ উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর এক-তৃতীয়াংশ নির্ধারিত থাকলেও কাশ্মীরে খারাজ হিসেবে নেয়া হতো দুই-তৃতীয়াংশ১৬২৯ সালের দিকে সম্রাট শাহজাহানের আমলে গুজরাটে কৃষকদেরকে তাদের উৎপাদিত ফসলের তিন্তচতুর্থাংশ সরকারকে দিতে হতো80

আগেই বলা হয়েছে যে, এরূপ অর্থনৈতিক শোষণের পরিণতিতে হিন্দুরা এমন এক অসহনীয় ও ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পতিত হয় যে, কর আদায়কারীর অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পেতে তারা পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়শুধুমাত্র ইসলামের কালেমা আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ঈশ্বর নেই, এবং মুহাম্মদ আল্লাহর বার্তাবাহক - এ কথাটি উচ্চারণ করেই হিন্দুরা ওসব গুরুভার অর্থনৈতিক বোঝা, কষ্ট ও অবমাননা থেকে মুক্ত হতে পারতোএবং এরূপ জবরদস্তিমূলক প্রক্রিয়ায় ইসলামে ধর্মান্তরকরণ বেশ সুচারুভাবেই প্রয়োগ হয়েছে ভারতে, যার কিছুটা প্রমাণ মেলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের (১৩৫১-৮৮) স্মৃতিকথা ফতুয়া-ই-ফিরোজ শাহীতে:

আমি আমার অবিশ্বাসী প্রজাদেরকে নবীর ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করিআমি ঘোষণা করি যে, যারা ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হবে তারা প্রত্যেকেই জিজিয়া কর থেকে মুক্তি পাবেসর্বত্র জনগণের মাঝে এ সংবাদ পৌঁছে যায় ও বিপুল সংখ্যক হিন্দু নিজেদেরকে উপস্থাপন করে ইসলামের সম্মানকে স্বীকার করে নেয়এরূপে তারা দিনের পর দিন সর্বত্র থেকে এগিয়ে আসে ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জিজিয়া থেকে মুক্ত হয়, এবং উপহার ও সম্মানের দ্বারা আনুকূল্য পায়81

সুতরাং ইসলামে ধর্মান্তরকরণ ও মুসলিম আক্রমণে বিজিত দেশগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে এখন নিশ্চিত করে বলা যায় যে, ধর্মান্তরের প্রথম বড় জোয়ারটি এসেছিল তলোয়ারের মুখে দাস বানানোর মাধ্যমেতারপরে তাদের সন্তানরা মুসলিম জনসংখ্যাকে উত্তরোত্তর স্ফীত করতে থাকেসুলতান মাহমুদের মতো মুসলিম হানাদাররা এক একটি শহর দখলে নিয়ে তার নাগরিকদেরকে মৃত্যুর মুখে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেন, যা মুসলিম জনসংখ্যা বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখেকোন কোন ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ও অজেয় মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের মুখে আক্রান্ত বাসিন্দারা অনিবার্য মৃত্যু ও ধ্বংসের কথা বিবেচনা করে প্রতিরোধ না করেই নতি স্বীকার করে নেয় এবং জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনিচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নিজেদেরকে যুক্ত করেছেঅবিশ্বাসী প্রজাদেরকে জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণের সম্ভবত আরেকটি বড় অবদান আসে অবমাননাকর জিজিয়া, গুরুভার খারাজ ও অন্যান্য বৈষম্যমূলক কর থেকে মুক্ত হওয়ার প্রত্যাশায় ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে

নির্মম আওরঙ্গজেবের অধীনে ধর্মান্তর

মুসলিম শাসকরা অবিশ্বাসী বা বিধর্মীদেরকে ইসলামে ধর্মান্তর করতে আরও অনেকরকম অবৈধ প্ররোচনা ও জবরদস্তির আশ্রয় নেয়ইব্‌নে আশ্‌কারী তার আল-তারিখ গ্রন্থে লিখেছেন যে, সম্রাট আওরঙ্গজেব ধর্মান্তরের জন্য অন্যান্য প্রলোভনের মধ্যে তার সাম্রাজ্যে প্রশাসনিক পদ প্রদান, জেল থেকে অপরাধীদের মুক্তি, তাদের পক্ষে মামলার রায় নিষ্পত্তিকরণ ও রাজকীয় সম্মানে ভূষিতকরণের মতো সুবিধাদি প্রদানের প্রস্তাব করেছিলেন82 এর ফলে অবশ্যই বহু কুখ্যাত অপরাধী ইসলামে যোগ দিয়েছিল, যে প্রবণতা আজকের যুগেও সক্রিয় রয়েছে: যেমন পশ্চিমা দেশগুলোতে ভয়ঙ্কর অপরাধীরা জেলখানায় ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছে

বর্তমানে উত্তর ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার রূপরেখা বর্বর আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বল প্রয়োগ ও অন্যান্য জবরদস্তিমূলক চাপের মাধ্যমে ব্যাপকহারে ধর্মান্তরিতকরণের মাধ্যমে সৃষ্ট দ্য গেজেট অব নর্থ-ওয়েস্ট প্রভিন্সেস-এ (নর্থ-ওয়েস্ট প্রভিন্সেস বা উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ বর্তমানের উত্তর প্রদেশ ও দিল্লীর       অন্তর্ভুক্ত) উল্লেখ রয়েছে যে: অধিকাংশ মুসলিম চাষি আওরঙ্গজেবের শাসনকালকে তাদের (পূর্বপুরুষদের) ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার সময় হিসাবে উল্লেখ করে এবং এ ধর্মান্তর ছিল কখনো নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ লাভের উদ্দেশ্যে, আবার কখনো রাজস্ব প্রদানে অসমর্থ হয়ে সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে (এ ব্যবস্থা আওরঙ্গজেবের আমলে নিশ্চয়ই সব প্রদেশেই বিস্তৃত হয়ে থাকবে)ইউরোপীয় দূত নিকোলাও মানুক্সি, যিনি আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ভারতবর্ষে কাটান, তিনি উল্লেথ করেন: কর প্রদানে অক্ষম অনেক হিন্দু কর-আদায়কারীর অপমানের হাত থেকে রেহাই পেতে মোহাম্মদী হয়ে যেতো, এবং আওরঙ্গজেব এতে উৎফুল্ল বোধ করতেনসুরাটে ইংরেজ কারখানার প্রেসিডেন্ট টমাস রোল লিখেছেন: আওরঙ্গজেব কর্তৃক জোরপূর্বক জিজিয়া আদায় করা হতো দুটো উদ্দেশ্যে: রাজকোষ বর্ধিত করতে ও গরীব শ্রেণীকে মুসলিম বানানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে83

১৬৬৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর আওরঙ্গজেব রাজসভা ও প্রদেশের চাকরী থেকে হিন্দুদের বরখাস্ত এবং তদস্তলে মুসলিমদের নিয়োজিত করার জন্য এক আদেশ জারি করেন84 জীবনধারণের তাগিদে এটা হিন্দুদের উপর ইসলাম গ্রহণের জন্য আরেকটি প্রবল চাপ প্রয়োগ করেতিনি হিন্দু জমিদারদেরকে মুসলিম হওয়ার জন্য চাপ দেন, অন্যথায় জমিদারী ছাড়তে হবে, এমনকি মৃত্যুবরণও করতে হতে পারেমনোহরপুরের জমিদার দেবী চাঁদের জমিদারী কেড়ে নিয়ে তাকে জেলে পাঠানো হয়আওরঙ্গজেব দেবী চাঁদের কাছে কোতওয়াল (ঘাতক) পাঠায় একথা বলে যে, দেবী চাঁদ মুসলমান হলে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, না হলে হত্যা করবেদেবী চাঁদ ইসলাম গ্রহণে রাজী হয় তার জমিদারী পুনর্বহালের শর্তে85 পিতার জমিদারী থেকে উচ্ছেদকৃত রতন সিং মুসলিম হলে মালওয়ার রামপুরা অঞ্চলের জমিদারী ফেরত পান86

অন্যান্য উদাহরণে মুসলিমরা হিন্দুদের উপর ইসলামকে অপমান করার মিথ্যা অভিযোগ এনে শাস্তিস্বরূপ ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে দেখা যায়সুরাট পরিষদ ১৬৬৮ সালে ধর্মান্তরের এরূপ কৌশলের উল্লেখ করেছেযখন কোনো মুসলমান হিন্দু লগ্নীদাতা (বানিয়া)র ঋণ পরিশোধ করতে চাইতো না, তখন সে মুসলমানটি কাজীর (বিচারকের) কাছে গিয়ে নালিশ করতো যে, ঐ লগ্নীদাতা হিন্দু নবীকে গালি-গালাজ বা ইসলামের অবমাননা করেছেএক্ষেত্রে সে এক বা দুই জন মিথ্যা সাক্ষী উপস্থাপন করতোআর তারপরই হতভাগ্য হিন্দু বানিয়াকে লিঙ্গচ্ছেদন বা সুন্নত দিয়ে মুসলিম বানানো হতো87

আওরঙ্গজেব ১৬৮৫ সালে তার প্রাদেশিক কর্মচারীদের প্রতি হিন্দুদেরকে মুসলমান হতে উৎসাহিত করার জন্য এক আদেশ জারী করেনএতে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, যেসব হিন্দু পুরুষ মুসলমান হবে তারা প্রত্যেকে রাজভাণ্ডার থেকে চার রুপী পাবে, আর প্রত্যেক হিন্দু নারী মুসলমান হলে পাবে দুই রুপী88 চার রুপী সেসময়ে একজন পুরুষের এক মাসের আয়ের সমান ছিলযেহেতু ধর্মান্তর হিন্দু বা অমুসলিমদের কাঁধ থেকে পাহাড়-প্রমাণ জিজিয়া, খারাজ ও অন্যান্য গুরুভার করের বোঝা মুক্ত করা ছাড়াও অবর্ণনীয় নির্যাতন, অবমাননা ও অমর্যাদা থেকে তাদেরকে মুক্তি দিত, সুতরাং এ সামান্য প্রলোভন ধর্মান্তরে এর আর্থিক লাভের তুলনায় আরও বড় প্ররোচনার কাজ করেএক মুঘল দলিলে আওরঙ্গজেবের আমলে বিথুর-এর ফৌজদার শেখ আব্দুল মোমিনের ১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করার কথা উল্লিখিত হয়েছেহিন্দুদেরকে সারোপাস (সম্মানের পোশাক) ও নগদ অর্থ প্রদানের প্রস্তাব করে ধর্মান্তরিত করেন তিনি89

কাশ্মীরের হিন্দু পণ্ডিতদেরকে আওরঙ্গজেব বল প্রয়োগে গণহারে ধর্মান্তরিত করেনউৎপীড়নে অতিষ্ঠ হিন্দু পণ্ডিতরা সাহায্যের জন্য পাঞ্জাবের শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সিং-এর কাছে আসেনগুরু যখন কাশ্মীরীদেরকে অবৈধভাবে ধর্মান্তর করার বিষয় জানতে সম্রাটের দরবারে আসেন, তখন তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়, এবং তাকেও ইসলাম গ্রহণের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে নির্যাতন করা হয়অবশেষে তাকে (দুই শিষ্যসহ) শিরশ্চেদের শিকার হতে হয়এতে দেখা যায় যে, আওরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত কাশ্মীরী জনগণের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশ বিধর্মী ছিলআওরঙ্গজেবের কোপানলে পড়ে ভারতের হিমালয়ের রাণী কাশ্মীর রাজ্যটি ব্যাপকভাবে মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যে পরিণত হয়, যা অত্যন্ত গোঁড়া ধর্মান্ধও বটেআওরঙ্গজেবের আমলে ভারতের অন্যত্র যেখানে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ছিল, সেখানেও একই নীতি কার্যকর হওয়ার কথা



47.   Bernier F (1934) Travels in the Mogul Empire (1656-1668), Revised Smith VA, Oxford, p. 40,210

48.   Lal (1999), p. 118-119

49.   Lal (1994), p. 64

50.   Elliot & Dawson, Vol I., p. 173-74

51.   Ibid, Vol. I, p. 122

52.   Sharma, p. 109

53.   Bulliet RW (1979) Conversion to Islam and the Emergence of a Muslim Society in Iran, In N. Levtzion ed., Conversion to Islam, Holmes and Meier Publishers Inc., New York, p. 33

54.   Pipes (1983), p. 52

55.   Tagher, p. 19

56.   Elliot & Dawson, Vol. II, p. 419

57.   Ibid, p. 26

58.   Ibid, p. 42-43

59.   Ibid, p. 33

60.   Lal (1994), p. 18-19

61.   Milton G (2004) White Gold, Hodder & Stoughton, London, p. 120

62.   Lal (1994), p. 20

63.   Lal KS (1973) Growth of Muslim Population in Medieval India, Aditya Prakashan, New Delhi, p. 211-17

64.   Lal (1994), p. 43-44

65.   Moreland WH (1995) India at the Death of Akbar, Low Price Publication, New Delhi, p. 92

66.   Lal (1994), p. 73

67.   Elliot & Dawson, Vol. VI, p. 528-29

68.   Ibid, p. 451

69.   Lal 91994), p. 155

70.   Arnold TW (1896) The Preaching of Islam, Westminster, p. 365

71.   Ashraf KM (1935) Life and Conditions of the People of Hindustan, Calcutta, p. 151

72.   Triton, p. 12-24

73.   Ibid, p. 37

74.   Ibn warraq, p. 228-29

75.   Triton, p. 227

76.   Lal (1999), p. 116

77.   Ibid, p. 130

78.   Ibid, p. 113

79.   Ibid, p. 113-14

80.   Ibid, p. 132, 34

81.   Elliot & Dawson, Vol. III, p. 386

82.   Roy Choudhury ML (1951) The State and Religion in Mughal India, Indian Publictity Society, Calcutta, p. 227

83.   Sharma, p. 219

Exhibit No. 34, Bikaner Museum Archives, Rajasthan, India; Available at: http://according-to-mughal-records.blogspot.com/

85.   Exhibit No. 41, Bikaner Museum Archives.

86.   Sharma, p. 220

87.   Ibid, p. 219-20

88.   Bikaner Museum Archives, Exhibit No. 43

89.   Ibid, Exhibit No. 40

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive