লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ November 16, 2013, 12:00 AM, Hits: 3115
(২০০৮-এর ফেব্রুয়ারীতে লিখা প্রবন্ধ ‘কোন গন্তব্যে সেনাবাহিনী’-এর কিছু বক্তব্যকে এই মুহূর্তে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কারণ এটি লিখা হয়েছিল সেই সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবরণে সেনা শাসনের পটভূমিতে। কিন্তু সেনাবাহিনীর সেই সময়কার ভূমিকা ও সমস্যা সংক্রান্ত আলোচনা দিয়ে এই প্রবন্ধের সূত্রপাত ঘটালেও এটির মূল বিষয়বস্তু বাংলাদেশের বাঙ্গালীর জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের গঠন সমস্যা ও বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত আলোচনা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটের স্বরূপ উপলব্ধির জন্য প্রবন্ধটির গুরুত্ব আজও সমানভাবে রয়েছে অনুভব করে এটির প্রথম ও শেষাংশের কিছু সংখ্যক বাক্য বাদ দিয়ে প্রায় সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি ‘বাংলাদেশের জাতি, সমাজ, ও রাষ্ট্র গঠনের সমস্যা’ এই শিরোনামে প্রকাশ করা হল। সম্পূর্ণ ও মূল প্রবন্ধটি পাঠে আগ্রহী পাঠকগণ ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৮ তারিখে বঙ্গরাষ্ট্রে প্রকাশিত ‘কোন গন্তব্যে সেনাবাহিনী’ পড়তে পারেন। -- লেখক, ২৭ আগস্ট ২০১১)
এ দেশের সাধারণ মানুষ কোন দিনই সামরিক শাসন তেমন একটা পছন্দ করে না। প্রথম দিকে সমাজের নীচ তলায় কিংবা আম জনতার মধ্যে সামরিক শাসন সমর্থন পেলেও সেটা নষ্ট হতে বেশী সময় লাগে না। ছাত্র-মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক অংশ তথা নাগরিক সমাজের ব্যাপক অংশের মধ্যে প্রথম থেকেই সামরিক শাসনের প্রতি যে বিরোধিতা থাকে তা কিছু দিনের মধ্যে শহরের সর্বসাধারণ এবং গ্রামেরও সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে শুরু করে। ফলে রাজনৈতিক দলের শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ক্রমবর্ধমান হারে জনগণের অংশ গ্রহণ ঘটে।
ব্যাপারটাকে আমাদের দেশের জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা কিংবা গণতন্ত্র প্রীতি হিসাবে সাধারণত ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু ব্যাপারটা মূলত সমাজতাত্ত্বিক। এ দেশের মানুষ রাজনৈতিক দলের শাসন চায় মূলত সামাজিক প্রয়োজন থেকে। রাজনৈতিক সচেতনতার ব্যাপার আছে বৈকি। তবে সেটা রাজনৈতিকভাবে সচেতন স্বল্প সংখ্যক ছাত্র-মধ্যবিত্তের মধ্যে আর দলগত স্বার্থের কারণে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে। কাজেই প্রশ্ন আসে সেই সামাজিক কারণটা কী?
কারণটা হচ্ছে আমাদের দেশে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের জীবন্ত যোগাযোগের প্রায় একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে রাজনৈতিক দল। রাষ্ট্র শাসনের ব্যবস্থা শুধু যে আমলাতান্ত্রিক তা-ই নয়, উপরন্তু জনগণের নিকট বহিরাগত বা বিদেশী চরিত্রের। এক এলাকার মানুষকে আমলা-পুলিশ হিসাবে পাঠানো হয় আর এক এলাকার মানুষকে শাসন করতে। ফলে গ্রাম ও শহরের সর্বসাধারণের কাছে পুলিশসহ প্রশাসনের আমলা বা সদস্যরা বহিরাগত এবং অচেনা। সুতরাং এই শাসনের চরিত্র মর্মগতভাবে বিদেশী, বিজাতীয়।
ব্রিটিশ যে ধরনের প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে গেছে সময়ের পরিবর্তনের ফলে তাতে সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থা হিসাবে প্রায় হবহু সেই আমলাতন্ত্রই রয়ে গেছে। তার দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে। দুর্নীতির প্রসারের ফলে তার নিপীড়ক চরিত্র বহু বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তার বহিরাগত চরিত্র সম্পূর্ণরূপে পূর্বের মতই রয়েছে।
এই অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রটাই সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে দাঁড়ায় বহিরাগত বা বিদেশী। এই অচেনা ও বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে যেমন রাজনৈতিক দল দেখা দেয় তেমন এই রাষ্ট্রের দমন, পীড়ন ও বহিরাগত চরিত্রের শাসনকে যতটা সম্ভব সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার হাতিয়ার হিসাবেও দেখা দেয় কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে অসংখ্য বন্ধনে আবদ্ধ নেতা-কর্মীদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল। অপর দিকে, জনগণের সঙ্গে জীবন্ত যোগাযোগের জন্যও রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র বা শাসন যন্ত্রের নিকট অপরিহার্য হয়ে উঠে। দল না থাকলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আর কোন কার্যকর সেতু বন্ধন থাকে না। ফলে অবস্থাটা যে শুধু জনগণের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠে তা-ই নয়, অধিকন্তু জন-বিচ্ছিন্নতার ফলে রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠে। অর্থাৎ এ দেশে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে প্রায় একমাত্র মধ্যস্থতাকারী সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
পাকিস্তানের মত রাষ্ট্রে এই ধরনের কার্যকর অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আছে বলে রাজনৈতিক দল যেমন সমাজের ভিতর দৃঢ়মূল হতে পারে না তেমন দল রাষ্ট্রের নিকটও ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে না। সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে আছে উপজাতি-গোত্র এবং জমিদার বা বৃহৎ ভূস্বামী।
উপজাতি বা ট্রাইবের ব্যাপারটা অনেকে জানেন। পাকিস্তানে উপজাতীয় বা গোত্র প্রধানরা নিজ উপজাতি বা গোত্রের উপর বিপুল কর্তৃত্ব রাখে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আইয়ুব সরকারের সময় ভূমি সংস্কারের ফলে অতি বৃহৎ জমিদারী ভেঙ্গে গেলেও এখনও হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক যেমন অনেক রয়েছে তেমন তাদের অধীনে লক্ষ লক্ষ কৃষক রয়ে গেছে। এমন একটা জমিদার পরিবার সিন্ধু প্রদেশের ভুট্টো পরিবার। জমিদারদের শুধু শোষণ, নির্যাতনকে দেখলে হবে না কৃষকদের জন্য তাদের কিছু ইতিবাচক ভূমিকাকেও হিসাবে নিতে হবে। কারণ নিজেদের স্বার্থেই তারা কৃষকদের ভাল-মন্দের কিছু হলেও দেখতে বাধ্য হয়।
অবশ্য ইসলাম ধর্মের ভূমিকা জমিদার এবং উপজাতীয় প্রধানদের প্রতি প্রজা এবং উপজাতীয় সদস্যদের আনুগত্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের উপর জমিদার এবং উপজাতি সদস্যদের উপর সর্দারদের প্রভাব ও কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ বলা চলে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের সঙ্গে জমিদার বা বৃহৎ ভূস্বামী এবং উপজাতীয় প্রধানদের ভাল সম্পর্ক থাকলে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা বা পক্ষে রাখা রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয় না।
অর্থাৎ পাকিস্তানের মত দেশে জনগণের এক বৃহৎ অংশ যেখানে উপজাতি বা এই ধরনের বংশ ও রক্ত বন্ধনগত সংগঠনে দৃঢ়বদ্ধ এবং যেখানে বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ অংশ বৃহৎ ভূস্বামীদের প্রতি অনুগত সেখানে রাষ্ট্র ও জনসমাজের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে এদের অবস্থান থাকায় রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন এবং সুযোগও উভয়ের জন্যই গৌণ হয়ে যায়।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এ কথা আদৌ প্রযোজ্য নয়। মূল কারণ সমাজ বিন্যাসের ভিন্নতা। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলার ভূমির প্রায় সবটা অতীতে শত শত বা হাজার হাজার বৎসর ধরে অস্থিতিশীল এবং ভাঙ্গন প্রবণ ছিল। পশ্চিম বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল অনেক আগে থেকে কিছু বেশী স্থিতিশীল হলেও পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশ ভুক্ত অঞ্চলের প্রায় সবটা কিছু কাল আগেও অস্থিতিশীল ছিল। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নামের বৃহৎ নদীগুলি শুধু নয়, উপরন্তু মাঝারী ও ছোট বহু সংখ্যক নদীর প্রমত্ততার আঘাতে এ বাংলার ব্যাপক অঞ্চল ছিল অস্থিতিশীল। চর গঠন ও ভাঙ্গন প্রক্রিয়ায় এ বাংলার বৃহৎ অংশ ভূমি গঠনের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ভিতর সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। কিন্তু যে ভূমি গঠন হয়েছে সেটাও সুদীর্ঘ কাল হয়ে থেকেছে নদীর অবিরাম গতিপথ পরিবর্তনের ফলে অস্থির। নদীগুলিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণের ফলে অতীতের মত নদী ভাঙ্গন এখন না ঘটলেও আজও প্রতি বৎসর নদী ভাঙ্গন লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত বা স্থানচ্যুত করছে।
অতীত বাংলার জন-জীবনের এক চিত্র ফুটে উঠে এক সময়কার খুব জনপ্রিয় এক গানের কথায়, ‘এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা/ সকাল বেলায় আমীর রে ভাই ফকীর সন্ধ্যা বেলা।’ এখন আর এই গানের কথা বাংলার বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য না হলেও ইংরেজ শাসনের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কম-বেশী প্রযোজ্য ছিল। ইংরেজ শাসকরা তাদের উন্নততর সভ্যতা ও প্রযুক্তির সাহায্যে এখানে নদীর গতিপথের উপর যথেষ্ট পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বাঁধ, রেল লাইন, রাজপথ, সেতু ইত্যাদি নির্মাণের ফলে নদীগুলির অবাধ গতিধারা আর থাকতে পারে নাই। ইংরেজদের দ্বারা সূচীত নদী নিয়ন্ত্রণ এখন আরও অনেক দূর এগিয়েছে।
কিন্তু এই পরিবর্তন খুব সাম্প্রতিক। সেদিন পর্যন্ত বাংলার ভূমি নির্ভর তথা কৃষি ও কুটীর শিল্প নির্ভর জন-বসতি ও জন-সমাজ ছিল অস্থিতিশীল এবং সমাজ সংস্থা ছিল শিথিল। নদী ভাঙ্গন জন-বসতি ও সমাজকে ছত্রভঙ্গ করত এবং আজও করে। ভাঙ্গন কবলিত গ্রাম বা বসতির লোকজন যার যার পরিবার নিয়ে যে যে দিকে পারত চলে যেত এবং আজও যায়। এই অবস্থায় দৃঢ়বদ্ধ সমাজ গঠনের অবকাশ অতীতে খুব সামান্যই ছিল। সমাজ বিন্যাসের শিথিলতা বা বিশৃঙ্খলাকে আরও শক্তি যোগাত বন্যা ও জলাভূমির প্রাচুর্য। নদী-খাল-বিল এবং বন্যার প্রভাব এক এলাকার সঙ্গে অপর এলাকার যোগাযোগেও বিরাট বাধা সৃষ্টি করে রাখত। এর ফলে বৃহৎ এলাকাব্যাপী সমাজ গঠনও দুঃসাধ্য হয়ে থাকত।
এই অবস্থায় উপজাতীয় সমাজের দৃঢ়বদ্ধতা বাংলার ভূমি নির্ভর জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কোন কালেই ছিল না। এই কারণে দৃঢ়বদ্ধ সমাজ শৃঙ্খলার অধিকারী বেদে সম্প্রদায় শুধু যে ভাসমান এবং যাযাবর ছিল তা-ই নয়, উপরন্তু তারা কৃষি নির্ভর সমাজেরও বাইরে বাস করত। এখনও তারা স্থিতিশীল সভ্য সমাজের অঙ্গীভূত নয়। আসলে দীর্ঘস্থায়ী এবং দৃঢ়বদ্ধ শৃঙ্খলা বাংলার সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বহির্ভূত।
অবশ্য ইংরেজ শাসনামলের পূর্বেও এখানে সভ্যতা ছিল, রাষ্ট্রও ছিল। সমাজ সংগঠন ছিল বলে সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সমাজ সংগঠন ছিল ক্ষুদ্র এলাকা ভিত্তিক এবং সাধারণভাবে অস্থিতিশীল বা শিথিল, ফলে দুর্বল। এই অবস্থায় এখানে ভিতর থেকে সাধারণত রাষ্ট্র গড়ে উঠতে বা গড়ে উঠলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে নাই। বরং রাষ্ট্র সাধারণভাবে ছিল বহিরাগত বা বিদেশীদের দ্বারা সংগঠিত অথবা আরোপিত।
তখনও রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল শাসন কার্য পরিচালনা ও রক্ষার জন্য জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের। একইভাবে জনগণের প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বা যোগাযোগের। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে মোগল সম্রাট এবং পরবর্তী সময়ে কার্যত স্বাধীন নওয়াবরা শাসন কার্য পরিচালনা করতেন বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাহায্যে। রাষ্ট্র জনগণ বা সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করত। যেমন ছিল পঞ্চায়েত। এ ছাড়া ছিল ধর্মীয় নেতা ও প্রতিষ্ঠান যেমন পীর-আউলিয়া, মোল্না, মসজিদ, ব্রাহ্মণ পুরোহিত, হিন্দু ধর্মীয় গুরু, মন্দির ইত্যাদি।
তবে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগের জন্য খুবই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কার্যকর ছিল জমিদার এবং পঞ্চায়েত। সে কালের জমিদাররা কিন্তু ইংরেজ আমলের জমিদারদের মত জমির মালিক ছিল না। তারা ছিল নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের খাজনা আদায়কারী এবং সেই সঙ্গে বিচার ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষারও দায়িত্বপ্রাপ্ত। এভাবে তারা ছিল রাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগের অংশ বা অধীনস্থ এবং সেই সঙ্গে প্রশাসনিক বিভাগেরও অংশ। কিন্তু জমিদাররা রাষ্ট্রের নিয়মিত বেতনভুক এবং এক এলাকা থেকে অপর এলাকায় বদলী যোগ্য কর্মচারী ছিল না। প্রজাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক ধার্যকৃত নির্দিষ্ট খাজনার অংশ বিশেষ তারা নিজেদের ব্যয় নির্বাহের জন্য রেখে দিত। নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডে বংশ পরম্পরায় দায়িত্ব প্রাপ্ত থাকায় জমিদাররা হত সেখানকার জনগণের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ এবং ফলে এলাকার জনগণের ভাগ্যের উপর তাদের ভাগ্যও অনেকাংশে নির্ভর করত। এ কারণে এলাকায় ব্যাপক ফসল হানি বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে খাজনা মওকুবের জন্য তারা রাজ সরকারের দরবারে ধর্ণা দিত।
পঞ্চায়েত ছিল সমাজের এমন একটি প্রতিষ্ঠান যাকে অস্বীকার করার কোন উপায় রাষ্ট্রের ছিল না। অথচ এটা আইনী বা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান সেই অর্থে ছিল না। এটা ছিল প্রথা নির্ভর। গ্রাম, শহর, মহল্না, এলাকা, পেশা, বর্ণজাতি ইত্যাদি কোন স্থান বা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের জন্য স্বেচ্ছাসম্মতি বা মতৈক্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠান এটি। এটা স্থায়ী বা অস্থায়ী যে কোনটা হতে পারত। পঞ্চায়েত প্রকৃতপক্ষে সমাজের সম্মিলিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশের প্রথাগত রূপ ছিল। এগুলি ছিল সমাজের স্ব-শাসনের নিজস্ব যন্ত্র। রাষ্ট্র জন-সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগের জন্য যেমন পঞ্চায়েতের সম্মতি ও মতামতকে গুরুত্ব দিত তেমন পঞ্চায়েতের মাধ্যমে জনগণের অনেক সমস্যা ও ইচ্ছাও রাষ্ট্র বা রাজকর্মচারীদের কাছে পৌঁছাত। দূরবর্তী পঞ্চায়েতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নওয়াব কর্তৃক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও আমরা সে কালের ইতিহাস থেকে জানতে পারি।
এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংযোগের জন্য ইংরেজ শাসনের পূর্বকালে আমরা জমিদার এবং পঞ্চায়েতের অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা দেখতে পাই।
ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে এই দুইটি প্রতিষ্ঠানই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পুরাতন জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে নূতন জমিদার শ্রেণী প্রতিষ্ঠা করা হল তারা হল জমির মালিক। সরকারকে নির্দিষ্ট খাজনা প্রদানের বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট ভূ-ভণ্ডের মালিক হয়ে বসল। কিন্তু জমিদারীর উন্নয়ন, বিচার, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ইত্যাদি দায়িত্ব থেকে তারা মুক্ত হল। এসব দায়িত্ব বা ক্ষমতা নিল রাষ্ট্র নিজে অর্থাৎ এলাকায় বহিরাগত প্রশাসক, পুলিশ, আদালত ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্বহীন এই অলস খাজনাভোগেী জমিদারদের বৃহদাংশই কলকাতাবাসী হল। এক দিকে, নিজ এলাকা থেকে দূরে বসবাস, এবং অপর দিকে, এলাকার উন্নয়ন ও প্রশাসনে ভূমিকা না থাকার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে তাদের গুরুত্ব বা ভূমিকা থাকল না।
অপর দিকে, পুরাতন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের ফলে পঞ্চায়েতও ধ্বংস হল। পঞ্চায়েত ছিল জন-সমাজের নিজস্ব শক্তি ও গতিশীলতার প্রথা ভিত্তিক রূপ। ফলে জন-সমাজের নিজস্ব শক্তিভিত্তি যখন ধ্বংস হল তখন পঞ্চায়েতের রক্ষা ব্যবস্থাও আর রইল না। দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি ক’রে এবং কুটীর শিল্প ধ্বংস ক’রে ইংরেজ শাসকরা সমাজ ও অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটালো। ইংরেজ বিজয়ের পর পরই ’৭৬-এর মন্বন্তর খ্যাত মহা দুর্ভিক্ষে (১৭৬৯ খ্রীঃ - ’৭০ খ্রীঃ) সমগ্র বাংলার জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করল। দুর্ভিক্ষে জনপদের পর জনপদ বিরান হয়ে গেল। বিশাল অঞ্চল ব্যাপী কৃষিক্ষেত্রসমূহ পতিত হয়ে জঙ্গলে পরিণত হল। মোগল ও নওয়াবী আমলে বাংলার রেশম ও তাঁত বস্ত্রের খ্যাতি ছিল পৃথিবী জোড়া। ’৭৬-এর মন্বন্তরে এই শিল্পে নিয়োজিত লোকজনের প্রায় অর্ধেক প্রাণ হারায়। কুটীর শিল্প ভিত্তিক অর্থনীতির উপর এর ফল হল ভয়ানক। অন্যদিকে, বিভিন্ন কর্মনীতি দ্বারা কুটীর শিল্পকে ধ্বংস করা হল। এভাবে সমাজ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। অর্থনীতি ও সমাজ ধ্বংস হবার ফলে সমাজ পুরোপুরি কৃষি নির্ভর হয়ে আরও অনেক বেশী পিছিয়ে গেল। একটা হিসাব দিলেই ইংরেজ শাসনের ধ্বংসাত্মক দিক স্পষ্ট হবে। মোগল বা নওয়াবী আমলে বাংলার জনসংখ্যার মাত্র ৬০% ছিল কৃষি নির্ভর এবং ৪০% ছিল কুটীর শিল্প, বাণিজ্য এবং অন্যান্য পেশা নির্ভর। কৃষি নির্ভরতার হার ইংরেজ শাসনামলে ৬০%-এর পরিবর্তে প্রায় ৯০%-এ পরিণত হল।
এই ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ছিল পঞ্চায়েত মূলক প্রতিষ্ঠানের উপর প্রচণ্ড আঘাত। তবু হয়ত পঞ্চায়েত মূলক ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু যখন উপনিবেশিক রাষ্ট্র তার বহিরাগত আমলাতান্ত্রিক পুলিশ ও প্রশাসন এবং তার নিজস্ব আইন-আদালত সর্বস্তরে জন-সমাজের উপর চাপিয়ে দিল তখন জন-সমাজের স্ব-শাসনের ব্যবস্থা হিসাবে পঞ্চায়েতের ভূমিকা ফুরালো।
কিন্তু সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব কমাতে না পারা ছিল ইংরেজ শাসনের জন্য বিপজ্জনক। সুতরাং পঞ্চায়েতের পরিবর্তে ইংরেজ শাসক শ্রেণী তার নিয়ন্ত্রণাধীন জন-প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় হাত দেওয়া হল। ক্রমে ইউনিয়ন বোর্ড, পৌরসভা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল।
কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়ে গেল। শুধু পুলিশ, মিলিটারী, সিভিল প্রশাসন দিয়ে ইংরেজদের পক্ষে এই ব্যবধান পূরণ করা সম্ভব ছিল না। অপর দিকে জনগণের নিকট এগুলি ছিল ভীতিপ্রদ, অচেনা, বিদেশী, ফলে অগ্রহণযোগ্য। ইউনিয়ন বোর্ড, পৌরসভা ইত্যাদি পঙ্গু প্রতিষ্ঠান হিসাবে উপনিবেশিক রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করলেও জন-সমাজের চাহিদা পূরণে অক্ষম ছিল।
এমন এক শূন্যতায় বাংলার জন-সমাজের ভিতর থেকে মাথা তুলতে শুরু করল রাজনৈতিক দল। অবশ্য এটা ঠিক, প্রথম দিকে ইংরেজ শাসক শ্রেণীর শর্ত সাপেক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা এবং এমন কি উদ্যোগও ছিল এই ধরনের দল গঠনে। একটা পর্যায়ে তারা এই দলগুলিকে নিয়মতন্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ রাখার প্রয়োজনে প্রাদেশিক পর্যায়ের শাসনে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের অংশ গ্রহণের সুযোগ দিল। ১৯১৯ সালের আইনে যেটুকু সুযোগ দেওয়া হল ১৯৩৫-এর আইনে সেই সুযোগকে আরও প্রসারিত করা হল।
দল এবং দলীয় কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনকে নিয়মতন্ত্রে আবদ্ধ রাখার প্রয়াস যে সর্বদা সফল ছিল তা নয়। তবু ইংরেজরা সাধারণভাবে সফল ছিল এবং ১৯৪৭-এ যখন ভারত ছাড়তে বাধ্য হল তখন নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের হাতে ভারত ও পাকিস্তান এই দুই রাষ্ট্রের শাসন ভার দিয়ে গেল।
বস্তুত ভূ-প্রাকৃতিক কারণে ঐতিহাসিকভাবে বাংলার সমাজ সংগঠনের দুর্বলতা এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের আগ্রাসনে সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্বংস অথবা অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলের ভূমিকাকে বিবেচনা না করলে উভয় বাংলার বাঙ্গালী সমাজে রাজনৈতিক দলের এত প্রবল প্রতাপ বা প্রভাবের কারণ আমরা ধরতে পারব না। রাজনৈতিক দলের প্রবল ভূমিকা যেমন আমরা এ বাংলায় দেখি তেমন আর একভাবে পশ্চিম বাংলায়ও দেখি। বিশেষত বাংলাদেশে বাঙ্গালী জাতি গঠন প্রক্রিয়ার নিয়ামক শক্তি হিসাবে রাজনৈতিক আন্দোলন ও দলের ভূমিকা বুঝতে পারা এ দেশের রাজনীতির সমস্যা বুঝতে পারার জন্য অপরিহার্য।
বিষয়টাকে স্পষ্টতর করার জন্য পুনরুক্তি করে বলছি ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তনের পর রেলপথ, বাঁধ, সেতু, রাজপথ ইত্যাদি নির্মাণের মাধ্যমে নদী ভাঙ্গন নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এই প্রথম এ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকরভাবে একটা বিশৃঙ্খল, ছত্রভঙ্গ ও অস্থিতিশীল জন-সমষ্টিকে বৃহৎ আয়তনে দৃঢ়বদ্ধ সমাজ গঠনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। এভাবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা অখণ্ড সমাজ ও জাতি গঠনের প্রক্রিয়া নূতন গতি ও শক্তি লাভ করে এ কালে এসে।
ব্রিটিশ শাসন কালে নদী শাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নগরায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের যে প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছিল তা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দ্রুততর গতি ও নূতন মাত্রা লাভ করে। বৃহত্তর সমাজ গঠনের মূল ভাবাদর্শিক জায়গায় প্রথমে ইসলাম ধর্ম থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ সেই ভাবাদর্শের জায়গা দখল করে। আসলে এই বিষয় বুঝা অত্যাবশ্যক যে, বাংলাদেশে বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের ব্যাপারটা জাতি গঠনের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সকল দ্বন্দ্ব, সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি নিয়েও যে কাজটা চলছে সেটা হচ্ছে একটা ঐক্যবদ্ধ বাঙ্গালী জাতি গঠন। সুতরাং ’৫২ এসেছে, ’৭১ এসেছে।
আর সকল ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও এই সমগ্র কর্মকাণ্ডের নায়ক এ দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল হয়েছে। অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় এ দেশে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ ও জাতি গঠনের নেতৃত্বকারী ভূমিকাও অর্পিত হয়েছে তার উপর। ভূ-প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ইত্যাদি কারণে সেই ধরনের আর কোন প্রতিষ্ঠান এ দেশে এই ভূমিকা পালনের উপযোগী না হওয়ায় রাজনৈতিক দলকে তা নিতে হয়েছে।
অর্থাৎ বৃহৎ আয়তনে সঙ্ঘবদ্ধ সমাজ এবং সেই সমাজের অভিব্যক্তি ও আত্মপরিচয়ের প্রয়োজনে জাতি এবং সেই জাতির আত্মরক্ষা ও স্ব-শাসনের প্রয়োজনে রাষ্ট্র গঠনের নায়ক হতে পারে এখানে একমাত্র রাজনৈতিক দল।
আর এখানেই তার আজ অবধি ব্যর্থতা। আর ব্যর্থতা বলেই সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের এই দুর্দশা।
