Banner
ধর্ম ও বাঙ্গালীর পুনরেকত্রীকরণ - শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ September 29, 2015, 12:00 AM, Hits: 487

 

   

 

২৮ মার্চ, ১৯৩৫ এ লেখা “ব্যর্থতার প্রতিকার” নামক প্রবন্ধে কাজী আবদুল ওদুদ বলেছেন, “হিন্দুর সমাজজীবনে উচ্চ ও নীচের ভিতরে যে ঘোর ব্যবধান তাই তার জন্য প্রিয় করেছে রক্ষণশীলতা - বিচিত্র ধরনের আত্ম-সম্পূর্ণতায় যার প্রকাশ। সে - রক্ষণশীলতায় জীবন কোনো রকমে রক্ষা পেলেও তার বিকাশ অথবা সৃষ্টি-ধর্ম যে কেবলই বাধা পায় সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে শিক্ষিত হিন্দুর অপারগতা শিক্ষিত মুসলমানের দেশাত্মবোধের অভাবের মতনই ভয়ংকর।”

 

কাজী আবদুল ওদুদ খুব সঠিকভাবে তাঁর সময়ের বাঙ্গালী সমাজের মূল সমস্যাটিকে এই কয় ছত্রে প্রকাশ করেছেন। এরপর অবশ্য বহু সময় কেটে গেছে। অবিভক্ত বঙ্গ বিভক্ত হয়েছে। পূর্ব বঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যার বিপুল অধিকাংশই দেশত্যাগ ক’রে পশ্চিম বঙ্গে গেছে কিংবা যেতে বাধ্য হয়েছে। সময়ের সাথে হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জীবনেই অনেক পরিবর্তন এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ ও নীচের ঘোর ব্যবধান রক্ষাকারী বর্ণজাতিভেদ প্রথার শক্তি এখনও থাকলেও তা আর চুয়ান্ন বৎসর পূর্বের মতো প্রবল প্রতাপশালী নয়; বিশেষত পশ্চিম বঙ্গে। ঠিক তেমন মুসলমান বাঙ্গালী যেখানে সংখ্যাগুরু সেই পূর্ব বঙ্গকে পাকিস্তান রাষ্ট্রভুক্ত করার পর নিজেও এসেছে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে দাঁড়াতে গিয়ে চেতনার ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমান বাঙ্গালী তার স্বদেশের দিকে ফেরার যাত্রা শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। তার চেতনায় এই স্বদেশ যাত্রার পরিণতিতে তাকে ’৭১-এ পূর্ব বঙ্গের স্বাধীনতার জন্য মুসলমানের রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতে হয়েছে। কাজেই কিছু সময়ের জন্য হলেও দেশাত্মবোধহীন মুসলমান বাঙ্গালীকে তার স্বদেশকে ভালোবাসতে হয়েছে।

 

১৯৭১-এ পূর্ব বঙ্গ স্বাধীন হয়ে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং সঙ্গত কারণেই আমরা আশা করব যে, এবার মুসলমান বাঙ্গালী যথাযথভাবে বাঙ্গালী হিসাবে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পাবে, বাঙ্গালী হিসাবে পরিচয় নিয়ে তার স্বদেশ নূতনভাবে গড়বে।

 

কিন্তু আমরা দেখলাম ’৭১-এর পর মুসলমান বাঙ্গালীর বাঙ্গালী হিসাবে তার স্বদেশ গড়ার পথে বাধা হয়ে ফিরে এল ইসলাম, তার মুসলমান পরিচয়। ১৯৪৭-এ ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গ বিভক্ত করার ক্ষেত্রে মুসলমানের যে ভূমিকা ছিল সেটাকে ’৭১ পরবর্তী কালে এখানকার মুসলমান বাঙ্গালী নাকচ বা নিন্দা করতে পারল না। ’৭১ নাকচ করে ’৪৭-এর উত্তরাধিকারকে। কারণ ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত্তি ছিল হিন্দু কিংবা ইসলাম যে কোনও ধর্ম মুক্ত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল ভাবপ্রেরণা এবং কর্মসূচী ছিল পূর্ব বঙ্গে বাঙ্গালী জাতিসত্তার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং ’৭১ অনিবার্যভাবেই নাকচ করে ’৪৭-এর বিভক্তিকে এবং দাবী জানায় বাঙ্গালীর পুনরেকত্রীকরণকে তার লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণার।

 

কিন্তু বাস্তবে ঘটল ভিন্ন ঘটনা। বাঙ্গালীর পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য ঘোষিত হ’ল না। বরং ’৭১ পরবর্তী কালে মুসলমান বাঙ্গালী নেতৃত্ব পুনরায় ইসলাম ধর্মের দিকে ঝুঁকতে থাকে। হিন্দু বাঙ্গালীর সঙ্গে তার পার্থক্যকে তুলে ধরার জন্য ইসলামকে অবলম্বন করতে থাকে বেশী বেশী করে এবং হিন্দু বিদ্বেষকে বাড়াতে থাকে বাঙ্গালীর ঐক্যের প্রশ্নকে দূরে সরিয়ে রাখবার প্রয়োজনে।

 

এইভাবে এ দেশে ’৭১-এর পূর্বে যেমন ইসলাম ছিল রাজনীতিতে একটা নিয়ামক উপাদান হয়ে, যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তা হয়ে পড়েছিল একেবারে গৌণ এবং অত্যন্ত দুর্বল, তেমন ’৭১-এর পরেও ইসলাম হয়ে উঠল জাতীয় জীবনে নিয়ামক উপাদান। এর ফলটা হল অশুভ। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের প্রভাব ও আধিপত্য অশুভ না হয়ে পারে না। কারণ ধর্মের প্রতিষ্ঠা অন্ধ ও বিজ্ঞান বিরোধী বিশ্বাসের উপর, অন্ধত্ব ও অজ্ঞতার উপর। ধর্মের প্রতিষ্ঠা জ্ঞান, যুক্তি এবং স্বাধীন চিন্তাশক্তির উপর নয়। বিশেষত ইসলাম ধর্ম বড় ভয়ানকভাবে যুক্তিবিরোধী। তার দাবী হল বিশ্বাস - - অন্ধ, যুক্তিহীন, প্রমাণহীন, প্রশ্নহীন ও উগ্র, অসহিষ্ণু বিশ্বাস। এই বিশ্বাস আল্লাহ্‌ এবং তার রাসূল বা নবী হিসাবে মুহামমদের উপর, কুরআনের উপর। ইসলামের হিংস্র ও অসহিষ্ণু অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে আর যা-ই হোক উন্নত জীবন গঠন করা যায় না। তাছাড়া ইসলাম অনিবার্যভাবে জন্ম দেয় নারীর বন্দীত্ব ও পশ্চাৎপদতার সঙ্গে সমাজের পশ্চাৎপদতা ও স্বৈরতন্ত্র। ইসলামের জগত স্বৈরতা, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার লৌহ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এর মধ্যে থেকে কোনও জাতিই উঠে দাঁড়াতে পারে না। ফলে মুসলমান দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদ বা উন্নত অমুসলমান জাতিগুলির লুণ্ঠন ও শোষণের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।

 

শুধু পশ্চাৎপদতার উৎস হওয়াতেই যে ইসলাম বাঙ্গালী ও বঙ্গের জন্য অশুভ হয়েছে তা-ই নয়, উপরন্তু বাঙ্গালীর বিভক্তির কারণ হয়ে এবং তার জাতীয় পরিচয় অর্জনের পথে বাধা হয়েও ইসলাম হয়েছে অধিকতর অশুভ। ১৯৩৫-এ কাজী আবদুল ওদুদ বলছেন শিক্ষিত মুসলমানের মধ্যে দেশাত্মবোধের অভাবের কথা। আসলে এ দেশে শুধু শিক্ষিত নয় সমস্ত মুসলমানের মধ্যেই দেশাত্মবোধের অভাব শুধু সেকালে নয় চিরকালই। যেহেতু তার ধর্মটা এসেছে বিজয়ী বিদেশী মুসলমান হানাদারদের হাত দিয়ে সুতরাং এই ধর্ম মুসলমানকে কখনই দেশাত্মবোধ শেখাতে পারে না।

 

ইসলাম যে ধর্মের নামে আরব আধিপতের আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে সেটা সুসপষ্ট ইসলামের ধর্মাচরণ ও রীতিনীতির মধ্যে। কল্পনার ঈশ্বরের ভাষা নিশ্চয় আরবী হবার কথা নয়। কিন্তু আরবী ভাষাই হল ইসলাম ধর্মচর্চার ভাষা। আরবী ভাষায় উপাসনা বা প্রার্থনা করা এবং কুরআন পাঠ করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া পুণ্য নেই। শুধু তাই নয় আল্লাহ্‌কে নিরাকার ও সর্বব্যাপী বলেই আবার মক্কার কাবাঘরকে আল্লাহ্‌র ঘর বলে সেদিকে সেজদা বা প্রণাম করে উপাসনা করা হয় দৈনিক পাঁচবার। বস্তুত কাবা হল আরব জাতির ঐক্যের প্রতীক। অর্থাৎ পৌত্তলিকতা বিরোধী হয়েও এক্ষেত্রে ইসলাম পৌত্তলিক। হিন্দু ধর্মে প্রতিমা তা হলে কী দোষ করল? প্রতিমা তো দেবতা কিংবা ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীকমাত্র। কাবাকে ঘিরে উপাসনা বাস্তবে কাবারই উপাসনা। আর এই কাবার উপাসনাও কি প্রতিমা উপাসনা বা পূজার মতোই প্রতীকপূজা নয়? আল্লাহ্‌কে পূজা করা হয় এই ঘরের মাধ্যমে। অর্থাৎ এই আল্লাহ্‌র ঘরের মাধ্যমে পূজা করা হয় আরব ভূমিকে, আরব জাতির ঐক্য বোধকে এবং আরব জাতির শ্রেষ্ঠত্ব বোধকে। আল্লাহ্‌র কল্পনা থেকে মুক্ত হলে এই সত্যই নগ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান যেটা করে সেটা হল দৈনিক পাঁচবার নামাজের নামে আরবের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বকে সেজদা করা বা পূজা করা। এ ছাড়া আছে বৎসরে একবার হজ। অর্থাৎ শুধু দূর থেকে প্রতীক উপাসনা নয়, বরং স্বশরীরে মক্কায় ও কাবায় গিয়ে তাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রণতি জানিয়ে বা পূজা করে আসা। এইভাবে ইসলাম আরব ভিন্ন অন্যান্য জাতির মুসলমানের মনে দিয়েছে সুসপষ্টরূপে আরবের বাস্তব ও নৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আত্মসমর্পণের চেতনা। আর এই চেতনাই এ দেশের মুসলমানের কাছ থেকে কেড়ে নেয় দেশপ্রেম, দেশগৌরববোধ এবং তাকে দেয় ধর্মের নামে আরবমনস্কতা তথা পরের নিকট আত্মসমর্পণ ও দেশদ্রোহ। এ দেশে মসজিদগুলি কাবার ক্ষুদ্র প্রতীক কিংবা প্রতিভূ হয়ে এই পরদাসত্ব রক্ষার অতন্দ্র দুর্গ হিসাবে কাজ করে। আর সেই সঙ্গে আছে মানসিক এই দাসত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য দৈনিক পাঁচবার নামাজ এবং বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

 

বাস্তবিক এ দেশে একজন মুসলমান যতো বেশী গোঁড়া মুসলমান হবে সে ততো বেশী দেশদ্রোহী হবে। কারণ যেটা ইসলামের উৎস এবং কেন্দ্র সেই আরব হল ইসলামের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রভূমি। ইসলাম যতোই আন্তর্জাতিক হোক সেটা প্রায় দেড় হাজার বৎসর পূর্বের আরব জাতীয়তাবাদী সম্প্রসারণবাদের এক বিশেষ রূপ মাত্র। এটা হল যাযাবর আরব-বেদুইনদের জীবনব্যবস্থাকে প্রধান ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আরব জাতীয়তাবাদের বাহক। বিজয়ী তুর্কী, পাঠান, মোগলরা এই আরব জাতীয়তাবাদের পতাকা বহন করে এ দেশে যে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল তার ভিতরে ছিল আরব জাতীয়তাবাদ ও আরব সংস্কৃতি কেন্দ্রিক তুর্কী, ইরানী ও অন্যান্য বৈদেশিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের উপাদান। আসলে ইসলাম এ দেশে বাঙ্গালী জাতিসত্তা ও তার সংস্কৃতি ও চেতনার উপর বৈদেশিক আধিপত্য ও আগ্রাসনের সমার্থক।     সুতরাং প্রকৃত বাঙ্গালী হতে হলে আমাদের ধর্ম বিশ্বাস মুক্ত না হয়ে উপায় নাই। এ দেশ থেকে ইসলামের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়েই আমরা এ দেশে প্রতিষ্ঠা করতে পারি বাঙ্গালীর প্রকৃত জাতীয় চেতনা, মর্যাদাবোধ ও দেশপ্রেম।

 

পূর্ব বাংলা তথা বর্তমানের বাংলাদেশের বাঙ্গালী যতোদিন মুসলমান থাকবে ততোদিন সে বাঙ্গালী হিসাবে তার পরিচয় ঠিকভাবে খুঁজে পাবে না। ফলে পৃথিবীর বুকে মর্যাদা ও শক্তি নিয়ে দাঁড়াতেও পারবে না। আত্মমর্যদাহীন জাতি কোনও দিনই দাঁড়াতে পারে না। বিদেশী হানাদারদের ধর্ম নিয়ে গৌরব করে কি আমরা কোনও দিন উন্নত ও গৌরবময় জাতি হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব? চাইলেও আমরা আরব কিংবা তুর্কী হতে পারব না। অথচ মুসলমান পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে চাইলে আমাদের বাঙ্গালীর উপর বিজয় অর্জনকারী হানাদারদের প্রতি নৈতিক সমর্থন না দিয়ে উপায় নাই। তাহলে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতেই বা অসুবিধা কোথায়?

 

আমরা কি মুসলিম হানদার বখতিয়ার খলজীদের বঙ্গের উপর বিজয় ও শাসন নিয়ে গৌরব করি? যদি করি তবে এই দেশে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গৌরব বোধ করা চলবে না এবং যদি আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি এবং বাঙ্গালী সংস্কৃতির অধিকারী হই তবে সেক্ষেত্রে এ দেশে সকল বিদেশী হানাদার ও বিজেতার আগ্রাসন ও আধিপত্যের অধিকার আমাদেরকে নৈতিকভাবে মেনে নিতে হবে। তা কি কোনও মুসলমান বাঙ্গালী মানবে?

 

যতোদিন মুসলমান বাঙ্গালী উন্নত জীবনের সন্ধান লাভ করে নাই, রাষ্ট্র সাধনা, উন্নত সমাজ সাধনা করে নাই ততোদিন তার পক্ষে মুসলমান থাকা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু যখন তার সামনে দেখা দিয়েছে উন্নত জীবন ও তার দায়িত্ব, উন্নত রাষ্ট্র ও সমাজ সংগঠনের দায়িত্ব তখন আর মুসলমান বাঙ্গালীর পক্ষে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন না করে উপায় নাই।

 

মনে রাখতে হবে ব্রিটিশ বিজয়ের পূর্বে বঙ্গ এবং বাঙ্গালী জাতিসত্তার উপর যে সব মুসলমান শাসন করত তারা সাধারণভাবে এ দেশের মানুষ কিংবা বাঙ্গালী ছিল না। বিদেশ থেকে অস্ত্রের জোরে তারা এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করত। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি যেমন ছিল ভিনদেশী তেমন তাদের বংশধররাও এ দেশের সাধারণ বাঙ্গালী থেকে নিজেদেরকে পৃথক করে রাখত তাদের নিজস্ব বা বিদেশী (যেমন উর্দূ) ভাষা ও সংস্কৃতি দ্বারা। এই বহিরাগত শাসক ও শোষক মুসলমানরা অভিজাততন্ত্র গঠন করে এ দেশের সাধারণ মুসলমান বাঙ্গালী থেকেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখত। হিন্দু উচ্চ বর্ণের লোকেরা যেমন নিম্ন বর্ণের ও সাধারণ মানুষকে ঘৃণা করত ঠিক তেমন এই অভিজাত মুসলমানরাও এ দেশের সাধারণ বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমান সকল মানুষকে ঘৃণা করত মন থেকে। এই মুসলিম অভিজাতদের গৌরব ছিল এ দেশের বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে নয়, বরং তাদের বৈদেশিক উত্তরাধিকার নিয়ে। কেবলমাত্র ব্রিটিশ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হবার পরই বঙ্গের অভিজাত মুসলমান শ্রেণীর স্বতন্ত্র অবস্থানের পরিবর্তন সূচিত হয় এবং তারা ক্রমশ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে মিশে যেতে বাধ্য হয়।

 

সুতরাং এই বহিরাগত মুসলিম অভিজাততন্ত্র ও তার ঐতিহ্য নিয়ে আজকের সাধারণ মুসলমান বাঙ্গালীর গৌরব করার কিছুই নাই। যদি কেউ এই গৌরব করে তবে তা হবে প্রভুকে নিয়ে তার দ্বারা নিগৃহীত দাসের গৌরব।

 

 

 

’৭১-এর নৈতিকতা এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ দাবী করে বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণ যে পুনরেকত্রীকরণের অর্থ নয় ভারত রাষ্ট্রে যোগদান বরং বাঙ্গালীর স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসাবে অখণ্ড বঙ্গ প্রতিষ্ঠা। বাঙ্গালী তার পুরাতন ধর্ম রক্ষা করে এই পুনরেকত্রীকরণ কোনও দিনই অর্জন করতে পারবে না। কাজেই উভয় বঙ্গে বাঙ্গালীকে উভয় ধর্মকেই বর্জন করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

 

হিন্দু ধর্মও অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং রক্ষণশীল। বর্ণজাতিভেদ ব্যবস্থার সংরক্ষক হয়ে তা একই সমাজের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে দুস্তর ব্যবধান এবং অবস্থার দুরতিক্রম্য কিংবা অনতিক্রম্য অসমতা। এটা ঐক্যবদ্ধ ও সংহত জাতি গঠনের পথে বিরাট বাধা সৃষ্টি করে রাখে। এটা এমনইভাবে একই জাতি ও সমাজকে অসংখ্য বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী ও চেতনায় বিভক্ত করে রাখে যে, এই বিচ্ছিন্নতার দেওয়াল ভেদ করে জাতির প্রাণপ্রবাহ মুক্ত গতিতে এগিয়ে যেতে পারে না। তবে এটা ঠিক যে, হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা সহজতর। কারণ তার আছে একটা সহনশীলতা যা ইসলামের নাই। অবশ্য সহজ হোক বা না হোক হিন্দু ধর্মের বর্ণজাতিভেদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে লড়তে হবে। কারণ এটা আজও কমবেশী সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়কে আবদ্ধ রেখেছে আত্মবিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা, ঘৃণা, অক্ষমতা, কাপুরুষতা ও স্থবিরতার কারাগারে।

 

ইসলাম ও হিন্দু এই উভয় ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, উভয় ধর্ম ও সংস্কৃতির বহু কিছুই আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে কিংবা আছে এবং চাইলেও আমরা বহু কিছু বর্জন করতে পারব না। কিন্তু তবু আমাদেরকে উভয়ের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যসমূহকে বর্জন করতে হবে। বর্জন করতে হবে উভয়ের ভাববাদ, অলৌকিকতা, পরলোকবাদ, স্বর্গবাদ ইত্যাদি। বর্জন করতে হবে ইসলামের আল্লাহ্‌র নিরংকুশ ও বিশুদ্ধ একত্ব সম্পর্কে ধারণা, কিয়ামত, শেষ বিচার সম্পর্কে ধারণা এবং বর্জন করতে হবে হিন্দু ধর্মের কর্ম-ফলবাদ, জন্মান্তরবাদ ও বর্ণজাতিভেদ প্রথা। বর্জন করতে হবে উভয়ের যুক্তিহীন ও নির্বিবেক আচার-অনুষ্ঠান।

 

আমাদের এই কাজের উদ্দেশ্য হবে একটি নূতন বাঙ্গালী জাতি গঠন। এই বাঙ্গালী অতীতের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অতীতের অনেক কিছুই তা বর্জন করবে। ইসলামকে বর্জন করে তা যেমন বাঙ্গালী হবে ও তার নূতন ও উন্নত বাঙ্গালী সংস্কৃতি গঠন করবে তেমন বর্ণজাতিভেদভিত্তিক হিন্দু ধর্মকে বর্জন করেও তা বাঙ্গালী হবে ও তার নূতন ও উন্নত বাঙ্গালী সংস্কৃতি গঠন করবে।

 

সুতরাং নূতন বাঙ্গালী জাতি গঠনের জন্য আমাদেরকে যেমন বর্জন করতে হবে আরবী, ফার্সী ইত্যাদি মুসলমানী নাম এবং গ্রহণ করতে হবে বাংলা নাম তেমন বর্জন করতে হবে হিন্দু বর্ণজাতিভেদ ও সামাজিক মর্যাদা ও স্তরভেদ সূচক পদবীসমূহ। সেই সঙ্গে বংশ মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য সূচক পদবীগুলোও বর্জন করতে হবে।

 

এই সবকিছুর উদ্দেশ্যই তো একটি উন্নত ও সংহত বাঙ্গালী সমাজ ও জাতি গঠন করা। বাঙ্গালীর সমাজ সেভাবে নাই। আছে বাঙ্গালী মুসলমান কিংবা হিন্দু সমাজ। অথবা খ্রীষ্টান কিংবা বৌদ্ধ সমাজ। অর্থাৎ এ দেশে ধর্মসম্প্রদায় এসে জায়গা নিয়েছে সমাজের। আর এর ফলে বাঙ্গালী সমাজ দৃঢ়বদ্ধ হতে না পারায় বাঙ্গালী জাতি হয়েছে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন। আমাদের কাজ এই বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন বাঙ্গালীকে একত্র করা এবং সুসংহত করা।

 

বাঙ্গালীকে এক হতে চাইতে হবে। তা না হলে তার উন্নতির উপায় নাই। বিচ্ছিন্নভাবে পূর্ব বঙ্গের পক্ষে কার্যকর ও উন্নত রাষ্ট্র হওয়া শুধু ভৌগোলিক কারণেই দুঃসাধ্য নয়। এই বিচ্ছিন্নতার সপক্ষে ইসলাম দাঁড়িয়ে থাকলে বাঙ্গালীর জাতীয় চেতনার জাগরণ অসম্ভব হয়ে থাকবে। সেক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম তার জাতীয় পরিচয়কে আঘাত করবে, তার জাতিসত্তার চেতনা ও গৌরববোধ এবং দেশাত্মবোধকে পর্যুদস্ত করবে। ইসলাম তাকে অবিরামভাবে নিয়ে যাবে স্বদেশ থেকে বিদেশের দিকে, দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম থেকে দেশদ্রোহ, পরমোহ ও পরদাসত্বের দিকে। আর সেই সঙ্গে ইসলামের পশ্চাৎপদতা ও অসহিষ্ণু স্বৈরতন্ত্র জনগণকে আবদ্ধ করে রাখবে পশ্চাৎপদতা, অন্ধত্ব, নীচতা, শোষণ ও অসহায় আত্মসমর্পণের কারাগারে। আর এর দ্বারা কিছু ব্যক্তির বিকৃত উন্নতি হতে পারে কিন্তু গোটা সমাজ এবং কোটি কোটি জনগণ পড়ে থাকবে অন্ধকারে, যন্ত্রণায়, অগৌরবে।

 

পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালীর সঙ্গে এক সময় পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এক সময় তাকে ভারতরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বর্তমান ভারতরাষ্ট্রের কাঠামোর ভিতর যে, পশ্চিম বঙ্গ কিংবা ত্রিপুরার বাঙ্গালী জনগণের মুক্তি নাই এই সত্য একদিন তাদের কাছে ধরা দিবেই। যখন তারা পশ্চাৎপদতা, অনুন্নয়ন থেকে মুক্ত হয়ে উন্নয়ন ও বিকাশের পথে, মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে চাইবে তখন ভারত রাষ্ট্রের কাঠামো না ভেঙ্গে তাদের উপায় থাকবে না।

 

কিন্তু তখন কোন দেশ তারা গড়বে? হিন্দু বাঙ্গালীর দেশ নাকি বাঙ্গালীর দেশ? শুধু ভৌগোলিক কারণেই যে পশ্চিম বঙ্গ কিংবা ত্রিপুরাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা দুঃসাধ্য তা-ই নয়, তার চেয়েও বড় কারণ হবে হিন্দু ধর্মের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ। কয়েক সহস্র বৎসর যে ধর্ম ভারতবর্ষকে এগোতে দেয় নাই এবং বারবার করেছে পরপদানত সেই হিন্দু ধর্মের প্রভাবে পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীও উন্নতি অর্জন করতে পারবে না। বস্তুত যতোদিন এই ধর্মের প্রভাবকে ঝেড়ে ফেলার মানসিক ও বাস্তব শক্তি পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু বাঙ্গালী অর্জন করতে না পারবে ততোদিন সে যেমন উন্নত বাঙ্গালীই হতে পারবে না তেমন ভারত রাষ্ট্রের বাইরে স্বাধীন ও উন্নত সত্তা নিয়ে দাঁড়াবার স্বপ্নও দেখবে না।

 

তবে পশ্চিম বঙ্গের কথা এখন থাক। সেটা সেখানকার বাঙ্গালীরা ভাববে। আমাদের এখনকার সমস্যা হল গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে যে রাষ্ট্র পূর্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই রাষ্ট্রের অন্তর্গত বাঙ্গালী জনগণের উন্নতি সংগঠিত করা। এটা করতে গিয়েই আমাদেরকে জাতিসত্তা ও জাতীয়তার প্রশ্নের সমমুখীন হতে হচ্ছে। এখানে দেখতে পাচ্ছি প্রধান প্রতিবন্ধক হিসাবে ইসলামকে। কৌশল করে ইসলামকে জাতীয়তার মর্মমূলে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে বিদায় দিয়ে আনা হয়েছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে। এবং এখন রাষ্ট্রটিকে সম্পূর্ণরূপেই একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। এটা ঠিক যে, আমরা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে বা নাগরিকতায় বাংলাদেশী। কিন্তু আমাদের যেটা জাতীয় পরিচয় বা জাতীয়তা সেটা বাঙ্গালী। জাতিসত্তায় আমরা বাঙ্গালী। আমাদের বাঙ্গালী চেতনা ও উত্তরাধিকার কেড়ে নিবার জন্যই এটা করা হয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দ্বারা জেনারেল জিয়া বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপর যে আঘাত করেছিলেন সেটাকে আরও তীব্রতর করেছেন জেনারেল এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা দ্বারা এবং ব্যাপক আয়তনে ইসলামী উন্মাদনাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা। এই অবস্থায় ইসলামী রাজনীতি ও চেতনার বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের শক্তির নূতন, প্রচণ্ড এবং আপোসহীন লড়াই সংগঠিত করা আজ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই লড়াই আজ শুরুও হয়েছে সারা দেশে।

 

পশ্চিম বঙ্গ কোন্‌ দিন পূর্ব বঙ্গের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে সেই অপেক্ষায় আমরা থাকব না। কিংবা শুধু তাদের সঙ্গে ঐক্যের প্রয়োজনেই আমরা প্রকৃত বাঙ্গালী হব না। এটা হব আমরা আমাদেরই প্রয়োজনে। এই বাঙ্গালী হয়েই আমরা পশ্চিম বঙ্গ এবং ত্রিপুরার বাঙ্গালী জনগণের কাছে পুনরেকত্রীকরণের বাস্তব ভিত্তি উপস্থিত করতে পারব। এই বাঙ্গালী হয়েই আমরা উন্নতির পথে, দেশের সমস্ত জনগণের শিক্ষা, সমৃদ্ধি, বৈষয়িক ও নৈতিক বিকাশের পথে এগিয়ে যাব। এই উন্নতির প্রয়োজনে আমাদেরকে প্রকৃত ও সেকিউলার বাঙ্গালী হতে হবে। এবং বাঙ্গালী হবার প্রয়োজনে আমাদেরকে বাঙ্গালীর পুনরেকত্রীকরণকে লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। অর্থাৎ বাস্তবে পুনরেকত্রীকরণকে অর্জন করার পূর্বে আমাদেরকে চেতনায় পুনরেকত্রীকরণকে অর্জন করতে হবে।

 

যদি সমস্ত বাঙ্গালী হিন্দু কিংবা মুসলমান হত বা এক ধর্মাবলম্বী হত তা হলে বাঙ্গালীর এই বিভক্তি যেমন ঘটত না তেমন তার পুনরেকত্রীকরণের এই সমস্যা দেখা দিত না। সেক্ষেত্রে ধর্মের সমস্যাকে আমাদেরকে মীমাংসা করতে হত অনেক ভিন্নভাবে। আজ আর সব কারণ বাদ দিলেও শুধু পুনরেকত্রীকরণ ও জাতীয়তাবাদের কারণে বাঙ্গালীকে ইসলাম ও হিন্দু এই উভয় ধর্মকে ত্যাগ করতে হবে। বঙ্গে এই উভয় ধর্মই ব্যর্থ। কারণ এরা কেউই একে অন্যের উপর নিরংকুশ বিজয় অর্জন করতে পারে নাই। এটা পারবারও আর কোনও সম্ভাবনা নাই। আর আপাদমস্তক পরসপর বিরোধী এই দুই ধর্মকে বজায় রেখে বাঙ্গালীর ঐক্যের স্বপ্ন দেখা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

কাজী আবদুল ওদুদের কথা দিয়েই শেষ করি। “ব্যর্থতার প্রতিকার” এ তিনি বলছেন, “এইখানেই বড় প্রয়োজন সৃষ্টি ধর্মী নব নেতাদের। অতীতের প্রতি তাঁরা হবেন শ্রদ্ধান্বিত, তার পূজারি কখনো নয় - তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সেইজন্য সুপ্রাচীন 'হিন্দু' ও 'মুসলমান’-এর মিলন তাঁদের কাম্য হবে না, কেননা তা অসত্য ও অসম্ভব, তাঁদের কাম্য হবে একটি নব জাতি গঠন - যার সূচনা নানা ভাবে বহুকাল ধরে’ দেশে হয়েছে, দেশের এ কালের জীবনের জন্য যার প্রয়োজনের অন্ত নেই। মনোজীবন ও রাষ্ট্রজীবন দুই ক্ষেত্রেই অশ্রান্তভাবে চলবে তাঁদের সৃষ্টির কাজ। এ কালের যে ধর্ম সম্প্রদায়গত রাষ্ট্রজীবন সেটি কদাচ তাদের সমর্থনের বিষয় হবে না, কেননা, তার ফলে এ দেশের অভিশাপ রূপ জাতিভেদ নব নব সম্ভাবনা লাভ করে চলবে; তাঁদের সাধনার বিষয় হবে জনসাধারণের সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষ, কেননা, তারই ভিতরে নিহিত রয়েছে দেশের রাষ্ট্র-জীবনের, অথবা জীবনের সত্যকার বিকাশ সম্ভাবনা।”

 

লিখিত : ২৯ এপ্রিল, ১৯৮৯

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive
 
সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