লিখেছেনঃ ইকবাল মাহমুদ, আপডেটঃ April 17, 2009, 12:00 AM, Hits: 12833
যে বাস্তব মূর্ত নয় - বিমূর্ত একমাত্র তাই শাশ্বত। কবির উদ্দেশ্য হলো এই অসম্পূর্ণ, অসংলগ্ন বাস্তবের মধ্য দিয়ে সেই সম্পূর্ণ ও শাশ্বত বাস্তবকে আবিষকার করা এবং পাঠক চিত্তে তাকে জাগ্রত করা। ÔToute L’ Ame Resumee (All The Souls Indrown) কবিতায় বলেছেন, এই তথাকথিত বাস্তবকে বর্জন করতে হবে Ôexclude from poetry the ash of the real.’ C.M Brown ও একই কথা বলেছেনঃ “What matter are the words and their rhythm, the images they provide, the associations they evoke the experience which somehow they create. (The Heritage of Symbolism-P.-23)
যে ভাষা কাব্যের উপকরণ তা আবার দৈনিন্দন প্রয়োজনের দাবিও মেটায়। তাই প্রত্যেক সৎ কবির উপকরণ ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। কি করে এই প্রত্যহের ম্লান সপর্র্শ লাগা ভাষা দিয়ে মূর্ত জগৎকে ভাবের জগতে রূপান্তরিত করা যাবে। কারণ শব্দ এমনই একটি বিষয় যার ব্যবহার ঠিকমত না জানলে বিষয়বস্তুর আঙ্গিক যত সুন্দরই হোক না কেন তা কখনও সফল হবে না। শিল্প সৃষ্টিতে সফলতা আনতে হলে বিষয়বস্তুর আঙ্গিকের সাথে ভাষা ও শব্দের অপূর্ব নির্মিতি দরকার। সুতরাং যারা এ কাজটি সুন্দরভাবে করতে পারেন - তারা সফল।
এদিক থেকে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ভাষা বা শব্দ পেয়েছে এক অপূর্ব নির্মিতি। গদ্য আমেজে শিথিল শব্দ বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি কবিতায় এনেছেন এক অপূর্ব অনাস্বাদিত ব্যঞ্জনা। প্রথম রমণীয় সপর্শে শরীরে যে রোমাঞ্চ লাগে এ যেন তাই-সেই নরম নারীর মতো - নরম নদীর মতো। নদী তীরবর্তী ব্রাত্যজীবন ও ব্রাত্যজনপদ থেকে সংগ্রহ করা হাজার বছরের আয়ুস্মতী শব্দ তার কবিতাকে দান করেছে অনন্য সাধারণ রূপ-বৈচিত্র্য। নদী তীরবর্তী এসব শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন দক্ষ হাতে।
বুদ্ধদেব বসুর কথা এখানে স্মরণযোগ্য -
“শুধু বিষয়বস্তু দিয়ে কবিতা কি-যে কোনো শিল্পের বিচার করতে গেলে ভুল হবার সম্ভাবনা প্রতিপদে; কারণ শুধু যে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন বিষয় মহিমা লাভ করে তা নয়, উপরন্তু একই বিষয় কোনো পাঠকের চোখে মহৎ, আবার অন্য কোনো পাঠকের চোখে দৃশ্য। এই কারণে আঙ্গিকের আলোচনা ভিন্ন, কবিতার সমালোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না।” (“কবিতা”- বুদ্ধদেব বসু, পৌষ-১৩৬১ এবং পৃষ্ঠা ৬৮, ৭০প্রগতি-ভাদ্র ১৩৩৬)
শুধু তাই নয় - তিনি আরও বললেন, “আমাদের কবিতায় এখনো সুন্দরীরা বাতায়ন পাশে দাঁড়িয়ে কেশ আলুলায়িত করে দেয়; মুকুরে মুখ দেখে, চরণ অলক্ত-রঞ্জিত করে, শুভ্র শীতল শয্যায় শোয়। ...সংস্কৃতের দুয়ারে এই কাঙালপনা করে আর কতকাল আমরা মাতৃভাষাকে ছোট করে রাখবো? আমাদের জীবনানন্দ বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয়; ভাষাকে অসম্ভব খাঁটি বাংলা করে তোলবার চেষ্টা তাঁর মধ্যে দেখা যায়।” (“কবিতা”- বুদ্ধদেব বসু, পৌষ-১৩৬১ এবং পৃষ্ঠা ৬৮, ৭০প্রগতি-ভাদ্র ১৩৩৬)
জীবনানন্দ যখন একাজটি নিপুণ হাতে শুরু করেছেন সেই সময়টা ছিলো আধুনিক বাংলা কবিতার সময়। যদিও ‘আধুনিক’ শব্দটি আপেক্ষিক। বায়রন, পুশকিন কিংবা কীট্স তাঁদের যুগে ছিলেন আধুনিক। আবার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র প্রমুখ আধুনিক ছিলেন তাঁদের সময়ে। রবীন্দ্রনাথের পরে যারা এসেছেন তাঁরাও তাঁদের সময়ে আধুনিক। তাঁদের কাব্যও আধুনিক। এজন্যে আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু ইতস্তত বোধ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ
“...এই আধুনিক কবিতা এমন কোনো পদার্থ নয় যাকে কোনো একটা চিহ্ন দ্বারা অবিকলভাবে সনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের, আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ, বিশ্ববিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি। আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা বা বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্নিক জীবনের তৃষ্ণা, এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন ভিন্ন কবিতে নয়, কখনো হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবির রচনায়।’ শুধু তাই নয়। তার মতে, “এই কবিরা (আধুনিক) নতুন সুর এনেছেন আমাদের কাব্যে...রবীন্দ্রনাথের পরে প্রথম নতুন সুর।” (বুদ্ধদেব বসু, ভুমিকা, “আধুনিকা বাংলা কবিতা”)
আধুনিক কবিতা সম্পর্কে জীবনানন্দ বুদ্ধদেব বসুর মতো সুর মিলিয়ে বলেছেন “...নতুন সময়ের জন্যে নতুন, ও নতুনভাবে নির্ণীত পুরোনো মূল্য, নতুন চেতনা ও নতুনভাবে আবিষকৃত পুরানো চেতনার যে একান্ত দরকার শিল্পে ও জীবনে। একালের কোনো কোনো বাঙালী কবি সেটা বুঝতে পেরেছেন...।”
বাংলা আধুনিক কবিতা সর্ম্পকে সপষ্টতর, কালনির্দেশক, যুগোপযোগী যুৎসই সংজ্ঞা দিয়েছেন জনাব আবু সয়ীদ আইয়ুব। তাঁর মতে, ‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী, এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী, কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’ (আধুনিক বাংলা কবিতা’ আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ভূমিকা)
সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে আধুনিক কবিতার তিনটি লক্ষণ আমাদের সামনে সপষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলো :
১। কালের দিক থেকে আধুনিক কবিতা প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী।
২। ভাবের দিক থেকে তা রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত বা রবীন্দ্র প্রভাব থেকে মুক্তি লাভের প্রয়াসী।
৩। সৃষ্টির দিক থেকে তা নবতম সুরের সাধক।
বাংলা আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা বিশ্লেষণে শুধু এই তিনটি লক্ষণই প্রকাশ পায় না। ভাবের দিক থেকে আরো বেশ কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় দীপ্তি ত্রিপাঠী’র আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা বিশ্লেষণে :
১। নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার প্রভাব।
২। বর্তমান জীবনের হতাশা, ক্লান্তি, নৈরাশ্যবোধ ও জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা।
৩। আত্নবিরোধ ও অনিকেত (Rootless) মনোভাব।
৪। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সচেতনভাবে গ্রহণ।
৫। ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের প্রভাব। অবচেতন মনের ক্রিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে চিন্তাধারার অসম্বদ্ধতা।
৬। ফ্রেজার প্রমুখ নৃতাত্ত্বিক, প্ল্যান্ক, বোর ও আইনস্টাইন প্রভৃতি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীর প্রভাব।
৭। মার্কসীয় দর্শনের, বিশেষত সাম্যবাদী চিন্তধারার প্রভাবে নতুন সমাজ সৃষ্টির আশা ।
৮। মননধর্মিতার বিষয়বস্তু, উপকরণ-অনেক সময় জ্ঞানের বিপুলভারে দুরূহতার সৃষ্টি।
৯। বিবিধ প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধে (যেমন প্রেম, সংশয়, সুন্দর, কল্যাণ, ধর্ম) এবং এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তার উদ্বেগ।
১০। দেহজ কামনা, বাসনা ও অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং প্রেমের শরীরী রূপকে প্রত্যক্ষ করা।
১১। ভগবান এবং প্রথাগত নীতিধর্মে অবিশ্বাস।
১২। রবীন্দ্র-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ এবং নতুন সৃষ্টির পথ সন্ধান।
ভাবধর্মের সঙ্গে শৈলী ও প্রকরণ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বলে আধুনিক প্রকরণেও বহু পরিবর্তন দেখা দিল। তাছাড়া আধুনিক কাব্যের লক্ষণ আলোচনায় আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্য ও সমমর্যাদা দাবী করে। এখানে বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন এজন্য যে আধুনিক কবিতার স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য না জানলে জীবনানন্দের কবিতায় শব্দ প্রকরণ বিষয়টি আলোচনা করা কঠিন হবে। কেননা তিরিশের দশকে অর্থাৎ রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতা যাদের হাতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল জীবনানন্দ তাদের মধ্যে অন্যতম। বৈশিষ্ট্যের লক্ষণগুলো হলোঃ
০১। বাকরীতি ও কাব্যরীতির মিশ্রণ। গদ্যের ভাষা, প্রবাদ, চলতি শব্দ, গ্রাম্য শব্দ ও বিদেশী শব্দের ব্যবহারে গদ্য, পদ্য ও কথ্যভাষার ব্যবধান বিলোপের চেষ্টা। পরবর্তী পর্যায়ে অতি-ব্যবহৃত গদ্যগন্ধী শব্দকেও গ্রহণ অর্থাৎ ভাষা সম্বন্ধে সর্বপ্রকার শুচিবায়ু পরিহার।
০২। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণ এব বিখ্যাত কবিদের কাব্য অথবা ভাবনা থেকে উদ্বৃতির যত্রতত্র প্রয়োগে সিদ্ধরসকে চূর্ণ করা বা অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন অনুভূতির সমন্বয় সাধন।
০৩। প্রচলিত কবি প্রসিদ্ধ উপমা ও বর্ণনার বিরলতম ব্যবহার। প্রচলিত কাব্যিক শব্দ প্রভৃতি বর্জন।
০৪। প্রাচীন উপমা বা শব্দের অভিনব অর্থে প্রয়োগ এবং তৎসহযোগে নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি।
০৫। শব্দ প্রয়োগে বা গঠনে মিতব্যয়িতা ও অর্থঘনত্ব সৃষ্টির চেষ্টা।
০৬। মিতব্যয়িতার উদ্দেশ্যে বাহুল্যবর্জনের ফলে মধ্যবর্তী চরণের অনুল্লেখ। তার জন্য চিন্তাধারার মধ্যে একটা উল্লম্ফনের সৃষ্টি, আপাতদৃষ্টিতে যাকে মনে হয় অসম্বদ্ধ। ছড়ার উল্লম্ফনের সঙ্গে তার পার্থক্য মৌলিক।
০৭। নামবাচক বিশেষ্য, বহুপদময় বিশেষণ, অব্যয় এবং ক্রিয়ার পূর্ণরুপের ব্যবহার। চলতি ক্রিয়াপদের সঙ্গে সংষকৃতবহুল বিশেষ্য বা বিশেষণের সংযোগ।
০৮। প্রচলিত পয়ার, সনেট ও মাত্রাপ্রধান ছন্দের রুপান্তর এবং মধ্যমিলের (ইনটারনাল রাইম) সৃষ্টি ।
০৯। গদ্যছন্দের ব্যবহার।
১০। ব্যঙ্গ, বিতর্ক, অদ্ভুত, বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার।
১১। শব্দালংকার অপেক্ষা বিরোধাভাস, বক্রোক্তি, স্মরণ প্রভৃতি অর্থালংকারের ব্যবহার।
১২। বিষয় বৈচিত্র্য।
কাব্যের এই সমস্ত লক্ষণ, কোন সময়, কোন কালে, কোন কবির মধ্যে এককভাবে প্রকাশ পায়নি। তবে হ্যাঁ, আধুনিক কবিদের কাব্যে এ সমস্ত লক্ষণ প্রবলভাবে প্রকাশ হতে দেখা যায়। আধুনিক কবিতা যে পঞ্চপাণ্ডবের হাতে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল তাঁরা হলেন-বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে। রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিতা এই পঞ্চপাণ্ডবের হাতে শৈশব থেকে কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে যৌবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। এই পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন অন্যতম। জীবনানন্দ দাশের কাব্যের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, শব্দ কুশলতা ছিল অন্যান্যদের থেকে ভিন্ন। আধুনিক কাব্য সৃষ্টি আন্দোলনের এঁরাই ছিলেন পুরোধা। এরাই প্রথম নির্দেশ করেন রবীন্দ্রনাথের স্বকীয় প্রতিভাদ্বীপ্ত কর্মের পথে আধুনিক কবিতার মুক্তি অসম্ভব, কারণ আধুনিক জীবনের মূল্যবোধ আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। তিরিশের দশকে এদের কাব্যসাধনা শুরু হয়েছিল এই নতুন দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে। এবং এখন পর্যন্ত তা সচল। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁদের শেষদিন পর্যন্ত এই স্বেচ্ছাগৃহীত সৃষ্টির ব্রত পালন করে গিয়েছেন। আধুনিক কাব্যের যে বৈশিষ্ট্য, লক্ষণগুলোর কথা উল্লেখ করেছি এদের কাব্যে সর্বাধিক ও সর্বাপেক্ষা উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।
একজন কবি যিনি - কবিতায় শব্দ তার সূচির সাথী। আজীবন তাকে বাস করতে হয় শব্দ-শব্দপুঞ্জের সাথে। শব্দ তার সুহৃদ, সহচর বান্ধব। শব্দ যদি তার সাথে শত্রুতা করে তবে হৃদয়ের অদৃশ্য রক্তপাত হওয়া ছাড়া আর কিছুই ঘটবে না। শব্দ কখনো কবিতা নয়। কিন্তু শব্দের গভীর থেকে কবিতার জন্ম হয় - কবিতা মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে, উড়বার জন্যে। কবির হৃদয়ের আবেগ যখন মোহনীয় ভঙ্গিমায় ধরা পড়ে শব্দ তখন শিলাখণ্ডে বৃষ্টির মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে - আর ঠিক তার পরেই ভোরের নরম রোদের আলোয় কবিতা তার পাপড়ি মেলতে শুরু করে। একটি শব্দের মনোমত বিন্যাস কবিতাকে দান করে অপূর্ব নির্মিতি। আর সেই বিন্যাস যদি ঠিকমতো না হয় তাহলে কবিতা-পাঠক সমমুখে মুখ থুবড়ে পড়বে-শিল্প হারাবে তার মূল্য এতে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলা আধুনিক কবিতায় শব্দের যুৎসই বিন্যাস, দেশী, বিদেশী, লোকজ, তৎসম শব্দের প্রয়োগ যার হাতে নিপুণতা পেয়েছে তিনি হলেন জীবনানন্দ দাশ। শব্দ ব্যবহারে তিনি আগাগোড়াই ছিলেন বেপরোয়া। অনুপ্রাস, যতি, ছন্দ, মিলের কোন তোয়াক্কাই করেননি কবিতায়। ঠোঁটের’, ‘বোটের’, ’বিয়োবার’, ‘ভাঁড়ার’, এমন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন অক্লেশে - সেই সাথে চোখের সামনে দেখা দৃশ্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন রহস্য। ইমপ্রেশনিস্টরা যে কাজটি করে থাকেন। শিল্পী মাত্রই জানেন যে তাঁর ব্যবহার্য মাধ্যমের অনেক অপূর্ণতা রয়েছে। মাধ্যমের এই অন্তর্নিহিত সীমা অতিক্রম করতে গেলে তার প্রকৃতি বদলে দিতে হয় - তাকে দিতে হবে তির্যকগতি - তার মধ্যে সঞ্চার করতে হবে গুরুতর ব্যঞ্জনা। বরাবরই শ্রেষ্ঠ কবিরা করেছেন এবং আধুনিক কবিরা তা করেছেন সজ্ঞানে। শব্দের একটা অভিধানগত অর্থ নিশ্চয় থাকবে, কিন্তু তাকে ব্যবহার করতে হবে।
বাংলা কবিতায় যখন সাধু ক্রিয়াপদ চালু রয়েছে তখন প্রমথ চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ সাধুগদ্য পরিত্যাগ করার চেষ্টা করেন। পরিত্যাগ করলেও একেবারে তিনি পরিত্যাগ করতে পারেননি। তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত সমস্ত রচনাতেই সাধু এবং চলতি ক্রিয়াপদের দু’রকম মিশ্রণই আমরা দেখতে পাই। বাংলাভাষায় যাদেরকে আমরা আধুনিক কবি বলে চিহ্নিত করেছি - ‘কবি’ শব্দের পাশে ‘আধুনিক’ শব্দের লেবেল এঁটে দিয়েছি তাঁরা প্রত্যেকেই সাধুক্রিয়াপদ পুরোপুরি বর্জন করার চেষ্টা করেছিলেন এবং করেছেনও। তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন ব্যতিক্রম। এজন্য যে তিনি এমন এক কাব্যভাষা আনতে চেয়েছিলেন যেখানে বাংলা ক্রিয়াপদের সংখ্যা খুবই কম। ‘ফেলিয়াছি’, ‘আসিয়াছে’, এমন ক্রিয়াপদের ব্যবহার পাওয়া গেলেও তা যেন দৃশ্যকে রহস্যময়তার মধ্য দিয়ে ধরতে গিয়ে একেবারে অবহেলায় ব্যবহার করা। অনেকটা এলানো ভাবের মতো। আধুনিক কবিদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুখের ভাষা এবং কাব্যের ভাষার ব্যবধান বিলোপ করা। মৌখিক ভাষার ইডিয়ম অর্থাৎ বিশিষ্ট দেশজ রীতি ব্যবহারে কবিতাকে স্বাভাবিক ও সহজ ক’রে তুলবার প্রচেষ্টা তাঁরা সকলেই করেছেন। তবে জীবনানন্দের মতো শব্দের এমন স্বচ্ছন্দ ও প্রচুর ব্যবহার আর কেউ করতে পারেননি, এমনকি রবীন্দ্রনাথ তো নয়ই। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে নিজেই লিখেছেন- “আমাকে অনুভব করতে হয়েছে যে, খণ্ড-বিখণ্ডিত এই পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয় ও এক এক পূর্ববর্তী কবিদের মধ্যে একমাত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এ বিষয়ে কৃতকার্যতা দেখিয়েছিলেন।’ (কবিতার কথা - জীবনানন্দ দাশ)
সত্যেন্দ্রনাথে যা ছিলো সম্ভাবনা জীবনানন্দ তাকে দিয়েছেন সিদ্ধি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- ‘মাঠে মাঠে সোঁদাল সর্ষে’, ‘অতসী ছুড়ির ঠোঁটের উপর’, ‘চুলবুল’, ‘শেমিজ’, ‘থুতনি’, কিংবা ‘ছিঁড়ে ফেঁড়ে’ ‘শর’, ‘মুথা ঘাস’ এমন অনেক শব্দের কথা যা জীবনানন্দ কবিতায় ব্যবহার করেছেন। শব্দের এত সুন্দর ও সাবলীল ব্যবহার তিরিশের দশকের আর কোন কবি করেছেন বলে আমার মনে হয় না - এমনকি আজ পর্যন্ত। শব্দকে এত সাবলীল ও বিমূর্তরূপে যে কবিতায় ব্যবহার করা যেতে পারে একথা সত্যেন্দ্রনাথও হয়তো ভাবতে পারেননি। তিরিশের দশকে বাংলা কবিতা যাদের হাতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল - সেই সময় রবীন্দ্রধারা থেকে এক স্বতন্ত্র ধারায় ফিরে যাওয়ার জন্য সেইসব কাণ্ডারীদের কাছে বিমূর্ত ধারার প্রয়োজন ছিল - এবং জীবনানন্দ সেটা সচেতনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন বলে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, অরুণ কুমার-এর মতো মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বস্তুবাদের ব্যাখার দিকে এগোননি। ফ্রাৎস কাফকা, দস্তয়ভস্কির মতো ‘অকবি’ নাম নিয়ে বেছে নিয়েছিলেন বিমূর্ততাকে। বিমূর্ততার মধ্যেও যে মানুষের কথা, জীবনের কথা, সমাজের কথা বলা যায় না, তা নয়; যায়। তবে সেটা শব্দ চর্চার উচ্চস্তর তৈরী করে-উপমা-উৎপ্রেক্ষার গভীর বর্ণনার মধ্য দিয়ে।
শুধু তাই নয়, মৌখিক ভাষার প্রচলিত তৎসম শব্দের ব্যবহারজাত মালিন্য ঘুচিয়ে তাতে কাব্যের সপন্দন তিনি এনেছিলেন। বলা যায় -
‘তোমার শরীর - তাই নিয়ে এসেছিলে একদিন’। কিংবা ‘আজো তার শরীরের গন্ধ পাই’। এখানে ‘শরীর’ কথাটি আগে আমরা যেভাবে চিনতাম জীবনানন্দ কবিতায় সেই ‘শরীর’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে ‘শরীর’ কথাটি আমরা আবার নতুন করে আবিষকার করলাম। নায়িকাদের শরীরের অস্তিত্ব আমরা শুনিনি; শুনেছি ‘দেহ’, ‘দেহলতা’, ‘দেহ বল্লরী’ ইত্যাদি। ‘ঝরা পাতা’, ‘জলডাহুকী’, ‘শিরশিরে হাওয়া’, ‘বুনো হাঁস’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ইত্যাদি শব্দকে তিনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন নিপুণ হাতে।
সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে ফিরে ফিরে
মাঠে ঘাটে একা একা, - বুনোহাঁস - জোনাকীর ভিড়ে!
দুশ্চর দেউলে কোন্ - কোন্ যক্ষ প্রসাদের তটে,
দূর উর-ব্যাবিলোন্ - মিশরে মরুভূ সঙ্কটে;
(অস্তচাঁদ - ঝরাপালক)
অথবা,
হয়তো শুনেছো তারে, - তার সুর, - দুুপুর আকাশে
ঝরাপাতা ভরা মরা দরিয়ার পাশে
বেজেছে ঘুঘুর মুখে, - জলডাহুকীর বুকে পউষনিশায়
হলুদ পাতার ভিড়ে শিরশিরে পূবালী হাওয়ায়!
(কবি - ঝরাপালক)
‘ঝরা পাতা’, ‘বুড়ি চাঁদ’, ‘থ্যাঁতা’, ‘জল ডাহুকী’, ‘শিরশিরে হাওয়া’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, কিংবা ’মিশরের মরুভূমি সঙ্কট’, ‘ব্যবিলনীয় সভ্যতা’ ‘নিনেভে’, ‘চীন’ ‘গেৎসিমানি’ -এসবই জীবনানন্দের বৈশিষ্ট্যসূচক। শব্দের যথাযথ ব্যবহার, বন্ধ্যা যুগের চিত্রকল্প সৃষ্টি, ইতিহাস তথা ভৌগোলিক চেতনার প্রকাশ ও ইন্দ্রিয়ঘন পরিবেশ রচনা জীবনানন্দ প্রথম পর্বেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেমনঃ
আমি চ’লে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ’রে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে।
(নির্জন স্বাক্ষর - ধূসর পান্ডুলিপি)
কিংবা,
মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকে
মানুষের কাছে প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।
(মানুষের মৃত্যু হ’লে - শ্রেষ্ঠ কবিতা)
‘নির্জন স্বাক্ষর’. ‘মানুষের মৃত্যু হ’লে’, ‘মরুবালু’, ‘আলেয়া’ প্রভৃতি কবিতায় একটি লক্ষণ বেশি পরিলক্ষিত হতে থাকে-তা হলো : মৃত্যু চেতনা। এই মৃত্যুচেতনা (Melody of the age) অর্থাৎ যুগযন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত, জীবনের বিভিন্ন মূল্যবোধের অসার্থকতায় সুগভীর বেদনা থেকেই তার স্ফুরণ। আজীবন জীবনানন্দ ছিলেন হতাশায় জর্জরিত। নিজ গৃহ থেকে সমাজের প্রতিটি জায়গায় তিনি ছিলেন নির্বাসিত। ঘাত-প্রতিঘাত, পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা, পারিবারিক জীবনে অশান্তি, অর্থাভাব, দুঃখকষ্ট এসবই জীবনানন্দকে হতাশায় পর্যবসিত করেছিল। জীবনের প্রতি ছিল এক গভীর বীতশ্রদ্ধা-বিতৃষ্ণা। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধা-বিতৃষ্ণা তাকে করে তুলেছিল আত্ননিমগ্ন এক মানুষ। সেই থেকে তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল মৃত্যু চেতনা। তাঁর কবিতায় মৃত্যচেতনা একটি প্রধান বিষয়, তাঁর একাধিক কবিতায় মৃত্যুর বর্ণনা চোখে পড়ে। তাঁর ’মৃত্যুর আগে’ কবিতাটিতে মৃত্যুর রূপ ভয়ঙ্কর নয়। বরং বলা যায় অপরূপ শীতের রাতে নম্রনীল জ্যোৎস্নার মায়াবী আলো-ছায়ায় মৃত্যুও এই শান্ত শীত সন্ধ্যার মতোই রমণীয়। এই মৃত্যু চেতনা অর্থাৎ যুগ যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খেতো। আর এই বেদনা থেকেই জন্ম হলো এক নতুন কবির।
আধুনিক জীবনে মূল্যবোধগুলো যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বা যাচ্ছে জীবনানন্দ সে কথা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর মনে হয়েছিল রোম্যান্টিক ভাবনা দিয়ে বর্তমান যুগস্বরূপ কে উদ্ঘাটিত করা যাবে না। করতে হবে এক ভিন্ন আঙ্গিকে - ভিন্ন শব্দকল্পের ব্যবহার এ মধ্যদিয়ে - ভিন্ন বাক্যের কূটচালে। তাঁর ‘আদিম দেবতারা’, ‘ঘোড়া’, ’মহাপৃথিবী’ ইত্যাদি কবিতায় এমন শব্দকল্পের অজস্র ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতে প্রতীকী রূপকল্পের মাধ্যমে যে বস্ত সংগতির কথা বলতে শুনি; রিল্কে যেমন অধিচেতনকে ছুঁতে চেয়েছিলেন, দেখতে চেয়েছিলেন তিনি Dingee, thing বস্তু; সেই বস্তু; বস্তু-সংগতির অনেকটাই মিল খুঁজে পাই। রিল্কে অনুরাগী জীবনানন্দ বস্তু’র কথা বলেননি-বলেছেন বস্তু-সংগতির কথা। রিল্কের ’অর্ফিয়ূসের প্রতি সনেট’ কবিতা যা জীবনানন্দ দাশের ’ঘোড়া’ কবিতার সাথে তুলনীয়।
The remembered evening of the spring day
In Russia: a horse drawing near...
White, coming up from the village alone,
On one fetlock a tethering-block,
To spend the night alonbe, on his own.
বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে তাকালে দেখা যায়-
অবিস্মৃত একটি বসন্ত দিন-রাশিয়ায়-আসন্ন সন্ধ্যার
অন্ধকার গ্রাম ছেড়ে চলে আসে আমাদের দিকে
একটি ধবল ঘোড়া, নিঃসঙ্গ...এর পায়ে কাষ্ঠখণ্ড বাঁধা,
তবু রাত কাটাতে চায় সে একা, জনশূন্য মাঠে-
আর জীবনানন্দ-
আমরা যাইনি ম’রে আজো - তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়ঃ
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোস্নার প্রান্তরে;
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন - এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ‘পরে।
(ঘোড়া - সাতটি তারার তিমির)
রিল্কের কবিতায় একটি সাদা নিসঃঙ্গ ঘোড়া, যে জনশূন্য মাঠে একা-একা রাত কাটাবে - এই যে উদগ্র বাসনা, যা জীবনানন্দের ’মহীনের ঘোড়াগুলো’র কাছে নিয়ে যায় না কি? রিল্কের ঘোড়াগুলো যেমন জনশূন্য মাঠে রাত কাটাবার উদগ্র বাসনা ব্যক্ত করছে তেমনি জীবনানন্দ দাশের কবিতার ঘোড়াগুলো রাত কাটাচ্ছে কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে - ঘাস খাচ্ছে। রিলকে তাঁর ঘোড়ার মধ্যে দেখেছিলেন অবিচ্ছিন্ন আবহমানকে। তাঁর কবিতায় দূরত্বময়ের অনুভূতি পেয়েছিল ঘোড়াটি। আর জীবনানন্দ - তিনি? তিনি মহীনের ঘোড়াগুলোর মধ্যে দেখেছিলেন প্রস্তরযুগ, তার নিওলিথ স্তব্ধতা। শুনতে পেয়েছিলেন ূধথলল সফ ঢ়হথধপ’ আর তাই সমস্ত কবিতার মধ্যে শব্দে শব্দে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই আহ্বানের ব্যাপ্তি, স্তব্ধতা, মেদুরতার রহস্যময়তা। কিংবা তার ‘শীতরাত’ কবিতা। এখানে বস্তু-সংগতির কথা নয়; রবীন্দ্রনাথ থেকে উত্তরণের কথা বলেছেন, রোম্যান্টিকতা থেকে মুক্তির কথা বলেছেন। যেমনঃ
সিংহ অরণ্যকে পাবে না আর
পাবে না আর পাবে না আর।
কোকিলের গান
বিবর্ণ এঞ্জিনের মতো খ’শে খ’শে
চুম্বক পাহাড়ে নিস্তব্ধ।
(‘ শীতরাত’ - মহাপৃথিবী)
এখানে ‘পাবে না আর’, ‘পাবে না আর’ শব্দটি বারবার উল্লেখ করাই হলো রোম্যান্টিকতার অবসান ঘোষণা। রবীন্দ্রনাথ যেমন বিরহের অনুভূতির মধ্যে এক নতুন সম্পদের সন্ধান পেয়েছিলেন, বলেছিলেন- ’চিত্ত ভরিয়া রবে ক্ষণিক মিলনে, চিরবিচ্ছেদ করি জয়’। কবির কাছে এ বিচ্ছেদ, শূন্যতাকে শূন্য বলে মনে হয়নি।
তবু শূন্য শূন্য নয়
ব্যাথাময়
অগ্নিবাষ্পে পূর্ণ সে গগন।
একা একা সে অগ্নিতে
দীপ্ত গীতে
সৃষ্টি করে স্বপ্নের ভুবন।
(পূর্ণতা - পূরবী)
কিন্তু জীবনানন্দ! তাঁর ধারণা ছিলো তিনি অনুভব করেছিলেন বিচ্ছেদ পূর্ণতা দেয় না, বিধ্বস্ত করে দিয়ে যায় দেহ-মন-আত্না। জীবনানন্দের কাছে বিচ্ছেদের অর্থ -অনন্ত শূন্যতা। প্রেম নশ্বর, কিন্তু স্মৃতি কি নশ্বর? জীবন তবে কি স্থির? এই প্রশ্ন জীবনানন্দের। তাঁর মতে, ‘ সময়ের আগেই মৃত্যুর পূর্বেই প্রেমের সময় কেটে যায়।’ এই ট্রাজেডী মৃত্যুর চেয়েও বেদনাবহ। রোম্যান্টিক কবিদের শ্বাশত প্রেমের আদর্শে তাই জীবনানন্দের বিশ্বাস নেই। কারন তিনি দেখেছেন শুধু দেহ-ই ক্ষণিক নয়, মনের ক্রিয়াগুলিও ক্ষণিক। এমনই একটি গভীর শূন্যতাবোধের অনুচ্ছ্বসিত সংযত প্রকাশ ’বনলতা সেন’ কবিতা। যেখানে চিত্রকল্প বা রূপকল্পের সাথে শব্দের রয়েছে এক নিপুণ মেলবন্ধন। বাংলা আধুনিক কবিতায় শব্দকল্পের সাথে রূপকল্পের মেলবন্ধনের মাধ্যমে পার্থিব জীবনের সমস্ত অসম্পূর্ণতা, বেদনাবোধ যে ফুটিয়ে তোলা যায় তা বাংলা কবিতায় কেন সমসাময়িক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কবিদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া দুষকর। যেমন, ‘হায় চিল’ কবিতাটি।
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে !
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান মুখ মনে আসে !
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে;
হায় চিল সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে।
(হায় চিল - বনলতা সেন)
এ কবিতায় ‘ভিজে মেঘের দুপুর’, ‘ধানসিঁড়ি নদী’, ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’, ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যা’, ‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো’ ইত্যাদি শব্দকল্পের কী অপূর্ব নির্মিতি। তিনি শুধু ’বনলতা সেন’ নাম দিয়েই ক্ষান্ত হননি। আরো নির্দিষ্ট করে তোলবার জন্যে ‘ বনলতা সেন’ এর সাথে নাটোর শব্দ যুক্ত করেছেন। প্রিয়ার দেহী রূপকে প্রত্যক্ষ করে তোলবার জন্য কবি প্রসিদ্ধি ত্যাগ করে উপমা সৃষ্টি করেছেন ঘরোয়া শব্দ দিয়ে। এ শব্দগুলি অধিকতর অবয়বত্ব এনেছে। যেমন :
শরীর রয়েছে তবু ম’রে গেছে আমাদের মন?
হেমন্ত আসেনি মাঠে, - হলুদ পাতায় ভরে হৃদয়ের বন?
হায়, উৎসব!
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকতে চেয়েছি
(অন্ধকার - অগ্রন্থিত কবিতা)
কিংবা,
দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়-
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।
(সুচেতনা - বনলতা সেন)
কিংবা,
হলদে পাতার মতো আমাদের উড়াউড়ি-
(জীবন - ধূসর পান্ডুলিপি)
কিংবা,
মিনারের মতো মেঘ সোনালী চিলেরে তার জানালায় ডাকে
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
নরম জলের গন্ধ দিয়ে নদী বার বার তরীটিরে মাখে
(মৃত্যুর আগে - ধূসর পাণ্ডুলিপি)
কিংবা,
চিলের কান্নার মতো শব্দ ক’রে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের ঘুম
গাঢ় ক’রে দিয়ে যায়।
(আবহমান - শ্রেষ্ঠ কবিতা)
কিংবা,
বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে
(হায় চিল - বনলতা সেন)
কিংবা,
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
(বনলতা সেন - বনলতা সেন)
এমন ইন্দ্রয়ঘন বা চিত্রধর্মী শব্দ জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে দান করেছে অবয়বত্ব। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন- ’চিত্ররূপময়’। সত্যি! জীবনানন্দের কবিতা ইমপ্রেশনিস্টদের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ইমপ্রেশনিস্টদের কাজ হলো - যে দৃশ্য শিল্প আঁকছেন তা যেন তিনি এক ঝলকে দেখে নিয়ে রং আলো, ছায়া যেমনটি দেখেছেন তেমনটি এঁকে বসিয়ে দিতে চান। এজন্যই ছবিগুলোর খণ্ডাংশের কোনে অর্থ হয় না - সব মিলিয়ে একটা সামগ্রিক আবেদন সৃষ্টি করাই এর লক্ষ্য। জীবনানন্দের কাব্যের স্বরূপটিও তাই। তাঁর কবিতা পড়লে ছেঁড়া-ছেঁড়া রেখার টানের মতো কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে - কিন্তু পুরো কবিতা পাঠ শেষে সেই রেখাগুলি এক জায়গা জড়ো হয়ে পৌঁছে দেয় অর্থের উপকূলে। ফরাসী ইমেজিস্টদের মতো শব্দ - শব্দের বুননে চমৎকার সব প্রাকৃতিক ছবি এঁকেছেন। চারপাশের পরিচিত শব্দ তাঁর কবিতায়-কলমে চিত্রকল্পের স্বাদ ঘ্রাণ নিয়ে শব্দের অন্তরঙ্গ বর্ণনায় মেতে উঠেছে। শব্দকল্প দিয়ে তিনি উপমা উৎপ্রেক্ষার ছবি খুঁজেছেন বলে তাঁর কবিতার আবেদন আমাদের মগজ থেকে রক্তের গভীরে পৌঁছে যায়। ইমপ্রেশনিস্টদের মতো সাধারণ বলে কোনো বস্তুকে তিনি অবহেলা করেননি, বরং তার প্রতি তীব্র আর্কষণ অনুভব করেছেন। ‘হলুদ নদীর নরম হাওয়া’, ‘শিশিরের শব্দের মতোন সন্ধ্যা নেমে আসা’, ‘ধানের গন্ধের মতো লক্ষ্মীপেঁচা’ এরকম দেশজ এবং গদ্যগন্ধী শব্দ এত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন যে তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে অতি অসাধারণ। তাঁর ’মাঠের গল্প’, ‘ঘাস’, ‘বেড়াল’, ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
হলুদ পাতার ভিড়ে ব’সে,
শিশিরে পালক ঘ’ষে-ঘ’ষে,
পাখার ছায়ায় শাখা ঢেকে,
ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি দেখে-দেখে
মেঠো চাঁদ আর মেঠো তারাদের সাথে
জাগে একা অঘ্রাণের রাতে
সেই পাখি;
(পেঁচা - ধূসর পাণ্ডুলিপি)
কিংবা,
কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভ’রে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;
কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস-তেমনি সু-ঘ্রাণ-
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে।
আমারো ইচ্ছে করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে-গেলাসে পান করি,
এই ঘাসের শরীর ছানি-চোখে চোখ ঘষি,
ঘাসের পাখনায় আমার পালক,
ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার
শরীরের সুস্বাদু অন্ধকার থেকে নেমে।
(ঘাস - বনলতা সেন)
কিংবা,
সারাদিন একটা বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলই আমার দেখা হয় :
গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে;
কোথাও কয়েক টুকরা মাছের কাঁটার সফলতার পর
তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর
নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হ’য়ে আছে দেখি
কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে,
সারাদিন সূর্যের পিছনে পিছনে চলেছে সে।
একবার তাকে দেখা যায়,
একবার হারিয়ে যায় কোথায়।
হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান রং-এর সূর্যের নরম শরীরে
সাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে;
তারপর অন্ধকারকে ছোটো ছোটো বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনলো সে
সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিলো।
(বেড়াল - ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এ কবিতায় জীবনানন্দ ‘শিশিরে পালক ঘ‘ষে’, ‘ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি’, ‘নরম সবুজ আলোয়’, ‘ঘাসের শরীর’, ‘রোদের ভিতর’, ‘মাটির কঙ্কাল’, এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর একটি উক্তি স্মরণীয়ঃ ‘ ছবি আঁকতে তার নিপুণতা অসাধারণ। তার উপর ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয় গন্ধের ও সপর্শেরও বটে, বিশেষভাবে গন্ধের ও সপর্শের। ‘ বনলতা সেন কাব্যে- ‘ দুজন’ কবিতার উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষকার হয়ে ধরা দিবে।
এই বলে ম্রিয়মান আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে
উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রহিল হাঁটুভর।
হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাটা বিঁধে আছে, এলোমেলো আঘ্রাণের খড়
চারিদিকে শূন্য থেকে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর।
(দুজন - বনলতা সেন)
‘ম্রিয়মান আঁচল’, ‘উদ্বেল কাশবন’, ‘ হাঁটুভর’, ‘ আঘ্রাণের খড়’, ‘ ছুঁয়ে ছেনে’, প্রভৃতি গদ্যগন্ধী শব্দ ইন্দ্রিয়ঘনত্ব তথা চিত্রধর্মিতা জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে পৌঁছে দিয়েছে মননের গভীরে। শুধু তাই নয় ‘ ধূসর গন্ধ’, ‘ ঘুমের ঘ্রাণ’, ’ঝিঝির গন্ধ’, ‘ নরম জলের গন্ধ দিয়ে নদীর তীরকে মাখে’, ‘ প্রান্তরের সবুজ বাতাস’ এরকম শব্দ বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ানুভূতি স্থান পরিবর্তন করে এক নিবিড় ইন্দ্রিয়ঘনতা সৃষ্টি করেছে। কিংবা ‘ অবসরের গান’, ‘ নগ্ন নির্জন হাত’, ‘ হাওয়ার রাত’ এসব কবিতাতেও শব্দমাত্রা পেয়েছে এক বিশিষ্ট রূপ, পাশাপাশি দৃশ্য, সপর্শানুভূতি, ইতিহাস চেতনার মিশ্রনে ইন্দ্রিয়ঘনতা দানা বেঁধেছে। যেমন :
আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লই - নুয়ে আছে নদীর এ-পারে
বিয়োবর দেরি নাই - রূপ ঝ’রে পড়ে তার -
শীত এসে নষ্ট ক’রে দিয়ে যাবে তারে;
আজো তবু ফুরায়নি বৎসরের নতুন বয়স,
মাঠে-মাঠে ঝরে পড়ে কাঁচা রোদ-ভাঁড়ারের রসে।
... ... ... ...
ফলন্ত মাঠের ’পরে আমরা খুঁজি না আজ মরণের স্থান
প্রেম আর পিপাসার গান
আমরা গাহিয়া যাই পাড়াগাঁর ভাঁড়ের মতন;
ফসল-ধানের ফলে যাহাদের মন
ভ’রে উঠে উপেক্ষা করিয়া গেছে সাম্রাজ্যরে, অবহেলা ক’রে গেছে
পৃথিবীর সব সিংহাসন-
(অবসেরর গান - ধূসর পাণ্ডুলিপি)
কিংবা,
আমার হৃদয় পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে গেল,
নীল হাওয়ার সমুদ্রে স্ফীত মাতাল বেলুনের মতো গেল উড়ে,
একটা দূর নক্ষত্রের মাস্তুলকে তারায়-তারায় উড়িয়ে নিয়ে চললো
একটা দুরন্ত শকুনের মতো।
(হাওয়ার রাত - বনলতা সেন)
জীবনানন্দ দাশ শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতে কবিতায় রূঢ় বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে ভালবাসতেন। যে কাজটি সাধারণত ইমপ্রেশনিস্টরা করে থাকেন। যেখানে একটি বিষয়েকে তুলে ধরে অন্য একটি বিষয়কে সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয় ঠিক আলোছায়ার মতো। ’ক্যাম্পে’ এমনই একটি কবিতা।
ক্যাম্পের বিছানায় রাত তার অন্য এক কথা বলে;
যাহাদের দোনলার মুখে আজ হরিণেরা ম’রে যায়
হরিণের মাংস হাড় স্বাদ তৃপ্তি নিয়ে এলো যাহাদের ডিশে
তাহারাও তোমার মতন;
ক্যাম্পের বিছানায় শুয়ে থেকে শুকাতেছে তাদেরো হৃদয়
কথা ভেবে - কথা ভেবে - ভেবে।
এই ব্যথা - এই প্রেম সব দিকে র’য়ে গেছে-
কোথাও ফড়িঙে-কীটে-মানুষের বুকের ভিতরে,
আমাদের সবের জীবনে।
বসন্তের জ্যোস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো
আমরা সবাই।
(ক্যাম্পে - ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এ কবিতায় নম্্র নীল জোসনায় মিলনাতুর হরিণ ও হরিণীর কামনার রূপটিকে শব্দের এমনই এক মেলবন্ধনে ফুটিয়ে তুলেছেন যে আমাদের আর বুঝতে বাকী থাকেনা সেই হরিনেরই স্বাদু মাংশ শিকারীদের ডিশে পরিবেশিত হয়েছে।
কবিতায় যেমন ফিউচাররিজম, মডার্নিজম, ইমেজইজম, ভার্টিইজম, রোম্যানিটসিজম অনেক শব্দ আছে - যা কবিতার বিভিন্ন সময়, বাঁক পরিবর্তন ও ঘটনার উল্লেখ করে। তেমনি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ব্যবহৃত এক একটি শব্দ মুহূর্তে আমাদেরকে নিয়ে যায় ভাবনার-ইতিহাসের-সময়ের খেরো পিঠে। ইতালীয় কবি ফিলিপ্পো আরিনোত্তির হাত ধরে প্রথম সূচিত হয় ফিউচারইজম। সেটাও ১৯০৯ সালে। এরপর ১৯১১ সালে মেক্সিকোর কবি এনরিক গনজালেজ মার্টিনেজ ল্যাটিন আমেরিকান প্রেক্ষিতে পৌঁছে যান পোস্ট মডার্নিজমে। তিনি সবসময়ই চাইতেন ফরাসি কাব্যনুগামিতা থেকে বের হয়ে মেক্সিকোর আধুনিক কবিতা নিজের কথা ভাবুক এবং বলুক। আমাদের জীবনানন্দ দাশও মনে হয় তেমনটিই ভাবতেন। তা না হলে বাংলা আধুনিক কবিতায় রোম্যান্টিসিজম যার হাতে পরিপূর্ণতা পেলো সেই রবীন্দ্রধারা থেকে বের হয়ে কবিতাকে তার সাধারণ গন্তব্যে পথ দেখানোর এত দুঃসাহস কারো ছিল না। এবং তিনি সেই কাজটিই করলেন; তাও করলেন সকল অনামী সমালোচকদের সমালোচনা উপেক্ষা করে। যে আধুনিক কবিতা তা আধুনিক থেকে আরো বেশি আধুনিক এবং আজ অবধি তা হচ্ছে; এর সূচনা এবং কীর্তি জীবনানন্দ দাশের প্রাপ্য। তাই তাঁর কবিতা অনেক বেশি প্রতীকী। ফিউচাররিস্টরা যেমন যন্ত্রের সাথে কবিতার কথা বললেও যন্ত্রকে মেদুরতায়, পেলবতায় জুড়ে দেন কবিতায়। মানুষকে, মানুষের মন, প্রেম, ভালবাসা, ঘৃণা, জীবনের আপাত নির্ভর বিষয়-আশয় কিংবা জীবনের ঘটনার বিপরীতে বা সমান্তরালে স্থাপন করে উপলব্ধি করা প্রতীকী প্রক্রিয়ার কাজটি করে থাকেন ফিউচাররিস্টরা। জীবনানন্দ দাশও ঠিক সেই কাজটি করে গেছেন কবিতায়। তাঁর ‘ যেইসব শেয়ালেরা’ কবিতাটি পড়লে ফিউচারিস্টরা যে কাজ করে থাকেন সেই কথা মনে পড়ে যায়।
যেইসব শেয়ালেরা-জন্ম জন্ম শিকারের তরে
দিনের বিশ্রুত আলো নিভে গেলে পাহাড়ের বনের ভিতরে
নীরবে প্রবেশ করে, বার হয়, - চেয়ে দেখে বরফের রাশি
জ্যোৎস্নায় প’ড়ে আছে; -উঠিতে পারিত যদি সহসা প্রকাশি
সেইসব হৃদযন্ত্র মানবের মতো আত্নায়ঃ
তাহ’লে তাদের মনে যেই এক বিদীর্ণ বিস্ময়
জন্ম নিতো;- সহসা তোমাকে দেখে জীবনের পারে
আমারো নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে।
(যেইসব শেয়ালেরা - সাতটি তারার তিমির - অগ্রন্থিত কবিতা-প্রকাশিত অপ্রকাশিত কবিতা সমগ্র - আব্দুল মান্নান সৈয়দ সংকলন ও সম্পাদিত)
এখানে শেয়ালেরা হতমান পঙ্গু মানুষের প্রতীক। যারা শিকারের খোঁজে নিশ্চিদ্র তারার পথে মৃত জোসনার বীভৎসতায় নানান গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথবা ‘ বুনো হাঁস’ কবিতা।
মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা স্যানালের মুখ;
উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জ্যোস্নায় নীরবে উড়ুক
কল্পনার হাঁস সব পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রং মুছে গেল পর
উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোস্নার ভিতর।
(বুনো হাঁস - বনলতা সেন)
এ কবিতায় ‘ হাঁস’ তথা ‘ বুনো হাঁস’। যা কবি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই যে প্রতীকী শব্দ-শব্দের ব্যবহার এসবই জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে জাদুর মতো আর্শ্চয করে তুলেছে। শব্দ চয়ন সম্বন্ধে শুচিবায়ু পরিহার করে কাব্য সীমানাকে অনেকখানি বিস্তৃত করে দিলেও কোন শব্দটি কিভাবে বসালে ভারসাম্য বিনষ্ট হবে না, রসনৈচিত্য দোষ ঘটবে না সে সম্বন্ধে জীবনানন্দের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। যোগ্য জহুরীর মতো তিনি শব্দগুলির রুক্ষতা ও অশালীনতা মসৃণভাবে পালিশ করে দিতেন শুধু সুষ্ঠু বিন্যাসের গুণে।
বিশ্লেষণ ব্যবহারেও তিনি দেশজ শব্দ প্রয়োগ করেছেন, যথা- ‘ মেঠো চাঁদ’, ‘ মরখুটো কানা’, ‘ ছাতা কুড়ো’ ইত্যাদি। বিশেষণে তৎসম শব্দের প্রয়োগই আধুনিক কবিরা বেশি করেছেন চলিত ক্রিয়াপদের সঙ্গে বৈপরীত্য দেখাবার জন্যে। জীবনানন্দ তাতেও নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তিনি মৌখিক ভাষায় প্রচলিত তৎসম শব্দেরও ব্যবহারজাত মালিন্য ঘুচিয়ে তাতে কাব্যের সপন্দন তিনি এনেছেন। যেমন ‘ তিলোত্তমা নগরী’, ‘ রূঢ়’, ‘ রৌদ্র’, ’নীলিমা’ ইত্যাদি।
ক্রিয়ার ব্যবহারে আধুনিক কবিরা যে চলিত ভাষা প্রয়োগ করেছেন তা নয়, তার সম্পূর্ণ রূপ প্রয়োগের ও পক্ষপাতী জীবনানন্দ। ক্রিয়ার অপভ্রংশ ব্যবহারে আধুনিক কবিরা বিরোধী। জীবনানন্দের নৈপুণ্য এ বিষয়ে অবিসংবাদিত। যেমন-
জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়
এইসব ছুঁয়ে ছেনে।
মানুষের কাছে মানুষের দাবী রয়ে গেছে মনে ভেবে হৃদয়ে কুয়াশা
করুণ প্রশ্নের মত খেলা ক’রে গেছে ঢের দিন।
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে।
কিংবা গ্রাম্য ক্রিয়ার ব্যবহার
হয়তো চেঙ্গিস আজো বাহিরে ঘুরিতে আছে
করুণ রক্তের অভিযানে।
শব্দের যাদুতে আর্শ্চয বাতাবরণ তৈরীর এই ক্ষমতা যার সংক্রমনশীলতা অধিকার করে রয়েছে সুদীর্ঘ দিন ধরে পাঠক চিত্তে তা ভুলবার নয়। শব্দে শব্দে এই যে আবহ তৈরীর ক্ষমতা, এই যে অদ্ভূত বাতাবরণ তৈরীর কুশলতা তার রেশ বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যায় পাঠককে। যেমনঃ
জোৎস্নারাতে বেবিলনের রানীর ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার
শালের মতো জ্বল জ্বল করছিলো বিশাল আকাশ!
কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিলো।
সিংহের হুংকারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্্র জেব্রার মতো।
অথবা,
পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে,
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দুজনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হ’য়ে আকাশে আকাশে।
শব্দে শব্দে কথা বলবার এই ঢঙ, শব্দ ম্যাজিক দিয়ে নিজস্ব পরিবেশ তৈরী করার ক্ষমতা; সাধু ক্রিয়াপদের ব্যবহার, দেশজ, অন্তজ তৎসম শব্দের চমৎকার প্রয়োগ-এই শব্দরুচি ও বাকরীতির নির্মানই কবি সত্তাকে সবার থেকে আলাদা এক কবি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল পাঠক সামনে। তাই হাজার ভিড়ের মধ্যে থেকে তাঁকে চিনে নিতে আমাদের একটুও কষ্ট হয় না। মধুসূদন দত্ত যেমন ‘ শব্দে শব্দে বিয়া’ সনেটে শব্দ নিয়ে খেলা করেছেন-
হে কবি - কবে কে মোরে? ঘটকালি করি
শবদে শবদে বিয়া দেয় যে জন
সেই কি সে যম-যমী?
সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী
যার মন : কমলেতে পাতে আসন, ...
অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;
নন্দন কানন হতে যে সুজন আনে
পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;...
অর্থাৎ শবদে শবদে বিয়া দেয় যে জন তাঁকে তিনি কবি বলে মানতে রাজি নন। তাঁর মতে যাঁর মনে আছে কল্পনার অলৌকিক আলো, তিনিই কবি। শব্দের সাথে কল্পনার রুপ বৈচিত্রের বুননই কবিতা। জীবনানন্দ দাশ সেই বুননের কাজটি বরিশালী বাকরীতির কাব্যিক ভঙ্গিমায় ভালোই প্রয়োগ করেছেন। পাশাপাশি কবি প্রসিদ্ধির অনুসরণ না করেই অতিচলিত, গ্রাম্য, দেশজ কিংবা মাঝে মাঝে ইংরেজী শব্দ নিয়ে তিনি এমন একটি নিজস্ব শব্দ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন যা বাংলা ভাষার এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে এবং আছেও।
জীবনানন্দ শুধু দেশজ শব্দ নয়; বিদেশী শব্দ বা ইংরেজী শব্দ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে রচনার আদর্শ সৃষ্টি করেছেন। ফররুখ আহমেদের কবিতায় যেমন ‘ হামমাম’ শব্দের দেখা পাই তেমনি তাঁর কবিতায় বিদেশী শব্দ দান করেছে এক বিশিষ্ট মাত্রা। যেমন-
পিপুল বনের ঝাঁঝালো হাওয়ায়
চোখে যেন ঘুম নামে
নামে নির্ভিক সিন্ধু ঈগল দরিয়ার হামমামে।
আর জীবনানন্দ - তিনি বাংলার চিরচেনা রূপ নিয়ে লিখলেন ‘ শিকার’ কবিতা। যেখানে ‘ আতা’, ও ‘ নোনা’ পর্তুগীজ থেকে আমদানি করা। অথচ মনেই হয় না এটা বিদেশী শব্দ। যেমনঃ
আকাশের রঙ ঘাসফড়িঙের মতো
কোমল নীল; চারিদিকে আতা ও নোনার গাছ
টিয়ার পালকের মতো সবুজ।
একটি তারা এখনো আকাশে আছে
পাড়া-গাঁর বাসর ঘরের
সবচেয়ে গোধূলীমদির মেয়েটির মতো।
(শিকার - বনলতা সেন)
জীবনানন্দের শব্দ বিন্যাস কখনো তাঁর বক্তব্যকে চমক সৃষ্টির জন্য অতিক্রম করে না। ব্যক্তিগত ব্যাথা প্রকাশের জন্য ‘ ধুসর পাণ্ডুলিপি’তে তিনি ব্যবহার করেছেন দেশজ শব্দ। আর বিশ্বগত ব্যথা প্রকাশের জন্য ‘ সাতটি তারার তিমির’ ‘ অনেক আকাশ’, ‘ জীবন’ কবিতা অথবা ‘ শিকার’। যেখানে বত্রিশটি পঙক্তির মধ্যে ‘ মতো’ শব্দের ব্যবহার দেখানো হয়েছে তোরোবার। কোনো কবি প্রসিদ্ধির অনুসরণ না করে সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ থেকে দেশজ শব্দ দিয়ে এমন সৃষ্টি বলেই জীবনানন্দের দ্বারাই সম্ভব। তাঁর উপমাগুলি শব্দের খেলায় মেতে উঠে এমন এক গভীর জীবনদর্শনকে ব্যক্ত করছে যে উপমাগুলি কেবল চিত্র নয়, চিন্তা। তাঁর এ উপমা তুলনাগত নয়, মনগত। যেমন :
‘ বলেছে সে এতদিন কোথায় ছিলেন?
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’।
অথবা,
আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;
বলেছিলো : ‘ এ নদীর জল
তোমার চোখের মতো ম্লান বেতফল :
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এ নদী তুমি।’
‘ এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।
(সে - শ্রেষ্ঠ কবিতা)
কবির কাজ হলো শব্দ ও বাক্য নিয়ে। উপযোগী শব্দের যথাস্থানে সংস্থানই ভাল গদ্য-সর্বাপেক্ষা উপযোগী শব্দের যথাস্থানে সংস্থানই ভাল পদ্য। শব্দ এবং শব্দ সমষ্টি বাক্যের সঠিক উপযোগিতা পায় ব্যঞ্জনায়। অর্থাৎ শব্দ এবং বাক্যের আভিধানিক অর্থের অতিরিক্ত আভাসে। গদ্যের পক্ষে তা অতিমাত্র - কিন্তু কাব্যের ক্ষেত্রে এটাই প্রাঞ্জল বিবৃতি। তৎপক্ষে পরিমার্থ শব্দ এবং বাক্য আবশ্যক। শব্দের আর একটি শক্তি প্রকৃতির সৌন্দর্যে যে অব্যক্ত ইন্দ্রজাল বা মোহিনী আছে, তাকে প্রতিফলিত করা। এই অব্যক্ত ইন্দ্রজালকে ভাষায় আয়ত্ত এবং ব্যক্ত করাই কবির কাজ। একটি ভাবের জন্য একটি বিষয়ের অঙ্কন-উপযোগী একটি মাত্র অদ্বিতীয় - যার সংসপর্শে প্রণয়িনীর চুম্বনের ন্যায় ভাব জেগে ওঠে।
কবিকে সবসময় তৈরী করতে হয় নতুন এক ভাষা, শব্দের যথাযথ ব্যবহার, পুরাতন শব্দালংকারের অভিনব এক প্রয়োগ, যার দ্বারা নতুন এক যোগাযোগ স্থাপিত হবে কবি ও সহৃদয় হৃদয় সংবাদীর। আর জীবনানন্দ ঠিক সেই কাজটি করলেন - শিল্পের দক্ষ নিপুণ কারগিরের মতো - যা ঐ প্রনয়িনীর চুম্বনের ন্যায় মনের মধ্যে ভাব জেগে ওঠে।
শেষে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ভাষায়-“অন্তরের গহন গোপন মহারহস্য আবিষকার করতে হলে মাঝে মাঝে এসে বসতে হয় সমুদ্রের তীরে কিংবা খোলা আকাশের নিচে। আমাদের জীবনানন্দ সেই সমুদ্রতীর, সেই অনিরুদ্ধ দীপ্ত আকাশ।”
তথ্য সূত্রঃ
০১। কালের পুতুল - বুদ্ধদেব বসু (প্রথম সংস্করণ)
০২। কবিতার কথা - জীবনানন্দ দাশ-সিগনেট প্রেস।
০৩। সাহিত্যের পথে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ঐতিহ্য প্রকাশনী।
০৪। ছন্দ ও কবিতা - অমিয় চক্রবর্তী।
০৫। আধুনিক বাংলা কবিতা - আবু সয়ীদ আইযূব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (সম্পাদক)
০৬। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র - জীবনানন্দ দাশ
০৭। কল্লোল যুগ - অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (প্রথম সংস্করণ-১৩৫৭)
০৮। ময়ূখ (জীবনানন্দ দাশ সংখ্যা) - অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত।
০৯। সাহিত্য চর্চা - বুদ্ধদেব বসু (প্রথম সংস্করণ)
১০। হঠাৎ আলোর ঝলকানি - বুদ্ধদেব বসু (দ্বিতীয় সংস্করণ)
১১। তিনজন আধুনিক কবি - সঞ্জয় ভট্টাচার্য (প্রথম সংস্করণ)
১২। স্বগত - সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (প্রথম সংষকরণ-১৩৪৫)
১৩। আধুনিক বাংলা সাহিত্য - মোহামমদ মনিরুজ্জামান।
১৪। আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয় - দীপ্তি ত্রিপাঠী
১৫। আধুনিক কাব্য ও সাহিত্যের পথে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৬। আধুনিক বাংলা কবিতার ভূমিকা - বুদ্ধদেব বসু।
১৭। কাব্যের মুক্তি - সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।
অনলাইন : ১৭ এপ্রিল, ২০০৯