প্রশ্ন আসবে কেন তার এই ব্যর্থতা। একটা বিষয় আছে, সেটা হচ্ছে এই সমাজ বা জাতিসত্তার উন্নত সমাজ, সভ্যতা ও নিজস্ব রাষ্ট পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব। অস্থিতিশীল ভূ-প্রকৃতির আবেষ্টনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল বা শিথিল সমাজ সমষ্টি নিয়ে ঐতিহাসিক কাল ধরে গড়ে উঠা একটা সমাজের কাছ থেকে দ্রুত সবকিছু আশা করা উচিত নয়। কম অথবা বেশী যেমনই হোক অভিজ্ঞতা ছাড়া মানুষের পক্ষে সঠিক ধারণা এবং পরিপক্বতা অর্জন করা সম্ভব নয়। সুতরাং একটা উন্নত ও যুগোপযোগী নেতৃত্ব গঠনের জন্য এই সমাজকে একটা পর্যায় পার হতেই হত। ১৯৭২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ বৎসরের সময়টাকে বেশী দীর্ঘ মনে হলেও হয়ত এই কারণে এই অপচয়কে এ জাতিকে মেনে নিতে হয়েছে।
ব্যর্থতার অপর একটি কারণ হচ্ছে ভূ-প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এই সমাজের গরিষ্ঠ অংশের মধ্যে উন্নত চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রের যে অভাব রয়েছে তা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে জনগণের অংশগ্রহণ সমৃদ্ধ দলগুলিকে। তবে গরিষ্ঠের নিকৃষ্টতা দিয়ে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয় নির্বাচন নির্ভর জনপ্রিয় বৃহৎ দলগুলি।
বিশেষত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন সমাজের ভিতর প্রাধান্যকারী যাবতীয় নিকৃষ্টতাকে ধারণের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নির্ভর দলগুলিকে নামতে বাধ্য করে। কিংবা আরও সঠিকভাবে বলতে হয় সমাজের ভিতর অবস্থিত যাবতীয় নিকৃষ্টতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলিই নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্তা হিসাবে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হল গরিষ্ঠ জনগণ সমর্থিত এই নিয়ন্তা বৃহৎ দলগুলির কোনটিই দলের ভিতর গণতন্ত্র চর্চা করে না; বরং এগুলির প্রতিটিই আপাদমস্তক একনায়কী, স্বৈরতান্ত্রিক। এও গরিষ্ঠ জনগণের চরিত্র ও আকাঙ্ক্ষার অভিব্যক্তি, যা দলের ভিতর দিয়ে মূর্ত হয়। এর মূল উৎস অবশ্য ইসলামের ধর্ম-সংস্কৃতি। তবে সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
প্রকৃতপক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে বহুদলীয় নির্বাচনের রাজনীতি এ দেশের যে ক্ষতি করে চলেছে তাকে এক কথায় বলতে হবে অপরিমেয়। এ দেশে সঙ্ঘবদ্ধ সমাজ, উন্নত জাতি এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে অন্তর্ঘাত করে চলেছে বহু দলীয় রাজনীতি।
যে সমাজের ঐক্যের প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেখানে বহুদলীয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত উন্নত ও সঙ্ঘবদ্ধ জাতি গঠনের পরিবর্তে সমাজকে পরস্পর বিরুদ্ধ কতকগুলি উপজাতিসম দলীয় বিভাজনে নিয়ে যায়। আমাদের প্রয়োজন এ ধরনের বিভাজনের পরিবর্তে আধুনিক যুগোপযোগী ঐক্যবদ্ধ, সংহত ও শক্তিশালী জাতি ও তার রাষ্ট্র গঠন। এছাড়া আমরা প্রতিযোগিতার এই পৃথিবীতে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারব না। সুতরাং সমগ্র সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের বিভিন্ন অংশকে একটি অভিন্ন মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ ক’রে একটি উন্নত, আধুনিক ও শক্তিশালী জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দানের জন্য এখানে রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। আর সে কারণে বহুদলীয় গণতন্ত্র নয়, বরং জন-কল্যণবাদী ও উন্নত আদর্শ ভিত্তিক একদলীয় গণতন্ত্র আমাদের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান।