লিখেছেনঃ ইকবাল মাহমুদ, আপডেটঃ December 19, 2008, 12:00 AM, Hits: 6521
আমাদের মন তিন প্রকার বৃত্তির সমষ্টি মাত্র : ১. বুদ্ধি ও চিন্তাবৃত্তি যাকে আমরা ইনটেলেক্ট্ বলি। এর সাথে আমরা কল্পনাবৃত্তিকে শ্রেণীভুক্ত করতে পারি। ২. আমাদের ইন্দ্রিয়বৃত্তি যাকে আমরা প্রকৃত চিত্তবৃত্তি বলতে পারি। ৩. ইচ্ছাবৃত্তি বা বাসনা যার দ্বারা আমরা কার্য পালন করে থাকি বা পালনে উদ্বুদ্ধ হই। প্রথমটা আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাবৃত্তি, দ্বিতীয় আমাদের চিন্তাবৃত্তি এবং তৃতীয় বা শেষ কার্যকরণ বৃত্তি। যার মধ্যে এই বৃত্তিগুলি পূর্ণমাত্রায় সঞ্চারিত হয় বা স্ফূর্ত হয় সেই সর্বপ্রধান চরিত্র। চিত্তবৃত্তিই আমাদের কার্যকরণ বৃত্তির উত্তেজক। সুতরাং এই চিত্তবৃত্তি যত প্রবল হবে আমাদের ইচ্ছাবৃত্তিগুলি সেই পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। চিত্তবৃত্তি যত আত্নপর হয় সে চরিত্রের কার্য স্বার্থপর হবে এতে কোন দ্বিমত নেই। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে শিল্প সাহিত্য বা শিল্পে শিল্পীর চরিত্র চিত্রণ কী হবে? বা চরিত্র সম্বন্ধে শিল্পীর কর্তব্য কী - শিল্পের দর্শনই বা কী?
চরিত্র চিত্রণে শিল্পীর কাজ বড় সহজ নয়। চরিত্র চিত্রণে শিল্পীর এবং শিল্প নৈপুণ্যের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়। চিত্রকর যেমন প্রকৃত ঘটনা অনুকরণ করে তার প্রতিচিত্র আঁকেন, ভাস্কর যেমন এক খণ্ড শিলা খোদাই করে তাকে জীবিত মানুষে রূপদান করেন ঠিক তেমনি যথার্থ শিল্পী যিনি, তিনি স্বভাব অনুকরণ করে চরিত্রের যথার্থ চিত্র এঁকে থাকেন। এই স্বভাবের অনুকরণই শিল্পের প্রাণ, যেখানে একটু অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হলে, বিচ্যুতি ঘটলে বা ছন্দপতন হলে সমস্ত শিল্প কৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়। চিত্রকর বা ভাস্করের কাজ সহজ। কেননা তাঁরা একটি বিশেষ সময়ের, বিশেষ ঘটনার, বিশেষ অবস্থার ছবি আঁকেন মাত্র। ছবিতে যে বিষয়ের অবতারণা করা হয় তা পরিষকার হয়ে উঠে ঠিকই, কিন্তু সে সত্য, সে চিত্র দেশ, কাল, পাত্র সম্বন্ধে একটা সঙ্কীর্ণ ধারণার জন্ম দেয় মাত্র।
শিল্প সৃষ্টি বিষয়ে টলস্টয় ’শিল্পতত্ত্ব’ বিষয়ক রচনাবলীতে সুন্দর বর্ণনার অবতারণা করেছেন-“শৈল্পিক সৃষ্টি হচ্ছে এমন এক মানসিক ক্রিয়া যা অসপষ্টভাবে ইন্দ্রিয়গোচর অনুভূতিকে সপষ্ট করে তোলে যে অনুভূতি অন্য মানুষদের মনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ’সৃষ্টি’-র এই প্রক্রিয়া সকল মানুষের মধ্যেই বর্তমান। কাজেই আমরা প্রত্যেকই অন্তরের অভিজ্ঞতা দ্বারা তা উপলব্ধি করতে পারি। তার সংঘটন বর্ণনা করা যায় এভাবে : কোনো ব্যক্তি হঠাৎ হয়তো এমন কিছু কল্পনা বা অসপষ্টভাবে উপলব্ধি করে বসেন যা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন, অপরিচিত ও অমৃত বলে মনে হয়। এই নতুন বিষয়টি তাঁর মনে গভীর আলাড়ন সৃষ্টি করে, এবং তিনি সেই উপলব্ধিকে সাধারণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অন্যদের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এই প্রয়াসের এক পর্যায়ে বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন যে, তাঁর কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়, তাঁর শ্রোতাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও নতুন। তিনি তাঁদের কাছে যে বিষয়টির কথা বলেন, তা তাঁরা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। অন্যদের থেকে এই বিচ্ছিন্নতা, বৈসাদৃশ্য, বা যাকে বলা হয় অমিল তা প্রথমে তাঁকে পীড়া দেয়, এবং তিনি নিজের উপলব্ধির সত্যতা আরও গভীরভাবে যাচাই করে পুনরায় চেষ্টা করেন, যা তিনি দেখেছেন, অনুভব করেছেন কিংবা উপলব্ধি করেছেন, তা অন্য কোনো উপায়ে অন্য মানুষদের কাছে প্রকাশ করতে। কিন্তু দেখতে পান, এই লোকেরাও তাঁর ইপ্সিত বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিংবা তিনি তা যেভাবে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন সেভাবে তাঁরা তা উপলব্ধি বা অনুভব করেন না। তখন ঐ ব্যক্তি এমন কিছু আত্নসন্দেহের দ্বারা পীড়িত হন যে, হয় তিনি যা কল্পনা করেছেন বা অসপষ্টভাবে অনুভব করেছেন তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, নতুবা বাস্তব অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্যেরা তা দেখতে কিংবা অনুভব করতে পারছেন না। এই সন্দেহের অবসান-কল্পে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করেন তাঁর উদ্ভাবনকে এমন সপষ্টতা দান করতে যেন তাঁর উপলব্ধ বিষয়ের অস্তিত্ব সর্ম্পকে তাঁর নিজের কিংবা অন্যদের সামান্যতম সন্দেহও না থাকে। যখন এই সপষ্টতাদান সমাপ্ত হয় এবং ঐ ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে, তিনি যা দেখছেন, উপলব্ধি করছেন বা অনুভব করছেন, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি নিজে সম্পূর্ণভাবে নিঃসন্দেহ, তখনই দেখা যায় অন্যেরাও তা তাঁরই মতো করে উপলব্ধি বা অনুভব করতে পারছেন। তাঁর নিজের কাছে ও অন্যদের কাছে যা অসপষ্ট, দুর্বোধ্য ও রহস্যময় ছিল, তাকে নিজের ও অন্যদের কাছে সপষ্ট ও সন্দেহাতীত করে তোলার এই প্রয়াসই হল মানুষের আত্নিক সৃষ্টি প্রবাহের সাধারণ উৎস। শিল্পকর্ম বলে যাকে আমরা অভিহিত করি, যা মানুষের মনের দিগনতকে প্রসারিত করে এবং ইতঃপূর্বে অনুভূত ও অগোচর বিষয়কে মানুষের অনুভূতি ও গোচরের মধ্যে নিয়ে আসে, তারও উৎস এই প্রয়াস। শিল্পীর কাজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত, আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রহীতার অনুভূতিও সর্ম্পকশীল। গ্রহীতার অনুভূতির উৎস রয়েছে অনুকরণ-প্রবণতায় - কিংবা আরও সপষ্ট করে বললে বলতে হয় সংক্রমিত হবার ক্ষমতার মধ্যে - এবং সেইসঙ্গে এক ধরনের সমেমাহনের মধ্যে। এই সমেমাহনকে বলা যায় শিল্পীর সেই প্রবল শক্তি, যা তাঁর নিজের মনের অসপষ্টভাবে উপলব্ধ বিষয়কে সপষ্টতা দিয়ে ও সংশয়কে দূর করে শৈল্পিক সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে গ্রহীতার নিকট পৌঁছে দেয়। প্রকাশিতব্য বিষয় যখন শিল্পীর কাছে এতখানি সপষ্ট হয়ে ওঠে যে তিনি তা অন্যের মনের মধ্যে সংক্রমিত করতে সক্ষম হন, এবং সৃষ্টির মুহূর্তে তিনি নিজে যা অনুভব করেছিলেন গ্রহীতার হৃদয়েও ঠিক তাই জাগিয়ে তুলতে পারেন, তখনই একটি শিল্পকর্ম সমাপ্ত হয়।”
সুতরাং বলা যায় যে শিল্প হলো একপ্রকার মানবিক ক্রিয়া। কোনো মানুষ নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন, এবং তা যখন কতকগুলো বাহ্যিক সঙ্কেতের সাহায্যে সচেতনভাবে সেই অনুভূতিকে, উপলব্ধিকে অন্যদের মধ্যে বিতরণ করেন এবং অন্যেরা সেই উপলব্ধি ও অনুভূতি দ্বারা সংক্রমিত হয়ে একই উপলব্ধি বা অনুভূতি লাভ করেন তখনই শিল্প সার্থক এবং তাই-ই শিল্পের দর্শন হওয়া উচিত।
যিনি প্রকৃত শিল্পী তিনি কোন বিশেষ অবস্থা, বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র আঁকেন না - দেশ-কাল-পাত্র সম্বন্ধে সঙ্কীর্ণ নয় এমন অনেক ঘটনা তাঁকে আঁকতে হয় - সেই বিষয়ের পরসপর সম্বন্ধে বুঝতে হয় - তাঁদের পরসপর ফলাফল নির্ণয় করতে হয়। বাস্তব জীবনে সব মানুষের মনেই সুন্দর-কুৎসিত, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, মঙ্গল-অমঙ্গল, শ্রেয়-অশ্রেয়, শুভ-অশুভ, কল্যাণ-অকল্যাণ, উচিত-অনুচিত, হিত-অহিত, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদি নানাপ্রকার প্রশ্ন জাগে। শিল্পী মনেও একই ঘটনা ঘটে এবং ঘটা স্বাভাবিক। এইসব প্রশ্ন তাড়িত হলে মানুষের মনে দেখা দেয় বিপরীতমুখী প্রবণতার টানাপোড়েন, সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। এবং শিল্পীদের মনে এ দ্বন্দ্ব বেশি ঘটে। কেননা যে সমাজে শিল্পী বাস করেন সে সমাজ দ্বন্দ্বমূলক এবং একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে বিভক্ত। শিল্পী মনের এই মানস দ্বন্দ্ব কী রকম বা কেন এটা মানুষের মধ্যে ঘটে তা ফ্রয়েডীয় ব্যক্তিত্ব কাঠামো মতবাদের কিছু অংশ উদ্ধৃত করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে-
ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্বে তিনটি সত্তার অস্তিত্ব কল্পনা করেছেন : একটি হল ব্যক্তির ‘আদিসত্তা’, দ্বিতীয়টি ‘বাস্তবসত্তা’ আর শেষটি হল ‘নৈতিকসত্তা’। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলো হল যথাক্রমে অদস্ (ID) , অহম্ (Ego)এবং অতিঅহম্ (Super Ego)। মানুষের জীবনে এই তিনটি সত্তার প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। অদস্ বা আদি সত্তার প্রভাবে মানুষ সর্বাদা সুখভোগ করতে চায়, সবরকমের জৈবিক কামনা চরিতার্থ করতে চায়। এই সত্তার মূলনীতি হল সুখ পাওয়া ও দুঃখ এড়িয়ে চলা। এর কোন সম্ভব-অসম্ভব বিচার নেই-নীতিজ্ঞান নেই। ব্যক্তির বাস্তবসত্তা বা অহম্ এর কাজ হল আদি বা জৈবিক সত্তার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির সমন্বয় সাধন। আদি সত্তার বাসনাকে সে বাস্তবের নিরিখে বিচার করে দেখে, দেখে-এগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব কি অসম্ভব। আমাদের ঐচ্ছিক ক্রিয়াকলাপের উপর অহম্-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। তাই অদস্-এর চাহিদা প্রকাশ মাত্র তা কার্যকর হয় না। অহম্ যদি মনে করে পরিস্থিতি অনুকূল আছে তাহলে কামনাগুলো প্রকাশ করে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়; আর পরিবেশ প্রতিকূল হলে কামনাগুলোকে দাবিয়ে রাখে কিংবা মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি সর্ম্পকে অহম্-এর এই বোধ আসে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। পারিপার্শ্বিক জগত থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সে যে সমস্ত বিষয় প্রত্যক্ষ করেছে, উচ্চতর মানসিক প্রক্রিয়াসমূহের দ্বারা এগুলোর যেভাবে মূল্যায়ন করে সেই প্রেক্ষাপট থেকেই বাস্তব পরিস্থিতি সর্ম্পকে ধারণা নেয়। অহম্ এর উপর একটি গুরুদায়িত্ব হল সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করা। তাই যে সমস্ত কামনা চরিতার্থ করতে গেলে বিপদের সম্ভাবনা, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অহম্ সচেষ্ট থাকে।
জন্মের সময়ে মানুষের কোন নীতি থাকে না, শিশু আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে এবং বাপ-মা, আত্নীয়স্বজন, শিক্ষক, শুভাকাঙ্খী, ধর্মগুরু এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সংশ্রবের মধ্য দিয়ে তার মধ্যে ক্রমে ন্যায়-অন্যায় বোধ বা নীতিবোধ বিকশিত হয়। এই নীতিবোধের বিকাশ ব্যক্তিসত্তায় একটি নবতর সংযোজন। কোন কিছু করা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অহম্ পূর্বের স্তরে শুধু পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার কথা ভাবে, এখন তার সাথে আর একটি জিনিস যোগ হয়, সেটা হল নীতিবোধ। এই তৃতীয় সত্তাটিই হল অতি অহম্ বা নৈতিক সত্তা। ব্যক্তির এই সত্তা যদিও বয়সে অন্যগুলোর তুলনায় নবীন কিন্তু আচরণে সে প্রবীন। এর দায়িত্ব হয় ন্যায়পালের। সে অহম’কে সব সময় উপদেশ দেয় ভালো কাজ করতে আর মন্দ কাজ না করতে। সাধারণভাবে এই তৃতীয় সত্তাকে আমরা বিবেকের আধার বলে মনে করতে পারি। যা হোক, এই অতি অহম্-এর প্রভাবে অহম্ মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে। তবে জীবনে সবসময় যে এই নৈতিকসত্তার আদেশ নিষেধ মেনে চলা হয় তা নয়; এর নির্দেশ মানতে অহম্ বাধ্য নয়। কখনও অহম্ জৈবিক সত্তার আবদার রক্ষা করে, কখনও নৈতিক সত্তার নির্দেশ মেনে চলে, আবার কখনও দুয়ের মধ্যে আপোস রক্ষা করে করে চলে।
মূলত মানুষের মনে এই দ্বৈতাদ্বৈতের দ্বন্দ্ব সব সময় চলতে থাকে। কেননা মানুষ এটা জন্মগতভাবে পেয়ে থাকে। শিল্পীর ভিতরের এই ক্রিয়াশীল দ্বন্দ্ব- শিল্পের বাস্তব সত্য ও মিথ্যাকে যা তাই করতে শেখায়। সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী যিনি তিনি সর্বকালের, সবদেশের এবং সার্বজনীন এক নতুন সংসার সৃষ্টি করেন এই ক্রিয়াশীল দ্বন্দ্বের মাধ্যমে। শিল্পীর সৃষ্টি এই নতুন জগৎ প্রকৃত সংসারের অনুকরণে হওয়াও অবশ্য কর্তব্য। সৎ, অসৎ, ভাল, মন্দ, সুনীতি, দুর্নীতি কিছুই তিনি দেখবেন না। সংসারে যা পাবেন তাঁর ছবিই আঁকবেন। ছবির ভালমন্দ কিছুই তিনি বিবেচনা করতে পারবেন না। তিনি বাইরের জগতের শুধু উপরিভাগ বা আচরণ দেখে ক্ষান্ত হবেন না। তাঁকে জগতের মূল কারণের মধ্যে, সত্যের মধ্যে, অর্ন্তজগতের গূঢ়তম স্থানে প্রবেশ করতে হবে। শিল্পীর চারপাশে বিরাজমান জীবন, সমাজ, প্রকৃতি ও ঘটনাপ্রবাহ - এককথায় যাকে বলা হয় বাহ্যজগত তা তাঁর কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও অনতরেন্দ্রিয়কে, তাঁর চিত্তবৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে, তাঁর চৈতন্য ও সংবেদকে, তাঁর প্রেয়োতাড়না ও শ্রেয়োবোধকে, তাঁর স্নায়ু ও মস্তিষককে প্রতিনিয়ত নানাভাবে সপর্শ করে। জন্মসূত্রে একজন শিল্পী যে প্রকৃতি, সমাজ, মানবপরিস্থিতি ও জীবন লাভ করেন, তাতে তার মন তৃপ্ত থাকে না; তিনি কল্পনা করেন সম্ভাব্য এমন এক নতুন মানব পরিস্থিতি যেখানে মানবজীবনের মহত্তম সম্ভাবনাসমূহ সবচেয়ে ভালভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে। বহির্জগত শিল্পীর অন্তর্জগতে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে তার ফলে শিল্পীর মনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বিরাজমান বাস্তবের অতীত এক নতুন বাস্তব - এক কল্পিত বাস্তব। সাধারণ লোকে যা দেখতে পায় না, যা চিরকাল অগোচরেই থেকে যায়, সেই সব বিষয় যা শিল্পীর চোখে ধরা পড়ে - শিল্পের মাধ্যমে তার প্রকাশ ঘটাতে হবে এবং সাধারণকে দেখাতে হবে - তার যথার্থ বিষয় আশয় মানুষকে বোঝাতে হবে। যা মানুষ দেখেও দেখে না, বুঝেও বোঝে না - সেইসব বিষয়ের প্রকাশই শিল্পীর কাজ এবং শিল্পের লক্ষ্য। শিল্পের এই স্বরূপ লক্ষ্য করে গ্যেটে ইউরোপীয় চিরায়ত সৌন্দর্যতত্ত্বের অনুসরণে শিল্পকে অভিহিত করেছেন ’দ্বিতীয় প্রকৃতি’ বলে। অনন্ত প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মধ্য থেকে ইচ্ছা ও উপলব্ধি অনুযায়ী বিষয়বস্তু আহরণ করে শিল্পী মানুষের পক্ষে আনন্দদায়ক, উপভোগ্য, সুখকর, মনোরম, ইন্দ্রিয়াভিরাম, আবেদনশীল, উদ্দীপক, আলোকময় ও উন্নতজীবনের প্রেরণাদায়ক নতুন বিষয় সৃষ্টি করেন। শিল্প মানুষের আত্নার খোরাক। মানবাত্নাকে সুস্থ, বলিষ্ঠ, পরিপুষ্ট, সমৃদ্ধ ও উন্নত করে। মাক্সিম গোর্কির মতে, “বিজ্ঞানের মতোই শিল্প এক ’দ্বিতীয় প্রকৃতি’ সৃষ্টি করে; তবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য এই যে, বিজ্ঞান এই ’দ্বিতীয় প্রকৃতি’ দ্বারা বাইরে থেকে মানুষকে একান্তভাবে ঘিরে রাখে আর শিল্প মানুষের অভ্যন্তরে এই ’দ্বিতীয় প্রকৃতি’ সৃষ্টি করে।”
বহির্জগতের নানা বস্তু ও ঘটনা ইন্দ্রিয় ও স্নায়ু মণ্ডলীর মধ্য দিয়ে মানুষের মস্তিষেক প্রতিফলিত হয়। তারই ফলে সৃষ্টি হয় মানবিক অনুভূতি, উপলব্ধি, আবেগ, প্রেরণা, চিন্তা, যুক্তি, প্রজ্ঞা ইত্যাদি। মানবীয় অনুভূতি, উপলব্ধি, আবেগ, প্রেরণা, চিন্তা, যুক্তি ধাপে ধাপে নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তরে, অগভীর পর্যায় থেকে গভীর পর্যায়ে, সঙ্কীর্ণ অবস্থা থেকে বিস্তৃত অবস্থায় বিকশিত হয়। মানুষের শৈল্পিক অনুভূতিও এমনি পদ্ধতিতে নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তরে, অগভীর পর্যায় থেকে গভীর পর্যায়ে, সঙ্কীর্ণ অবস্থা থেকে বিস্তৃত অবস্থায় বিকশিত ও ব্যাপ্ত হয়।
মাও সে তুঙ তাঁর বিপ্লবী শিল্প সাহিত্য প্রবন্ধে লিখেছেন, “মানব-মস্তিষেক একটা নির্দিষ্ট সমাজের জীবনধারার প্রতিফলনের ফলে আদর্শগত রূপ নিয়ে সাহিত্য ও শিল্পকলা সৃষ্টি লাভ করে। বিপ্লবী সাহিত্য ও শিল্পকলা হচ্ছে বিপ্লবী শিল্পী-সাহিত্যিকদের মস্তিষেক জনগণের জীবনধারার প্রতিফলনের ফসল। জনগণের জীবন হচ্ছে সাহিত্য, শিল্পকলার কাঁচা উপদানের অফুরন্ত উৎস। এসব উপদান যদিও প্রাকৃত অবস্থায় অমার্জিত রূপে বিরাজ করে তবু এগুলোই হচ্ছে সবচেয়ে সজীব, সমৃদ্ধ ও মৌলিক উপাদান। এগুলোর সঙ্গে তুলনায় সকল শিল্প সাহিত্যই ম্লান। এগুলোই হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের একমাত্র এবং অফুরন্ত উৎস। কারণ এগুলো ছাড়া শিল্প সাহিত্যের আর কোন উৎস নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, বই পুস্তক তথা প্রচীনকালের ও বিদেশের শিল্প সাহিত্য কি আর একটি উৎস নয়? প্রকৃতপক্ষে অতীতের শিল্প-সাহিত্য কোনো উৎস নয়, সেগুলো এক একটা ধারামাত্র; আমাদের পূর্বসূরীরা ও বিদেশীরা নিজ নিজ স্থানের ও কালের জীবনধারায় সাহিত্য ও শিল্পকলার যে কাঁচা উপাদানের সন্ধান লাভ করেছেন, তা থেকে তাঁরা সেগুলো সৃষ্টি করেছেন।”
আমাদের সংসার-বাহ্যিক জগত বা এর চারপাশে কতকিছু অবলীলায় ঘটে যাচ্ছে - ঘটছে যা আমরা সংসারের কঠোর তাড়নায় দেখতে পাই না। শিল্পী যিনি তিনি সেইসব বিষয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। শিল্পী বা শিল্পের দর্শন কী হবে সে বিষয়ে কারলাইল-এর উক্তি স্মরণযোগ্য-“শিল্প ও সত্যের প্রভেদ নেই। যেখানে সত্যের অপলাপ, সেইখানেই শিল্পের হানি।” সত্যই শিল্পের প্রাণ। তবে কথা থাকে, সত্য কি সকলে বুঝতে পারে? যতই জগতের উন্নতি হচ্ছে সত্যগুলো মানুষের সামনে ততই সুন্দর রূপে প্রকাশ পাচ্ছে - লোকে তা বুঝতে পারছে। তবে সত্য কী? সত্য তা-ই যা থাকবে - যা দ্বারা জগতের উন্নতি হবে - উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে - মানুষকে নিজ উদ্দেশ্য পথ দেখাবে - তাই সত্য। যা সৎ এবং যার অস্তিত্ব আছে তা সত্য। যার অস্তিত্ব নেই যা আমরা দেখতে পাইনা - যা শুধুই কল্পনার বিষয় - যা কখনো মানুষকে মঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় না - যা মানুষকে নিজ উদ্দেশ্য পথ দেখায় না তা কখনো সত্য নয়। যা দেখা যায় না - যার কোন অস্তিত্ব নেই - যা শুধু কল্পনার বিষয় তা মিথ্যে। এই মিথ্যে এক শ্রেণী বুদ্ধির কারবারী ব্যবসায়ীর প্রধান বিষয়বস্তু - অযথা সময়ক্ষেপণের - মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যাবার বেসাতী বৈকি! এই সত্যগুলো যারা দেখতে পান, জগৎ তথা জগতের মানুষকে দেখাতে চেষ্টা করেন তাঁরাই প্রকৃত শিল্পী। অর্থাৎ জগতের মানুষিক প্রতিচ্ছবি যিনি এঁকে থাকেন তিনিই প্রকৃত শিল্পী। শিল্পীর কাজ হলো তিনি যে সত্য দেখবেন - সেই সত্য তিনি প্রচার করবেন - সৎ-অসৎ, ভাল-মন্দ বেছে নেবার ভার দিবেন জগৎকে। এই সংসার সৎ-অসৎ, ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সুনীতি-দুর্নীতি প্রভৃতি দ্বৈতভাবে জড়িত এইরূপ দ্বন্দ্ব দ্বারা গঠিত। শিল্পী যিনি তিনি সংসারের অনুকরণ করেন। সংসারের মধ্য প্রবেশ করে তার সত্যগুলি বেছে বেছে বের করে আনেন। সে সত্যের মধ্যে ভাল-মন্দ উভয়ই থাকতে পারে। যেভাবে থাক সেইভাবে সত্যরূপে তিনি দেখাবেন। অতএব সত্যের উপরই শিল্প নির্ভর করে। প্রকৃত শিল্পী সত্য ব্যতীত আর কিছু আঁকতে চেষ্টা করেন না। গ্যেটে একথা এক জায়গায় অতিসুন্দররূপে বলেছেন-
“In Art’s wide Kingdoms ranges,
One sole meaning, still the same,
This is truth eternal Reason,
Which from Beauty takes its dress.”
সুপ্রসিদ্ধ জার্মান কবি সিলারের মতে, “শিল্পীর কর্তব্য জগতে সত্য প্রচার করা।” শিল্পীই প্রকৃতপক্ষে জগতের শিক্ষক। কেননা প্রকৃত সত্য যা তা তিনিই প্রথমে দেখতে পান। সংসারের বাইরে এই জগতের মধ্যে যে জীবন, যে অনন্ত শক্তি নিহিত আছে শিল্পী তা কৌশলের সাথে স্বভাবকে সম্পূর্ণরূপে অনুকরণ করে জগৎকে দেখিয়ে দেন। মানুষের সত্য প্রতিচ্ছবিকে সবার সামনে ছবির মতো তুলে ধরেন - অথচ সেটা ছবি নয়। দেশ-কাল-পাত্র ও মানুষের সামগ্রিক ইতিহাসকে তুলে ধরেন। মানুষের এই সামগ্রিক তত্ত্ব অর্থাৎ মূলতত্ত্ব শিল্পী যে পরিমাণে উপলব্ধি করবেন সেই পরিমাণে তিনি প্রকৃত শিল্পী। শিল্প সম্বন্ধে জার্মান দার্শনিক ফিক্তে যা বলেছেন তা এইরকম- “There is divine idea pervading the visible universe, which visible universe is indeed but its symbol and sensible manifestation, having in itself no meaning or even true existence independent of it. To the mass of men this divine idea of the world lies hidden. * Literary men are the appointed interpreters of this divine Idea; a perpetual priesthood, we might say, standing forth, generation after generation, as dispensers and living types of God’s everlasting wisdom_to shut it in their writings and actions…He may lay hold of the whole divine Idea, in so far as it can be comprehended by man, or perhaps a special portion of this its comprehensible part.”
Carlyels Eassys Vol K,I., P.49
শিল্পীর এই আদর্শ-উপলব্ধি-কল্পনা, এক মহান সত্তা। জগতে জড় ও জীবন দুই থাকে। শিল্প সৃষ্টিতে সেইরূপ জগতের ছবি এবং মানুষের ছবি দুই-ই থাকবে। শিল্পের অঙ্গ এই দু’টি। তবে যিনি প্রকৃত শিল্পী, তিনি বাইরের জগতের সাথে অন্তর্জগত উভয়ের সমিমলনে সে অদ্ভূত সৃষ্টি তার গূঢ় রহস্য উন্মোচন করে দেন। মহৎ শিল্পী জীবন, জগৎ ও মানুষকে একটি নিজস্ব বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। এই দেখার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থাকে তাঁর হৃদয়ের। আবেগ ও মনন এই দুইয়ের মিশ্রণে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যে ধারণার জন্ম দেন তাকে বলা যেতে পারে উপলব্ধি।
অতি প্রাচীনকালে গ্রীক সোফিস্ট্ পিথাগোরাস বলেছিলেন, “জগতের সবকিছুর মানদণ্ড মানুষ। মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাবা অবান্তর। মানুষ শিল্পের স্রষ্টা এবং এই মানুষ আবার উপকরণও বটে।” ফসল বোনা ও কাটার সময় নবান্নের উৎসবে নৃত্যগীত সহযোগে আদিম মানুষের যে প্রাণের উল্লাস, তাতেই শিল্পের জন্মকাহিনী নিহিত। তাদের আবেগ-অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা, ভাষা, রঙ, রেখাকে আশ্রয় করার আগে দেহ ভঙ্গিমা এবং কন্ঠস্বরের রাগিনীতেই রূপ পেয়েছে , সেজন্যে নৃত্য এবং সঙ্গীতকে বলা হয় আদি শিল্প। একদিকে হিংস্র জীবজন্তু ও উন্মুক্ত প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্যদিকে জীবিকা আহরণের প্রচেষ্টা, এই দুই প্রাথমিক প্রয়োজনেই মানুষ সংঘবদ্ধ হতে শিখেছিল। পরসপরের মনের ভাব আদান প্রদানের জন্য তৈরী করেছিল প্রতীক আরোপিত সাঙ্কেতিক ধ্বনির, আর এর নাম হচ্ছে ভাষা।
অতএব বলা যেতে পারে নৃত্যের মুদ্রা, সঙ্গীতের রাগিনী আর কবিতার ভাষা যুগে যুগে বিচিত্ররূপে মানুষকে প্রকাশ করেছে। যেখানে ভগবানের মহিমা কল্পনা, সেখানেও দেখি তার মানুষী রূপ, আবার যেখানে বহিঃপ্রকৃতির অনন্ত লীলা মূর্ত সেখানেও মানুষী প্রতিচ্ছবি। কাজেই আমি যদি শিল্পী হতে চাই আমার প্রথম কাজ হবে মানুষকে জানা। নাইলে ভাষার যত কারুকার্যই থাক, রঙে যত ছটাই থাক, সবকিছু ব্যর্থ হতে বাধ্য।
শিল্পীর দর্শন হচ্ছে জীবন সাধনা এবং সে জীবন নিঃসন্দেহে মানুষের জীবন আর তা সাধনা করতে হয় শিল্পের মাধ্যমে সাধনা। তাই শিল্পীর শিল্প দর্শন কী হবে তা শিল্প সৃষ্টির আগেই ঠিক করে নিতে হয়। আর এই জীবন একদিকে যেমন সামগ্রিক অন্যদিকে তা ব্যক্তিগত। প্রশ্ন উঠতে পারে বা প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে শিল্পের অবলম্বন যে মানুষ, সে কি নিরবলম্ব ধোঁয়াটে আধ্যাত্নিক কিছু, না তার অন্য রূপ আছে ? এখানে সমাজতত্ত্বের কথা এসে যায়, ঐতিহ্যের কথা এসে যায়। কেননা সমাজের বাইরে মানুষের অস্তিত্ব নেই - ছিলো না কোনকালে। মানুষকে বাদ দিয়ে, সমাজকে দূরে রেখে, তার ঐতিহ্যকে ভুলে কোন দিন কোন বড় ধরনের শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কেননা মানুষ, সমাজ ও ঐতিহ্য পরসপর অবিচ্ছেদ্য। এ তিনটিকে কিছুতেই আলাদা করা সম্ভব নয়।
সৃষ্টির প্রেরণা জাগ্রত হলে শিল্প সেই মুহূর্তে দু’টি সমস্যার মুখোমুখী হয়। তাহলো উপকরণ ও আঙ্গিক। শিল্পবস্তু ও উপকরণ হচ্ছে সেই জিনিস যা না হলে সৃষ্টির ভাবনা অসম্ভব। তেমনি শিল্প সৃষ্টিতে দরকার আঙ্গিকের অপূর্ব নির্মিতি ও দক্ষতা, পাশাপাশি দরকার জগৎ ও জীবনের মানুষী প্রতিচ্ছবি।
মানুষ সমাজের একটি অংশ। মানুষকে বাদ দিয়ে যেমন সমাজকে ভাবা যাবে না তেমনি সমাজের মধ্যে মানুষের কিছু রীতি, নীতি, আচার, আচরণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য আছে যেগুলো সমাজেরই অংশ, সেগুলোকেও বাদ দেয়া যাবে না। মানুষ জন্ম থেকে কিছু ঐতিহ্য লালন করে আসছে - তার ধর্ম, তার উৎসব, বিশ্বাস, অবিশ্বাস ইত্যাদি।
শিল্পের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের বাঁচার প্রয়োজনে। সৎ শিল্পীর সৃষ্টিতে মূল প্রেরণা হচ্ছে সামাজিক বাস্তবতা, বিভিন্ন যুগে এই উক্তির সত্যতা নির্ণীত হয়েছে। কাউন্ট টলস্টয়ের কথা ধরুন না। সকল শান্তি, নিরাপত্তা উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরেছেন একমাত্র মানুষকে জানার জন্যে। কিংবা বালজাক ব্ল্যাক - তাঁর কথা। যিনি কফি খেয়ে কাটিয়েছেন দিনের পর দিন শুধু মানুষকে জানার জন্যে, শিল্পের তাগিদে। পৃথিবীর শেষ্ঠ শিল্পীদের জীবনী পাঠ করলে আমরা এমনি অনেক উদাহরণ দেখতে পাই। একেকজন তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করেছেন মানুষকে জানার জন্যে, আর সহস্র রূপে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাইরে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে।
রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি অথবা শাহনামার অজস্র কাহিনী গণমানুষের জীবনেরই প্রতিকৃতি। মহাকাব্যের বীর নায়ক, সত্য রূপী রাজা ও অন্যান্য সহস্র চরিত্র এবং তাদের কার্যকলাপ গণমানুষের অমূর্ত আকাঙ্খার প্রতীক।
সুতরাং আমরা বলতে পারি যে দেহ এবং আত্নার সমন্বয়ে যেমন প্রাণী তেমনি বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিকের যথার্থ সমিমলনেই শিল্প। তাই একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিতে সাফল্য অসম্ভব। অতএব শিল্প বা শিল্প দর্শন কী হবে তা শিল্প সৃষ্টির আগেই শিল্পীকে ঠিক করে নিতে হয় বা নেয়া উচিৎ। কেননা, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যদি শিল্পীর পরিপূর্ণ ধারণা না থাকে, জীবন সম্বন্ধে যে বক্তব্যই থাক আঙ্গিকের মধ্যে যদি সার্থক সমন্বয় ঘটাতে না পারেন, তাহলে তা ব্যর্থ। আদর্শ ও ঐতিহ্যবোধ, উপকরণ ও আঙ্গিক সবকিছুই বিফলে যাবে যদি না শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির ক্ষমতা থাকে। সৃষ্টির আগুন না থাকলে সবরকম মালমশলা পুড়িয়ে তা থেকে সুন্দর, আনন্দময়, মঙ্গল বা প্রেরণাদায়িনী শিল্প প্রতিমা গড়ে তোলা অসম্ভব।
শিল্পী যা সৃষ্টি করেন সেখানে জীবনের সামগ্রিক বিষয়-আশয় সমন্বিত হয়ে শিল্পে আশ্রয় গ্রহণ করবে। সুতরাং শিল্প সৃষ্টিতে বা শিল্পীর শিল্প দর্শন হওয়া উচিৎ সৎভাবে, গভীরভাবে, সার্থকভাবে নিজেকে চেনা, নিজেকে জানা, নিজের দিকে ফিরে যাওয়া; নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশের মানুষ, যুগ যুগ ধরে আমরা যা লালন করেছি, করছি; আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যা বহমান - মানুষেরই হাতে গড়ে তোলা সেই কৃত্রিমকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা, উপলব্ধি করা। আমাদের ভিতর আমরা যদি কেউ কবিতা লিখি তাহলে আমরা কী করি - আমরা প্রথমেই অন্যের কাছ থেকে ধার করতে শিখি, অন্যের অনুষঙ্গ ব্যবহার করি সোজা কথায় বলা যায় গ্রিক মিথোলজি থেকে উপমা আমদানী করতে বেশি উৎসাহী - অথচ আমাদের ছেলেবেলায়-মেয়েবেলায় শোনা দাদিমাদের কিসসা-কাহিনী কিংবা বনে বাঁদাড়ে দস্যিপনা, দুরন্তপনা সেই শৈশব বা কাহিনী লিপিবদ্ধ করতে কুণ্ঠাবোধ করি। আমরা আমাদের শিশুদের বিদেশী গল্প অনুবাদ করে উপহার দেই। কিংবা যা লিখি তা না হয় বিদেশী গল্প, না দেশী। আমরা যখন গল্প লিখি আমাদের চরিত্রগুলোকে লরেন্স, হেমিংওয়ে, ফ্রাঁসোয়া সাগার নায়ক-নায়িকা করে ছেড়ে দিই। আমাদের বাড়ীর পাশের কালো মেয়েটি তাঁর ছবি কি কখনো আঁকতে চেয়েছি? বা আঁকার চেষ্টা করেছি? আমরা না পারছি পাশের বাড়ীর কালো মেয়েটির ছবি আঁকতে, না পারছি লরেন্স হেমিংওয়ে ফ্রাঁসোয়া সাগার নায়ক-নায়িকার ছবি আঁকতে। বিশাল বিচিত্র জনপদ থেকে নির্বাসিত আমরা মগজের কারবারী বুদ্ধিজীবী মাত্র। আমরা যারা নাটক লিখি তারা কিং লিয়ার বা হ্যামলেট বলতে পাগল অথচ নিজের ঘরের প্রতিদিনকার নট্টলীলাকে সামনে তুলে ধরতে সৎ সাহস পাচ্ছি না। ছবির ক্ষেত্রেও তাই। রঙ চঙ মেখে অদ্ভুত জন্তুর ছবি আঁকছি। অথচ নিজের ঘরের মাটির ঘোড়ার মূর্তিকে কল্পনায় আনতে পারছি না।
আমরা সবই করছি - কিন্তু আমাদের দুঃখিনী দেশমাতার ধূলিমাটির সপর্শ গায়ে লাগছে না। আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে মনে করতে পারছি না। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে ভুলে অন্যের বেসাতি করছি। তাই আমাদের সাহিত্য, আমাদের শিল্প হয়ে পড়ছে তাঁবেদারী শিল্প, হয়ে পড়ছে বিকলাঙ্গ।
মানবতা মুক্তি এবং সৃষ্টি। মানুষ যাকে আমি চিনি, যার পরিচয়ে আমি বড় হয়েছি, যার পরিচয়ে দেশ, সুখে-দুখে সংগ্রামে যে টিকে আছে এখনো, এখানো যার আদর্শ, যে ঐতিহ্য, ইতিহাস আমি লালন করি সেই তো আমার শিল্প এবং তার জন্যই শিল্প।
সত্যিকারের শিল্প সৃষ্টি করতে হলে দেশের শিরায়-শিরায়, আনাচে-কানাচে ডুব দিতে হবে, হতে হবে মাঝি-মাল্লা, চাষী-মজুর, কলকারখানার একজন। যে হাত আজ লাঙল ঠেলছে, কলের চাকা ঘোরাচ্ছে সেই একদিন নতুন সভ্যতার নির্মাতা হবে, দায়িত্ব নিবে সেই-ই। সুতরাং তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে আমাকে। তাঁর নির্মাণে সাথী হতে হবে। ধুলো-বালি গায়ে মাখতে হবে। যেতে হবে অজপাড়াগাঁয়ের মেঠো পথে, আত্নার সাথে আত্নার মিলন ঘটাতে হবে। আমি যদি চাষীকে নিয়ে গল্প লিখি তাহলে একজন চাষীর সবকিছু আমাকে জানতে হবে। সে কীভাবে চাষ করে, সে কীভাবে ফসল ফলায়, তার জীবন, তার দর্শন, চিন্তা-চেতনা সবকিছু। এসব যদি আমি না-ই জানি, তাহলে কী লিখবো আমি। সেটা আদৌ কোন গল্প হবে কিনা। তাই শিল্পীর কাজ হলো মাটি, মানুষ, নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে এক হয়ে মিশে গিয়ে কাজ করা। আর এখানেই রয়েছে শিল্পের মুক্তি। শিল্প যদি মানুষকে পথ দেখাতে না পারে, মুক্তির কথা নাই বলতে পারে তবে সে শিল্পের মূল্য কোথায়? তাই শিল্পীর কাজ হবে শিল্পকে সেইভাবে রূপ দেয়া - যা দেখি, যেভাবে দেখি, ঠিক সেইভাবে দেখা।
মাও সেতুঙ-এর একটি কথা এখানে স্মরণ যোগ্য : “যদিও জীবন এবং সাহিত্য ও শিল্পকলা উভয়ই সুন্দর, তবু সাহিত্য ও শিল্পকলায় জীবনের যে রূপ প্রতিফলিত হয় তা হতে পারে এবং তা হওয়া উচিত, সাধারণ বাস্তব প্রাত্যহিক জীবনের চেয়ে উন্নততর, আরও তীব্র, আরও ঘনীভূত, আরও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও আদর্শের আরও কাছাকাছি; এবং সেজন্যই অনেক বেশি সার্বজনীন। বিপ্লবী শিল্প সাহিত্যের উচিত বাস্তব জীবনধারা থেকে বিভিন্ন ধরনের চরিত্র উৎসারিত করে নিয়ে সেগুলোকে সৃষ্টিকর্মে রূপায়িত করা, এবং ইতিহাসকে এগিয়ে নেয়ার কাজে জনগণকে সাহায্য করা। দৃষ্টান্তস্বরূপ - এক দিকে রয়েছে অনাহারে, শীতে, অত্যাচারে জর্জরিত মানুষ, আর অন্যদিকে রয়েছে সেইসব লোক যারা তাদেরকে শোষণ-নির্যাতন করে চলছে। এই রকম ঘটনা সব জায়গাতেই ঘটছে, এবং মানুষ এগুলোকে গতানুগতিক দৃষ্টিতে দেখছে। শিল্পী-সাহিত্যিকেরা এই গতানুগতিক ঘটনাগুলোকে ঘনীভূত রূপদান করে এগুলোর ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামকে বৈশিষ্ট্য দান করেন, এবং এমন এক সাহিত্য ও শিল্পকলা সৃষ্টি করেন যেগুলো জনগনকে জাগিয়ে তোলে, তাঁদের মধ্যে উদ্দীপনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়, এবং পরিবেশের পরিবর্তন সাধনের জন্য তাঁদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে ও সংগ্রাম চালাতে অনুপ্রাণিত করে।”
শিল্পের লক্ষ্য বা দর্শন হওয়া উচিত মানবতা, মুক্তি এবং সৃষ্টি বলেই সেই লক্ষ্যে পৌঁঁছুবার জন্যে শিল্পে যতটা পথ অবলম্বন করা উচিত ঠিক ততটাই অবলম্বন করা উচিত । আর সে পথ হল নিজের আত্নার মধ্য দিয়ে জাগরণ। কোন শিল্পীই বিশেষ জাতের মানুষ নয়; কারণ সে যখন পরিণতি লাভ করে তখন জীবনের রহস্য নির্ণয়ই তার লক্ষ্য এবং সেই রচনা আবেদনের দিক থেকে আঞ্চলিক গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে যায় স্বাভাবিকভাবেই। যেমন চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় আঙ্গিক পদ্ধতিকে অনুসরণ করেছেন। তবু কোন ক্ষেত্রেই তিনি বাংলার বাণী ও রূপকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি; সত্যিকারের শিল্পীর পক্ষে তা ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেই।
শিল্পীর কাজ হলো শিল্পীর চারপাশে যে বস্তুরাশি, জীবন পরিস্থিতি, সমাজ পরিবেশ, জীবনধারা ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিরাজ করে তা দর্পণে প্রতিফলনের মাধ্যমে অতীত সত্যে রূপ দেয়া এবং মানবিক আবেদন সৃষ্টি করা। পাশাপাশি শিল্প সৃষ্টিতে রূপের পরিচর্যা অপরিহার্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুভূতি, উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা, চিন্তা, জ্ঞান বা প্রজ্ঞাকে সুন্দর ও আবেদনশীল রূপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে না পারলে কখনও তা শিল্পের পদবাচ্য হয়ে ওঠে না, এবং গ্রহীতার মনের মধ্যে সেগুলো সঞ্চারিত হতে পারে না। কেননা, মানুষের জীবন চিরকাল শিল্প-সাহিত্যের উৎস, অর্থাৎ মানুষের জীবনই শিল্পীর ইন্দ্রিয়, স্নায়ু মস্তিস্কে প্রতিক্রিয়া ঘটিয়ে শিল্প সৃষ্টিকে সম্ভব করে তোলে। আর সে শিল্পের মধ্যে থাকে জীবনেরই প্রতিবিম্ব বা প্রতিচ্ছবি। সুতরাং মহৎ শিল্পে যে জীবনের ছবি পাওয়া যায়, সে জীবন মানুষের অভীষ্ট জীবন - সে জীবন আশার, অভীপ্সার, কামনার, স্বপ্নের জীবন, ভবিষ্যতের জীবন। এবং শিল্পীর শিল্প দর্শন হওয়া উচিত এটাই।
রচনা : ১৪.০৫.২০০৮